যেসব কারণে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি


ঢাকা : মৌসুমের আগেই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। দেশের বড়-ছোট, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। কোথাও কোথাও ঠাঁই নেই তিল ধারণের। শুধু রাজধানীতেই নয়, ডেঙ্গুতে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সারাদেশে।

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। যা এ যাবৎকালে মৃত্যুর সর্বোচ্চ রেকর্ড। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন— মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এর আগে এত মৃত্যু দেখেনি দেশের মানুষ।

মুশতাক হোসেন একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক এই প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এই বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব অনেক আগেই এসেছে। সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। এটা এখন মহামারির দিকে চলে যাচ্ছে। দেশে একটা জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন— ডেঙ্গু মোকাবেলায় গতানুগতিক পদক্ষেপ বাদ দিতে হবে। বিশেষ পরিকল্পনা নিতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলন, ঢাকার বাইরে অধিকাংশ মানুষ প্রথমবারের মতো আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে খুবই খারাপ ধরনের রোগীর সংখ্যা শহরের তুলনায় বা ঢাকার তুলনায় কম। তবে গত দুই বছরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। এভাবে ডেঙ্গু ছড়াতে থাকলে আগামীতে গ্রামাঞ্চলে আরও খারাপ পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। কারণ আগামীতে গ্রামাঞ্চলে মানুষ দ্বিতীয়বারের মতো আক্রান্ত হবে। তখন সেখানেও পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্যে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আসে না বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন— ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও বাসায় বসে চিকিৎসা নিচ্ছেন এমন রোগীর তথ্য যুক্ত হয় না। এমনকি সব বেসরকারি হাসপাতালের তথ্যও নেই এখানে।

গত সপ্তাহে স্বাস্থ্যবিষয়ক এক সেমিনারে বক্তারা বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে এখন বিশেষ স্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসাবে ঘোষণা করার সময় এসেছে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলেছেন, আশঙ্কাজনকভাবে ডেঙ্গু রোগী বাড়লেও এখনো বিশেষ পরিস্থিতি ঘোষণার মতো সময় এসেছে বলে তারা মনে করেন না।

কেন মারাত্মক হয়ে উঠল ডেঙ্গু পরিস্থিতি?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন— কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঘটলেও তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে এ বছর মৌসুমের আগে আগে সেটা প্রকট হয়ে উঠেছে। কয়েক বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু রোগীদের অবস্থা খুব তাড়াতাড়ি অবনতি হচ্ছে।

মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু আসার ক্ষেত্রে গত ও চলতি বছরের মাঝে কোনো বিরতি ছিল না। শীতকালেও আমরা রোগী পেয়েছি। চলতি বছর মৌসুম শুরু হওয়ার এক দেড় মাস আগে থেকেই আমরা অনেক বেশি রোগী পাচ্ছি।

বাংলাদেশে প্রথম ডেঙ্গু শনাক্ত হয় ১৯৬৫ সালে। সে সময় এই রোগটি ঢাকা ফিভার নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে রোগটির সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক বলেন, আক্রান্তদের মধ্যে ডেঙ্গুর চারটি ধরন বা সেরোটাইপ পাওয়া যাচ্ছে। যারা এখন আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের মধ্যে দ্বিতীয় বার আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাই বেশি। ২০০০ সালের আগে আমরা দেখেছি, মানুষ ডেঙ্গুর একটা ধরনে আক্রান্ত হতো। ফলে তাদের মধ্যে একটা প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠতো। কিন্তু যখন মানুষ ৪টা ধরনেই আক্রান্ত হতে শুরু করে, তখন প্রতিরোধ ক্ষমতা তেমন কাজ করে না। ফলে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তিনগুণ বেড়ে যায়।

রাশেদা সুলতানা একজন চিকিৎসক। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। তবে প্রতিটি হাসপাতালেই এখন ডেঙ্গু কর্নার আছে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা প্রস্তুত রয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও আমরা চিকিৎসা দিতে প্রস্তুত আছি।

গেল বছর, অর্থাৎ ২০২২ সালে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৬২ হাজার ৩৮২ জন। মৃত্যু হয়েছিল রেকর্ড ২৮১ জনের। সে বছর জুলাই, আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তার আগের বছরেও ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক ছিল। তবে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল ২০১৯ সালে।

গত কয়েক বছর ডেঙ্গুর এমন সংক্রমণ সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?— এই প্রশ্নের জবাবে ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু মোকাবেলায় যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেটা গতানুগতিক। সংশ্লিষ্টরা হয়তো মনে করছেন এটা সাময়িক রোগ, কিছুদিন পরেই চলে যাবে। ফলে কার্যকর বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো ব্যবস্থা কোথাও নেওয়া হচ্ছে না। এতে ডেঙ্গু একেবারে জেঁকে বসেছে। যে গুরুত্ব দিয়ে আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়া দরকার, সেটা হচ্ছে না। এটা যে একটা মহামারি, সেরকম কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ে বড় ধরনের গবেষণা, নজরদারি নেই। এখন পর্যন্ত শুধু হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের তথ্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাছে আসছে। কিন্তু এর বাইরেও যে অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, ঘরে বসে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের তথ্য কোথাও নেই। মশা দমনেও দেশজুড়ে বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি মশা দমনে যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোর কার্যকারিতা আছে কিনা, তাও কারও জানা নেই।

ড. মুশতাক বলেন, এডিস মশার ঘনত্ব বেড়ে গেছে। শহরে গ্রামে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতলের ব্যবহার বাড়ায় পানি জমে যাওয়া, নগরায়নের ফলে পানি আটকে থাকার কারণে ডেঙ্গু মশা বেড়েছে, ফলে রোগীও বেড়ে গেছে।