- স্বর্ণ হলো নিরাপদ সঞ্চয় এবং ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের অন্যতম পথ। কোনও দেশের স্বর্ণের ভান্ডার সেই দেশের অর্থনীতির উন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বর্ণ রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও সুযোগ রয়েছে। কিন্তু শুল্ক-কর বৈষম্য ও নীতি সুবিধার অভাবে বেকায়দায় রয়েছে দেশের জুয়েলারি শিল্প। স্বর্ণ খাতের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ তৃতীয় পর্ব।
শরীফুল রুকন : ভারত যে এখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, তার সূচনা হয়েছিল ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংকট থেকেই। দেশটি যখন আইএমএফের (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) পরামর্শ মেনে জরুরি ভিত্তিতে ২২০ কোটি ডলার ঋণ নেয়, তখন তাদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ছিল মাত্র তিন সপ্তাহের আমদানি ব্যয়ের সমান।
সেই ২২০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার জন্য ভারতকে বন্ধক রাখতে হয়েছিল ৬৭ টন স্বর্ণ। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের কাছে ৪৭ টন ও ইউনিয়ন ব্যাংক অব সুইজারল্যান্ডের কাছে ২০ টন স্বর্ণ বন্ধক রেখে ওই ঋণ নিয়েছিল ভারত।
স্বর্ণ বন্ধক রাখার ওই ঘটনায় তৎকালীন ভারতীয় সরকারের ব্যাপক সমালোচনা হয়। এতে চন্দ্রশেখর সরকারের পতন ঘটে। পরে নরসিমা রাও প্রধানমন্ত্রী আর মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও স্বর্ণ বন্ধক রাখার বিষয়ে আগের সরকারের অবস্থানই সমর্থন করে বসেন। পরবর্তীতে বড় ধরনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিয়ে তারা তখন ব্যাপকভাবে সংস্কার করেছিলেন। সংস্কারের ফলও দ্রুত পায় ভারত।
ভারতের অর্থনীতির উদ্ধারকর্তা হিসেবে স্বর্ণের ওই ভূমিকাকে এখনও উদাহরণ হিসেবে দেওয়া হয়। তবে ভারত পুরো ঋণ নেয়নি। অর্থনীতি ভালো অবস্থায় গেলে ১৯৯৩ সালে তারা বাকি ঋণ নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।
বর্তমানে কোভিড–১৯ এবং ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের ফলে বিশ্বের অনেক দেশই চরম অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ে আছে। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে বাংলাদেশ।
প্রশ্ন হচ্ছে, স্বর্ণ খাত কি বাংলাদেশের অর্থনীতির উদ্ধারকর্তা হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক।
গত এপ্রিলে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল জানিয়েছে, বাংলাদেশে যে ১৪ টন স্বর্ণ মজুত রয়েছে, তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দুই দশমিক ৬০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২১-২২ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মজুত স্বর্ণের মধ্যে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে রয়েছে পাঁচ হাজার ৮৭৬ কেজি, যা মোট স্বর্ণের ৪২ শতাংশ। এ ছাড়া ৪১ শতাংশ রয়েছে লন্ডনের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও এইচএসবিসি ব্যাংকে। বাকি দুই হাজার ৩৬২ কেজি স্বর্ণ রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে।
রিজার্ভ বহুমুখীকরণের জন্য বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই স্বর্ণ মজুত রাখে। বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে এক যুগ আগে ১০ টন স্বর্ণ সংগ্রহ করেছিল। এই ১০ টনসহ বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের মজুত স্বর্ণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ টনে।
