শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

আজাদ ভাই, আপনাকে কখনোই ভুলবো না

প্রকাশিতঃ ১২ অগাস্ট ২০২৩ | ৮:৫১ পূর্বাহ্ন


মোহাম্মদ সাজ্জাত হোসেন : আমার হোয়াটসঅ্যাপে প্রায় প্রতিদিন একজনের ফোন আসতো। কখনো খুব ভোরে আবার অনেক সময় মধ্যরাতেও। আমিও ফোন করতাম যেকোনো সময়ে। যেকোনো সংকটে এই মানুষটাকে ফোন করলে সাড়া পাওয়া যেত। বেশ কয়েকদিন ধরে সেই নম্বর থেকে আর ফোন আসছে না। আর কখনো আসবেও না। কারণ যিনি ফোনটা করতেন তিনি আর বেঁচে নেই। কয়েকদিন আগে চলে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে। বয়সে আমার চাইতে কয়েক বছরের বড়। মারা গেলেন ক্যান্সারের সাথে অনেক যুদ্ধের পর।

বলছি আজাদ তালুকদার ভাইয়ের কথা। ওনার সাথে আমার পরিচয় হয় ২০০৪ সালে। পরিচয় করিয়ে দেন সাইফুল ভাই। সাইফুল ভাই তখন বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলার চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক। আজাদ ভাই তখনও একুশে পত্রিকার সম্পাদক। সাইফুল ভাই তখন সেই পত্রিকাটির সহসম্পাদক। তখন সেটা মাসিক হিসেবে বের হতো। অফিস ছিলো খুব ছোট, চেরাগি পাহাড়ের লুসাই ভবনের পাশের ভবনে। সাইফুল ভাই পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় যখন বলেন, ওনি একুশে পত্রিকার সাংবাদিক। আমি হাত মেলানোর সময় বলেছিলাম, ‘এই পত্রিকার নাম কখনো শুনি নাই।’

তখন আজাদ ভাই বলেছেন, ‘এটা ছোট পত্রিকা, প্রতি মাসে বের হয়। আমাকে একাই অনেক কষ্ট করে বের করতে হয়।’ এ কথা বলে কয়েকটা সংখ্যা আমাকে উপহার হিসেবে দেন। বাসায় এসে সেই সংখ্যাগুলো পড়লাম। পড়ে খুবই ভালো লেগেছে। ব্যতিক্রমী লেখা থাকে। এক ধরণের যাদুও থাকে। খুবই গোছানো প্রতিবেদনগুলো।

কয়েকদিন পর চেরাগি পাহাড় মোড়ে গেলে ওনার সাথে দেখা হলে বলেছি আপনার পত্রিকার লেখাগুলো ভালো লেগেছে। প্রায় দেখা হতো চেরাগিতে গেলে। সাইফুল ভাইসহ প্রায় যেতাম সেই অফিসটাতে। সন্ধ্যার পর সেখানে অনেক সাংবাদিক আড্ডা দিতেন। সেই আড্ডায় আমিও প্রায় থাকতাম। একবার কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম আজাদ ভাইয়ের আরও দুই ভাই আছেন, একজনের নাম শাহাদাৎ, অন্যজনের নাম শওকত। তখন আমি বললাম আমারও এক ভাইয়ের নাম শাহাদাৎ এবং অন্য একভাইয়ের নাম শওকত। তাছাড়া আমারও বংশ পরিচয় হলো তালুকদার বংশ। আমাদের পূর্ব পুরুষরা নামের শেষে তালুকদার লিখতেন। আমার বাবা লিখতেন না বলে আমাদের ভাইদের নামের পেছনে তালুকদার লেখা হয় নাই। এরপর আজাদ ভাই বললেন, ‘আমার ডাক নাম ছিলো সাজ্জাদ। পুরো নাম আজাদ হোসেন তালুকদার। এখন ডাক নামে কেউ ডাকে না।’

