স্বর্ণ রপ্তানি : বাস্তবায়ন হচ্ছে না নীতিমালা

শরীফুল রুকন : দেশে স্বর্ণের বাণিজ্যিক ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি রপ্তানির লক্ষ্যে স্বর্ণ আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা, আমদানি ও পরবর্তী বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, স্বর্ণালঙ্কার রপ্তানিতে নীতি সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে এ খাতের বিকাশের লক্ষ্যে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে ২০১৮ সালে দেশে স্বর্ণ নীতিমালা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ওই বছর অক্টোবরে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন পাওয়ার পর ‘স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮’ কার্যকর করা হয়। এরপর সোনা আমদানির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি গাইডলাইন তৈরি করে এবং ১৮টি প্রতিষ্ঠান এবং একটি ব্যাংককে অনুমোদিত ‘গোল্ড ডিলার’ হিসেবে লাইসেন্স দেয়। এসব অনুমোদিত গোল্ড ডিলাররাই স্বর্ণের বার এবং স্বর্ণালঙ্কার আমদানি করতে পারেন।

ওই নীতিমালায় স্বর্ণের বার এবং স্বর্ণালঙ্কার আমদানির সুযোগ থাকলেও অপরিশোধিত স্বর্ণ আকরিক বা আংশিক পরিশোধিত স্বর্ণ আমদানির বিষয়ে কিছু ছিল না। কিন্তু রপ্তানি করতে চাইলে অবশ্যই নিজস্ব শোধনাগার থাকতে হয়। সে কারণে ২০২১ সালের ১৭ মে ‘স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮ (সংশোধিত-২০২১)’ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। নীতিমালা সংশোধন করে অপরিশোধিত স্বর্ণ আকরিক, আংশিক পরিশোধিত স্বর্ণ আমদানি এবং শোধনাগার স্থাপনের পথ তৈরি করা হয়।

স্বর্ণ নীতিমালায় দেশীয় বাজারের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, রপ্তানিতে ইচ্ছুক ব্যবসায়ীদের বিনা শুল্কে স্বর্ণের ব্যবহার অথবা শুল্ক প্রত্যর্পণের আওতায় সুবিধাদি প্রদান করতে হবে। তাদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু এসব সুবিধা এখনও পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা।

স্বর্ণ নীতিমালার উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘স্বর্ণালংকার, স্বর্ণবার, স্বর্ণ কয়েন রপ্তানিতে উৎসাহ এবং নীতি সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে রপ্তানি বৃদ্ধি করা হবে; স্বর্ণালংকার, স্বর্ণবার, স্বর্ণ কয়েন রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ক/বন্ড সুবিধা যৌক্তিকীকরণ ও সহজীকরণ করা হবে।’ কিন্তু এসব বিষয়ে এখনো সরকারি ঘোষণা আসেনি বলে জানান সোনা ব্যবসায়ীরা।

বর্তমানে স্বর্ণের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রয়েছে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ শুল্ক। এছাড়া আকরিক সোনা আমদানিতে আরোপ করা হয়েছে সম্পূরক শুল্ক (সিডি) ৫ শতাংশ। আংশিক পরিশোধিত সোনার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্কহার বিদ্যমান রয়েছে।

স্বর্ণ রপ্তানিতে কী কী প্রণোদনা ও বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে সেগুলোও উল্লেখ করা হয়েছে, স্বর্ণ নীতিমালায়। নীতিমালার ৯.৩ ধারায় উল্লেখ করা হয়, ‘বৈধভাবে স্বর্ণালংকার, স্বর্ণবার, স্বর্ণ কয়েন রপ্তানি উৎসাহিত করতে রপ্তানিকারকদেরকে স্বর্ণালংকার, স্বর্ণবার, স্বর্ণ কয়েন তৈরির কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে রেয়াতসহ বিভিন্ন প্রকারের
প্রণোদনামূলক বিশেষ সহায়তা প্রদান করা হবে।’

অথচ স্বর্ণ পরিশোধনাগারের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির শুল্ক কর নেওয়া হচ্ছে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ, যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এ কারণে প্রাথমিক উৎপাদন ব্যয়ও বাংলাদেশে বেশি হচ্ছে। এতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা।

নীতিমালার ৯.৩ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘স্বর্ণালংকার রপ্তানির উদ্দেশ্যে আমদানিকৃত স্বর্ণের ক্ষেত্রে ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধা প্রদান করা হবে।’ ৯.৫ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘রপ্তানির জন্য প্রস্তুতকৃত স্বর্ণালংকার, স্বর্ণবার, স্বর্ণ কয়েন এ আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদনযোগ্য ধাতু অবচয়ের পরিসীমা প্রতিপালন করতে হবে।’