৭৯০ টন স্বর্ণের মজুত নিয়ে নবম অবস্থানে রয়েছে ভারত। পাকিস্তানের অবস্থান ৪৬তম। বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তানের মজুত বেশি হলেও তাদের বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় ৪৪ শতাংশই সোনা।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, করোনা মহামারি ও অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও ২০২১ সালে ভারতে স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯৭ দশমিক ৩ টন, যার অর্থমূল্য ৩ লাখ ৪০ হাজার ৮৬০ কোটি রুপি। আর এই হিসাবই প্রমাণ করে যে, ভারতীয়রা এখনো এই হলুদ ধাতুতে আস্থা রাখছেন। আগের বছর দেশটিতে স্বর্ণের চাহিদা ছিল ৪৪৬ দশমিক ৪ টন, যার অর্থমূল্য ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৮০ কোটি রুপি।
স্বর্ণ কেনার ক্ষেত্রে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো গত বছর রেকর্ড গড়েছে। ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার এ প্রবণতা সামনের দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ইউবিএস। গত মে মাসে তারা জানিয়েছে, ২০২২ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ১ হাজার ৭৮ টন স্বর্ণ কিনেছে। এটি ১৯৫০ সালের পর সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর আগে ২০২১ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ৪৫০ মেট্রিক টন স্বর্ণ কিনেছিল। চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ৭০০ টন স্বর্ণ কিনেছে। ইউবিএস বলেছে, পরিমাণটি ২০২২ সালের তুলনায় কম। তবে তা ২০১০ সালের পর থেকে গড়ে ৫০০ মেট্রিক টনের চেয়ে বেশি।
ইউবিএস আরও বলেছে, ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার এ প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে আমাদের ধারণা। বছরের পর বছর ধরে মার্কিন ডলারই ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভের ভিত্তি। তবে সম্প্রতি স্বর্ণ কেনার ক্ষেত্রে সেই ব্যাংকগুলোই শীর্ষে রয়েছে, যারা বৈশ্বিক লেনদেনে ডলারের আধিপত্য খর্ব করতে আগ্রহী।
ইউবিএস ধারণা করছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার ঊর্ধ্ব চাহিদার কারণে এ বছরের শেষের দিকে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ২ হাজার ১০০ ডলার এবং ২০২৪ সালের মার্চের মধ্যে ২ হাজার ২০০ ডলারে গিয়ে ঠেকবে। ইউবিএস তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, স্বর্ণ রিজার্ভের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।
ভূরাজনৈতিক কারণেও কিছু দেশ স্বর্ণের মজুত বাড়িয়েছে, যেমন রাশিয়া ও চীন। গত দুই দশকে তারাই সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ কিনেছে। মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য ক্ষুণ্ন করতেই তারা এ সিদ্ধান্ত নেয়। আর রাশিয়া ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া অধিগ্রহণের পর পশ্চিমাদের যে নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়, তারপর স্বর্ণ কেনা বৃদ্ধি করে। ১৯৯৯ সাল থেকে যেসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ কিনেছে, তারা সবাই উদীয়মান বা উন্নয়নশীল দেশ। মূলত আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার নানা অভিঘাত থেকে রক্ষা পেতে তারা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকেছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান ড. শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে টাকার সার্কুলেশন থেকে শুরু করে সব কিছুর পেছনে স্বর্ণের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। চায়না, ভারতের মতো দেশগুলো এখন স্বর্ণ রিজার্ভ করছে, যে কারণে এসব জায়গায় চাহিদা বাড়ছে। স্বর্ণ অনেক মূল্যবান একটা পণ্য। কিন্তু, আমরা কেনো যেন এটার গুরুত্ব বুঝতে পারি না। এখনই আদর্শ সময়। আমাদের জিডিপি বাড়ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, আমাদের জীবনযাত্রার মান বাড়বে। তখন কিন্তু স্বর্ণের চাহিদা আরও বাড়বে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশে স্বর্ণের যে বাজার আছে, তা যদি আমরা ধরতে না পারি তাহলে কিন্তু আমরা ভুল করবো। পোশাক শিল্পকে যদি সুবিধা দিয়ে এ জায়গায় নিয়ে আসা যায়, তাহলে স্বর্ণকেও নিয়ে আসা যাবে। রপ্তানির ক্ষেত্রে পোশাক শিল্প যে সুবিধা পায়, স্বর্ণেরও পাওয়া উচিত। কারণ এটাও রপ্তানি পণ্য।