ধীরে ধীরে ওনার সাথে আমার সম্পর্কটা খুবই আন্তরিক হয়ে উঠে। ওনার সাংবাদিক বন্ধুদের সাথেও আমার ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠে। একবার চেরাগি পাহাড়ের লুসাই ভবনের সামনে ওমর কায়সার ভাই (প্রথম আলোর চট্টগ্রাম অফিসের বার্তা সম্পাদক), আলমগীর সবুজ (দেশ টিভির চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান) ও আজাদ ভাইদের উপর বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলা হয়। তখন ওনি ও সবুজ ভাই, সাইফুল ভাই মারাত্মক জখম হন। রিয়াজ হায়দার ভাইসহ আমি ওনাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের তখনকার নেতাদের সহযোগিতা নিয়ে ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। এরপরে তিনি যতদিন সুস্থ হননি ততদিন প্রায় প্রতিদিন আমি ওনার বাসায় দেখতে যেতাম। এভাবে ওনার পরিবারের সকল সদস্যের সাথে আমার সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। তিনি আমাকে সবসময় নাম ধরে ডাকলেও আপনি বলে সম্বোধন করতেন। আমি অনেকবার বলেছি বয়সে আপনার কাছ থেকে ছোট হবো আমি, তারপরও আপনি করে বলতেন।

২০০৭ সালে আমার বাবা যেদিন মারা যান, সেদিন বিকেলে আজাদ ভাইকে ফোন করে জানাই আমি। তিনি বললেন, ‘আপনি যে কাউকে দিয়ে ওনার একটা ছবি ও কখন জানাজা হবে সেটা পাঠান।’ সন্ধ্যায় আমি ওনার অফিসে গিয়ে উপস্থিত হলাম। আমি আসাতে তিনি ছবি নিয়ে জানাজার স্থান ও কখন হবে সেগুলো লিখে নিয়ে আমাকে জোর করে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। আমি যখন ছবি প্রিন্ট ও বিভিন্ন পত্রিকায় যাওয়ার জন্য কিছু টাকা দিতে চাইলাম, তখন তিনি রাগ করে আমাকে জোর করে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। পরের দিন বাংলাদেশের সমস্ত পত্রিকায় বাবার মৃত্যুর সংবাদ ছাপানো হয়। বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের খবরেও পাঠ করা হয়েছে। এরপর থেকে ওনার প্রতি আমার আলাদা ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। অনেক সময় ওনার সাথে বিভিন্ন কারণে রাগ হলেও বাবার এ-বিষয়টির কারণে আমার সব রাগ পানি হয়ে যেত।

আজাদ ভাইয়ের আকদ অনুষ্ঠানের পর একদিন ভাবীকে নিয়ে মিমি সুপার মার্কেটে আমার দোকানে হাজির। ভাবীকে মোবাইল উপহার দেবেন, আমি যাতে পাশের দোকান থেকে দেখে দেই, সেজন্য এসেছেন। এরপর আনুষ্ঠানিক বিয়ের অনুষ্ঠানে আমাকে দায়িত্ব দেন বরের গাড়ি ঠিক করা থেকে সাজানো সবকিছু যেন আমি করি। এভাবে বিভিন্ন সময়ে ওনার সাথে আমাকে সময় দিতে হয়েছে একজন বন্ধু ও ভাইয়ের মতো।

এরপর সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকায় তিনি চট্টগ্রামের দায়িত্ব পান। পরে সেখান থেকে বৈশাখী টেলিভিশন, এরপর সর্বশেষ একাত্তর টেলিভিশনে কাজ করেন। অনেক সময় নিউজের জন্য তিনি আমাকে নিয়ে যেতেন। আমার বাইকের পিছনে ক্যামরাম্যান ও তিনি বসতেন। চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে নিউজ সংগ্রহের জন্য আমি থাকতাম ওনার সঙ্গী হয়ে। একবার ঈদের দিন দুপুরে ফোন করে বললেন, ‘একটু রাঙ্গুনিয়া যেতে হবে বাড়িতে। আমি চাই আপনি চলুন। সন্ধ্যার আগে ফিরতে হবে কারণ সন্ধ্যায় ফেরি বন্ধ হয়ে যাবে।’