৯.৭ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘স্বর্ণালংকার, স্বর্ণবার, স্বর্ণ কয়েন রপ্তানির ক্ষেত্রে বন্ডেড ওয়্যারহাউজিং সুবিধা দেওয়া হবে।’ ৯.৮ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘হস্তনির্মিত ও মেশিনে তৈরি অলংকার রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনা সুবিধা প্রদান করা হবে।’ এসব সুপারিশ থাকলেও তা কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হবে, তার সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালায় বলা নেই।

স্বর্ণ নীতিমালার ৯.৯ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘স্বর্ণালংকার রপ্তানিকারকগণের অনুকূলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি বরাদ্দ বিষয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বিশেষভাবে বিবেচনা করবে।’ কিন্তু বারবার আশ্বাস দিলেও এখনও জমি বরাদ্দ দেয়নি সরকার।

৯.১১ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘রপ্তানি নীতিতে বিশেষ উন্নয়নমূলক ও রপ্তানিমুখী শিল্পখাতের অনুকূলে প্রদত্ত সকল সুযোগসুবিধা স্বর্ণালংকার, স্বর্ণবার, স্বর্ণ কয়েন রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রদানের সুপারিশ প্রেরণ করা হবে।’

অথচ এ ধরনের কোনো সরকারি উদ্যোগ এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি। স্বর্ণের কাঁচামাল ও মেশিনারিজ আমদানির ক্ষেত্রে সব ধরনের শুল্ক কর অব্যাহতি প্রদানসহ ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ বা ট্যাক্স হলিডে প্রদানের প্রস্তাব বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) দিয়ে আসলেও তা এখন পর্যন্ত আমলে নেয়নি সরকার।

স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা জানান, তৈরি পোশাকসহ কয়েকটি খাতের পণ্য রপ্তানিতে প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। কিন্তু স্বর্ণালংকার রপ্তানিতে কোনো প্রণোদনা নেই। এছাড়া ডিলারশিপ লাইসেন্স দেওয়া হলেও শুল্ক কর দিয়ে স্বর্ণ আমদানিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অবৈধভাবে বেশি আমদানি হচ্ছে।

বাজুসের সাবেক সভাপতি গঙ্গাচরণ মালাকার বলেন, ‘একজন সোনা আমদানিকারক হতে হলে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা থাকতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক যাদের লাইসেন্স দিয়েছে, বেশিরভাগেরই সেই সক্ষমতা নেই।’

বাজুসের সাবেক সভাপতি ও ডিস্ট্রিক্ট মনিটরিং স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দিলীপ কুমার রায় বলেন, ‘সরকার স্বর্ণ নীতিমালা ঘোষণা দিয়েছে। তবে এই নীতিমালা পরিপূর্ণ নয়। স্বর্ণ নীতিমালায় শুধু আমদানির ব্যবস্থা আছে। কিন্তু রপ্তানি করা, শিল্প গঠন করাসহ আরও বেশ কিছু বিষয় আমরা নীতিমালায় পাইনি। ফলে যারা স্বর্ণের ডিলার রয়েছেন, তারা সহজে আনতে পারছেন না।’

স্বর্ণ নীতিমালায় নানা নীতি সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হলেও রপ্তানি নীতি আদেশে জুয়েলারি শিল্পকে সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনার ১৪ খাতের তালিকায় স্থান দেওয়া হয়নি। এটি স্থান পেয়েছে ১৮ শিল্প খাতের (বিশেষ উন্নয়নমূলক খাত) একটি হিসেবে।

এভাবে সরকারের সদিচ্ছার অভাবে রপ্তানি সম্ভাবনার দরজা উন্মুক্ত হয় না স্বর্ণ শিল্পে। যার প্রমাণ সোনা খাতের রপ্তানি চিত্রে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ১৯৯৫ সালে প্রথম রপ্তানি শুরু হওয়া এই খাতটি গত ২০২১-২২ অর্থবছর এসে মাত্র ১ কোটি ২০ লাখ ৯০ হাজার ২০০ টাকার পণ্য রপ্তানি করেছে।

এই প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমতুল মুনিম বলেন, ‘সোনা আমদানিতে সরকার নীতিগত সহায়তা দিলেও কোনো কাজে আসেনি। সেখানে অনেক অদেখা বিষয় আছে এবং লেনদেন ও বিক্রিতে স্বচ্ছতা আসেনি। কোন কোন খাতে সহায়তা দিলে স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে এবং পরনির্ভরশীলতা কমে আসবে- সে বিষয়ে আমরা কাজ করছি।’