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘খনিপ্রধান দেশ স্বর্ণ ব্যবসায় এগিয়ে যেতে পারেনি। যারা কাঁচামাল আমদানি করে স্বর্ণ রপ্তানি করেছে, তারাই এগিয়েছে। এটিও আমাদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা। রপ্তানি বাজারে আমাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে গেলে আমাদের আমদানিও বাড়াতে হবে।’
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে বাজুস ফেয়ারে অংশ নিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীর বলেন, ‘আমরা সবাই ইন্ডাস্ট্রির কথা বলি। কিন্তু আমরা ইন্ডাস্ট্রি কেন করব? ইন্ডাস্ট্রি করার জন্য কিছু নীতি দরকার। যেটা আমাদের সরকার চেষ্টা করছে বানানোর জন্য। এ জন্য আমরা খুশি। কিন্তু আমরা ভারতের সাথে কীভাবে প্রতিযোগিতা করব? গার্মেন্টে ভারত কি আমাদের আগে যায়নি? ভারত গার্মেন্টে আগে চলে গেছে। আমরা জুয়েলারিতেও পারব। ভারতের অনেক বড় বড় জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের দক্ষ লোকজন কাজ করেন। বাংলাদেশের মানুষদের মতো সূক্ষ্ম হাত আর কোথাও নাই। তাদেরকে দেশে এনে কাজে লাগানো যায়। এজন্য আমাদের কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারকে সহায়তা করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার যদি আমাদের জায়গা দেয় তাহলে এখান থেকে সোনা রপ্তানি করা যাবে। এবং এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনে সবাইকে ১০ বছরের জন্য ট্যাক্স ফ্রি দেওয়া হয়। সেই সুবিধা যদি আমাদের দেওয়া হয় তাহলে সব কিছু (জুয়েলারি শিল্পের) বৈধ পথে চলে আসবে। আমাদের আইন যদি সংস্কার না করা হয়, তাহলে কোনো দিনই বাংলাদেশে চোরাচালান বন্ধ হবে না। যে যত বড় বড় কথাই বলি না কেন। আইন শিথিল করেন, ট্যাক্স শিথিল করেন, সব কিছু সোজা হয়ে যাবে। গার্মেন্টে ভ্যালু অ্যাডিশন বেশি নাই, সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৭ শতাংশ ভ্যালু অ্যাডিশন হয়। কিন্তু জুয়েলারিতে ৫০ শতাংশ ভ্যালু অ্যাডিশন করা সম্ভব।’
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, ‘আমাদের যে রপ্তানি আয়, সেটার ৮৬ শতাংশ আসে একটা খাত থেকে। এতোদিন ধরে আমাদের দেশ একটা খাতের উপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে আছে, এটা আসলে খুব সুবিধাজনক কিছু না। আমরাও চাই রপ্তানি আয় বিকেন্দ্রীকরণ হোক। আমরা যখন টাকা জমাই তখনও আমরা বিভিন্ন জায়গায় জমাই, যাতে একটা জায়গা ধ্বসে গেলেও বিপদ না হয়৷ সেজন্য, বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নতুন সেক্টর এলে আমরাও সেটাকে সহায়তা করতে চাই।’
বাজুসের সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘স্বর্ণ খাতের উন্নয়ন ও রপ্তানি করার জন্য ৫০ বছর ধরে বলে আসছি, ‘কোনো কাজ হয়নি। যে তিমিরে ছিল, সেখানেই রয়ে গেছে। স্বর্ণ শিল্প নীতিসহায়তা পেলে বাংলাদেশের অর্থনীতির উদ্ধারকর্তা হতে পারে।’
এ প্রসঙ্গে শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, ‘জুয়েলারি শিল্পটাকে আমরা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই, বিশ্ববাজারে নিয়ে যেতে চাই এবং আমাদের দেশীয় বাজারও বিশাল। যদি এই শিল্পটাকে ভারতের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারি তাহলে আমাদের কোনো সংকটই থাকবে না, তাদের চেয়ে কম দামে মার্কেট ধরতে পারব।’ তিনি বলেন, ‘দেশের স্বর্ণ খাতকে এগিয়ে নিতে বাজুস উদ্যোগ নিয়েছে। আমার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যা যা করণীয় সব করার চেষ্টা করবো।’