তখন রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া গ্রামে যেতে চন্দ্রঘোনা ফেরি পার হতে হতো। ওনার একই গ্রামে ড. হাছান মাহমুদের বাড়ি। হাছান ভাই বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তখন। সেখানে পৌঁছানোর পর ফেরার সময় আজাদ ভাই বললেন, চলুন একবার মন্ত্রীর সাথে দেখা করে যাই। হাছান ভাইয়ের বাড়ি থেকে যখন বের হলাম তখন প্রায় সন্ধ্যা। পথে বৃষ্টিও হলো খুব। দুজনেই ভিজে গেলাম। কিছুক্ষণ পর আমার বাইকের হেডলাইটের আলো আর জ্বলছে না। চাঁদের স্বল্প আলোয় পাহাড়ের রাস্তায় কোনো রকমে বাইক চালাচ্ছি। পরে একটা চাঁদের গাড়ি আসাতে তার পিছনে থেকে ফেরি পর্যন্ত আসি। সেই গাড়ি না আসলে যেকোনো দুর্ঘটনা হতে পারতো। আমরা যখন পৌঁছাই তখন পুরো শরীর ভেজা আমাদের। ফেরিও বন্ধ হয়ে গেছে। পরে একটা নৌকা ঠিক করে সেটাতে মোটরসাইকেলসহ অনেক কষ্ট করে তুলে অন্য পাড়ে আসলাম। লিচুবাগানে একটা দোকান থেকে টর্চলাইট কিনে আজাদ ভাই পেছন থেকে সেটা জ্বালিয়ে ধরে রেখেছেন আর আমি প্রায় দু’ঘন্টা বাইক চালিয়ে বহদ্দারহাট এসে পৌঁছি। এটা আজাদ ভাইয়ের সাথে আমার স্মরণীয় একটা দিন। তিনি প্রায় এ কথা বলতেন।এভাবে তিনি আমার বন্ধুর মত বড় ভাই হয়ে উঠলেন।

আজাদ ভাই যেখানেই চাকরি করেছেন, কিন্তু কখনো একুশে পত্রিকা ছাপানো বাদ দেননি। তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক পাশাপাশি প্রুফ দেখা, প্লেট বের করে সেটা প্রেসে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে কাটিং করে পিনআপ করা সবগুলো একাই করতেন। একুশে পত্রিকাকে উনি নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন।

একাত্তর টিভি থেকে চাকরি ছাড়ার পর তিনি অনেকদিন ঢাকায় রামপুরা বনশ্রীতে ছিলেন। আমাকে নিয়মিত ফোন করতেন। ঢাকায় গেলে আমাকে সে বাসায় থাকতে হতো। ওনাকে কখনো আমি না করতে পারিনি। অনেক সময় আমরা গভীর রাত পর্যন্ত নিউজ নিয়ে জেগে থাকতাম। তিনি বলতেন আমি শুনতাম। আমি যে খুব বেশি বুঝতাম তা না। তিনি শোনাতে ভালোবাসতেন বলে আমিও মনোযোগ দিয়ে শুনতাম।

এরপর তিনি আর কোথাও চাকরি নেয়নি। একুশে পত্রিকাকে সাপ্তাহিক করলেন। সারাক্ষণ এটাতে লেগে থাকতেন। এই পত্রিকার অনেক সেরা নিউজ আমার দেওয়া তথ্যের উপর হতো। আমারও এক ধরনের মায়া বসে গেল এই পত্রিকার উপর। পরে যখন অনলাইন পোর্টাল হলো তখন প্রতিদিন প্রতি মূহুর্তে নিউজ হতে থাকলো। সাহসী নিউজের কারণে দেশব্যাপী এর পরিচিতিও বাড়তে থাকলো। ভালো বিজ্ঞাপনও পেতে থাকলো। পত্রিকাটি দাঁড়িয়ে গেলো, কিছু কর্মসংস্থান হলো। আমার সবচাইতে ভালো লাগতো আমি যখনই সমাজে কিছু অনিয়ম দেখতাম শুধু হোয়াটসঅ্যাপে দিতাম আজাদ ভাইকে, তখন মূহুর্তে নিউজ হয়ে যেত। এই পত্রিকার এক্সক্লুসিভ অনেক নিউজ আমার দেওয়া। আমার বন্ধু মহলে অনেকেই দুষ্টুমি করে বলতো একুশে পত্রিকা মানে সাজ্জাত। অনেক নিউজ ছাপতো আমি বলতাম বলে।