সংশোধিত স্বর্ণ নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিশ্বের অলংকার উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে বেলজিয়ামসহ ইউরোপের দেশ, ভারত, চীন অন্যতম। আর অলংকার আমদানিকারক দেশের মধ্যে সুইজারল্যান্ড, চীন, যুক্তরাজ্য, হংকং, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বেলজিয়াম, জার্মানি ও সিঙ্গাপুর শীর্ষ স্থানে রয়েছে। ২০১৯ সালে বিশ্বে মেশিন ও হাতে তৈরি সোনার অলংকারের বাজার ছিল ২২ হাজার ৯৩০ কোটি ডলারের। ২০২৫ সালে সেটির আকার বেড়ে ২৯ হাজার ১৭০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে। হাতে তৈরি অলংকারের মূল্য সংযোজন বেশি। সারা দুনিয়ার ৮০ শতাংশ হাতে তৈরি অলংকার বাংলাদেশ ও ভারতে তৈরি হয়। তবে নানা কারণে রপ্তানি বাজারে ভালো করতে পারেনি বাংলাদেশ। এমনকি সোনার উচ্চমূল্যের কারণে দেশের বাজারও সংকুচিত হচ্ছে।

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে অলংকার রপ্তানি থেকে ভারতের আয় ছিল ৩৯.৩১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু স্বর্ণালংকার থেকে রপ্তানি আয় ছিল ৯ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও সরকারের যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে বিশ্বের স্বর্ণালংকার রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় নেই বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশ ভারত জুয়েলারি পণ্য রপ্তানিতে বিশ্বে তৃতীয়। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও পাকিস্তান থেকে স্বর্ণালংকার রপ্তানি হলেও বাংলাদেশ থেকে হয় না।

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি) জুয়েলারি পণ্য রপ্তানিতে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ দেশের তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে স্থান হয়নি বাংলাদেশের। এ তালিকায় শীর্ষ পাঁচ দেশ হচ্ছে চীন, সুইজারল্যান্ড, ভারত, হংকং ও ইতালি। বিশ্বে রপ্তানি করা গহনার অর্ধেকের বেশি (৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ) এই পাঁচটি দেশের দখলে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী ৯ হাজার ৮৮০ কোটি ডলারের জুয়েলারি পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ২০২১ সালে এ অঙ্ক ছিল ৭ হাজার ২০০ কোটি ডলারের। এক বছরের ব্যবধানে জুয়েলারি পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ।

ডব্লিউজিসির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চীন সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলারের স্বর্ণালংকার রপ্তানি করেছে (মোট বৈশ্বিক রপ্তানির ১২ দশমিক ৬ শতাংশ)। এ ছাড়া সুইজারল্যান্ড ১ হাজার ১৪০ কোটি ডলারের (১১.৬%), ভারত ১ হাজার ৬০ কোটি (১০.৭%), হংকং ৯৩০ কোটি (৯.৪%), ইতালি ৮৯০ কোটি (৯%), যুক্তরাষ্ট্র ৭২০ কোটি, (৭.৩%), তুরস্ক ৬৮০ কোটি (৬.৯%), ফ্রান্স ৫২০ কোটি (৫.২%), সংযুক্ত আরব আমিরাত ৩৮০ কোটি (৩.৮%), থাইল্যান্ড ৩৩০ কোটি (৩.৪%), সিঙ্গাপুর ২৯০ কোটি (২.৯%), যুক্তরাজ্য ২৯০ কোটি (২.৯%), ইন্দোনেশিয়া ২৬০ কোটি (২.৬%), জার্মানি ১৬০ কোটি (১.৬%) ও আয়ারল্যান্ড ১১০ কোটি (১.১%) ডলারের স্বর্ণালংকার রপ্তানি করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে তালিকায় ভারতের পরে রয়েছে শ্রীলঙ্কা (৪৩তম), নেপাল (৭০তম) ও পাকিস্তান (৭১তম)। এসব দেশ থেকে যথাক্রমে ৬৫ হাজার ৫৮০ ডলার, ৭ হাজার ৫৯৪ ডলার ও ৬ হাজার ৩১০ ডলারের স্বর্ণালংকার রপ্তানি হয়েছে গত বছর।