অনেক সময় আজাদ ভাই বলতেন, ‘সাজ্জাত কোনো এক সময় আপনার বিপক্ষেও নিউজ ছাপানো হবে। কোনো অনিয়ম দেখলে আপনাকেও ছাড়বো না।’ আমি শুধু হাসতাম। বলতাম অনিয়ম করার জন্য যে যোগ্যতা লাগে, সেটা এখনো হয়ে উঠেনি। অন্যায় কিছু দেখলে অবশ্যই করবেন। একাত্তর টিভিতে থাকা অবস্থায় একদিন রাতে ফোন দিয়ে আজাদ ভাই বললেন, আজ সিআরবিতে জোড়া খুন হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে একাত্তর জার্নালে কাকে রাখা যায় চট্টগ্রাম থেকে। আমি সাথে সাথে বললাম, ভালো বলতে পারেন সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্যে সীমান্ত তালুকদার ভাই। আজাদ ভাই বললেন, ‘তাহলে ওনাকে নিয়ে আসুন।’ সীমান্ত ভাইয়ের নম্বর আমি একজন থেকে নিয়ে ১২ বছর পর উনাকে ফোন দিয়েছি। পরে নিয়ে আসি। সেদিন সীমান্ত ভাই ভালো বলাতে চট্টগ্রামে আবার নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি।

একুশে পত্রিকার কিছু নিউজে আমি কষ্ট পেয়েছি। একটা হলো- করোনার সময় ডাক্তার ফয়সাল ইকবাল ভাই আমাকে ফোন করে কিছু মানুষকে নিয়ে গালাগাল করতে থাকেন। প্রথমে বিষয়টি আমি গুরুত্ব না দিলেও অতিমাত্রায় বলাতে পরে রেকর্ডিং অপশনে চাপ দেই। শেষের দেড় মিনিট রেকর্ড হয়ে যায়। সে বিষয়টি আজাদ ভাইয়ের সাথে শেয়ার করলে তিনি বলেন পাঠান তো আমাকে রেকর্ডটা। আমি সরল মনে পাঠালে তিনি আমার একটা কমেন্ট যুক্ত করে একটা নিউজ করে দেন, মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। এটা কেন করলেন, সেটা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা নিউজ হওয়ার মতো বিষয়। একজন সাংবাদিক হিসেবে এটা কিছুতেই আমি বাদ দিতে পারি না।’

এরপরে বিভিন্ন মিডিয়া হাউজ থেকে ফোন আসতে থাকে রেকর্ডটার জন্য। কী আর করা, সবাইকে দিতে হলো। প্রায় সব টিভি ও পত্রিকায় প্রচার হয়। শুধু একুশে পত্রিকার নিউজটা ৩৫ হাজার শেয়ার হয়েছে। আর এদিকে একটা গ্রুপ আমার পেছনে শত্রু হিসেবে লেগে রইলো। এটার জন্য উনার উপর রাগ থাকলেও একটা বিষয় আমার মাথায় থাকতো করোনা আইসোলেশন সেন্টার করার জন্য আমার যে উদ্যোগ সেটার শুরুতে উনার সহযোগিতা পেয়েছি। সহযোগিতাটা এমন- প্রথমে যখন ওনার সাথে শেয়ার করি তখন বললেন আগে একটা ফেসবুকে পোস্ট দিন। জায়গার ব্যবস্থা আল্লাহ করে দেবেন। এরপর জায়গা যখন খুঁজছি তখন উনি আমাকে বললেন সাতকানিয়া বাড়ি আবু সাহেব নামের এক ব্যবসায়ী আছেন তাঁর কয়েকটি কমিউনিটি সেন্টার আছে, কারও প্রয়োজন হলে তিনি দেবেন এমন কথা একটা টিভিতে বলেছেন, সেই রেকর্ডটা আমার কাছে আছে। আপনি আমিন ভাইকে দিয়ে অনুরোধ করান, পরেরটা আমি দেখবো। আমাকে আবু ভাইয়ের ফোন নম্বরটা দিলে আমি সেটা আমিন ভাইকে দেই। কিছুক্ষণ পর আমিন ভাই ফিরতি কলে আমাকে জানান আবু ভাই রাজি হয়েছেন। এভাবে শুরু হলো করোনা আইসোলেশন সেন্টারের যাত্রা। আমি বিশ্বাস করি এই সেন্টারে যে মহৎ কাজটি হয়েছে সেটার সওয়াব নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা দেবেন আজাদ ভাইকে। এরকম অনেক ভালো কাজ তিনি করেছেন।