ভারতের হস্তনির্মিত সোনার গহনার চাহিদা সারা বিশ্বজুড়ে রয়েছে৷ সোনার বড় রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে ভারতের উঠে আসার পেছনে বেশ কিছু কারণ পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে। অনলাইনে বিভিন্ন লেখা পড়ে জানা যায়, যেসব দেশে ভারতীয় জনসংখ্যা বেশি সেখানেই মূলত ভারতীয় সোনার গহনার চাহিদা বেশি৷

এছাড়া সোনার গয়না রপ্তানিকে উৎসাহিত করার জন্য জিজেইপিসি নামে পরিচিত দ্য জেম অ্যান্ড জুয়েলারি এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিল ১৯৬৬ সালে ভারত সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল৷ বাংলাদেশে এ ধরনের বিশেষায়িত নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখন পর্যন্ত গড়ে উঠেনি।

১৯৭৩ সালে ভারতে তৈরি হয় এসইইপিজেড (সান্তাক্রুজ ইলেক্ট্রনিক্স একপোর্ট প্রসেসিং জোন)। এটি বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি জোনগুলোর একটি৷ আর সোনার গয়নার প্রায় ৮৪ ভাগ অংশ ওই জোন থেকেই রপ্তানি করা হয়৷ অন্যদিকে স্বর্ণ শিল্পের উন্নয়নে নিরাপদ জায়গার জন্য ঢাকার মধ্যে তিন হাজার একরের একটি জায়গা চেয়ে আসছে বাজুস; কিন্তু এ বিষয়ে এখনও সহযোগিতা করতে পারেনি সরকার।

বাজুসের সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ভারত বিদেশে সোনার অলংকার রপ্তানির মাধ্যমে বেশ ভালো পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছে প্রতিবছর। বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত সোনার অলংকার বিদেশে রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও তা সরকারের সময়োপযোগী যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে মোটেও কাজে লাগানো যায়নি এতদিন। ভারতের জুয়েলারি পণ্য বিনা শুল্কে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করার সুযোগ রয়েছে। আমাদের দেশেও এ ধরনের নীতি-সহায়তা দেওয়া উচিত। আমাদের দেশের স্বর্ণশিল্পীদের হাতের কাজের খুব সুনাম রয়েছে। তাদের তৈরি স্বর্ণালংকার বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে খ্যাতি অর্জনের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও সম্ভব।’

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশি গহনা রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দায় জুয়েলারি পণ্য রপ্তানি অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। বাংলাদেশি জুয়েলারি কারিগরদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের জুয়েলারি কারিগরদের গহনা বিশ্বমানের। দেশের জুয়েলারিশিল্প এখন অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের কাজে লাগাতে হবে। রপ্তানির ক্ষেত্রে যত প্রতিবন্ধকতা আছে, সব ব্যবসায়ীদের নিয়ে শনাক্ত করে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ বলেন, ‘স্বর্ণ খাতকে নীতিসহায়তা দিতে আমরা সুপারিশ করেছি। এসব সুপারিশ কার্যকরের দায়িত্ব অন্য বিভাগের। আমরা জুয়েলারিকে বিশেষ উন্নয়নমূলক খাতে রেখেছি। নিশ্চয়ই খাতটি আগামীতে অগ্রাধিকার তালিকায় উঠে আসবে।’

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘জুয়েলারি খাত হবে দেশে আগামীর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিল্প। দেশে রিফাইনারি স্থাপনের মাধ্যমে স্বর্ণবার উৎপাদন এবং তা দিয়ে তৈরি স্বর্ণালংকার রপ্তানির বড় সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপ দেশে গোল্ড রিফাইনারি স্থাপন করতে যাচ্ছে। এ উদ্যোগ দেশের স্বর্ণশিল্পের একটি ব্রেক থ্রু হবে। দেশে স্বর্ণশিল্প কেন গড়ে ওঠা দরকার, সে বিষয়গুলো নীতিনির্ধারকদের অনুধাবন করতে হবে। এরমধ্য দিয়ে অলংকার রপ্তানির একটি বিরাট সুযোগ আসবে এবং অনেক বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে স্বর্ণ নীতিমালাটি আরও পর্যালোচনা করা যেতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, সরকারের পক্ষ থেকে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে আলোচনা করা উচিত দেশে স্বর্ণশিল্প গড়ে উঠতে আর কী কী করা প্রয়োজন কিংবা এ ক্ষেত্রে কী কী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। দেশে রপ্তানিমুখী স্বর্ণশিল্প গড়ে উঠলে এ খাতে বিশেষায়িত কারিগর শ্রেণিও তৈরি হবে, যা কর্মসংস্থানেও ব্যাপক অবদান রাখবে।’

শেষ