কিছু ফানি নিউজ করতেন তিনি, আর রিপোর্টারের নাম লিখতেন হোসাইন সাজ্জাত। অনেকেই মনে করতেন নিউজটা আমি লিখেছি। মূলত সেই নিউজগুলো উনি করতেন। একবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রেজাউল করিমের একটা নাচের ভিডিওসহ নিউজ করলেন হোসাইন সাজ্জাত নাম দিয়ে। আরেকবার যুবলীগের একজন কেন্দ্রীয় সদস্য একটা সংবর্ধনার আয়োজন কীভাবে করলেন, সেটা শুনে নিউজ করলেন, হোসাইন সাজ্জাত নাম দিয়ে। এগুলো নিয়ে আমি যখন বলতাম উনি শুধু হাসতেন। আর বলতেন, ‘আপনি ছাড়াও চট্টগ্রামে অনেক সাজ্জাত নামের মানুষ আছে।’ আমি বলতাম, ‘দেখি সেই সাজ্জাত নামের রিপোর্টারকে।’ উনি শুধু হাসতেন।

অনেক সময় আমি কিছু বিষয় নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিলেও তিনি সেটা নিউজ করে দিতেন। একবার আলাপচারিতায় বলেছিলাম, চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের সভাপতি হবেন সুমন ভাই, সাধারণ সম্পাদক হবেন দিদার ভাই। তিনি এই তথ্যের ভিত্তি জানতে চাইলে সেটা বললাম। মুহূর্তে নিউজ হয়ে গেল। একদিন পর আবার দেখলাম নিউজটির বিপরীতে আর একটা নিউজ, সেখানে আবার আমার একটা কমেন্ট যুক্ত করে দিয়েছেন। নিউজটা দেখে অনেকে আমাকে ফোন দিলে আমি বিষয়টা নিয়ে আজাদ ভাইকে বললে তিনি বলেন, ‘আমি কি খুব বেশি ক্ষতি করে ফেলেছি সাজ্জাতের?’ আমি আর কিছু বলতে পারিনি।

আজাদ ভাইকে যখনই কোনো তথ্য দিতাম, তিনি সেটা গুরুত্ব দিয়ে অন্য কোনো সোর্স থেকে যাচাই করে কনফার্ম হয়ে নিউজ ছাপাতেন। সবসময় আমার তথ্য ওনি গুরুত্ব দিতেন ও বিশ্বাস করতেন। তবে একটা নিউজ ওনি না করে পরে আফসোস করেছেন। সেটা হলো সদ্য কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সম্মেলনের আগের দিন রাত ১টায় উনাকে বলেছি আমিন ভাই ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক হবেন আর সুজিত দাদা সাংগঠনিক সম্পাদক হবেন। বাকিগুলো অপরিবর্তিত থাকবে। উনি বলেছেন, ‘আমার মনে হয় না। তবে আমিন ভাইকে প্রমোশন দিতে পারে।’ এরপর আমি বিষয়টি সিভয়েস এর আলম দিদারকে দেই। সে বললো সত্যতা কতটুকু। আমি শতভাগ নিশ্চিত করাতে সেটা সিভয়েসে নিউজ হলো।পরেরদিন সেটা সত্য হলে আজাদ ভাই আফসোস করেন।

এবার যখন ভারত থেকে ওনাকে নিয়ে আসা হলো, আমি তখনও জানতাম না। হঠাৎ দেখলাম হাছান মাহমুদ ভাই ওনাকে দেখতে গেছেন, সেই ছবিটা ফেসবুকে। এর কয়েকদিন আগেও চট্টগ্রামে আজাদ ভাইয়ের বাসায় গেলেও এতটা অসুস্থ দেখি নাই। একজনকে ফোন দিয়ে জানতে পারলাম তিনি ঢাকার বিআরবি হাসপাতালে আছেন। সেইদিন ঢাকা ছিলাম বলে সরাসরি হাসপাতালে চলে যাই হাসান জাহাঙ্গীর ভাইসহ। আমাকে আজাদ ভাইয়ের ভাগিনারা দেখে সরাসরি ওনার কাছে নিয়ে যান। তখন ওনাকে কথা বলতে নিষেধ করেছেন ডাক্তার। কিন্তু আমাকে দেখে ওনার দুচোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো। খুব কষ্টে আমাকে বললেন, ‘সাজ্জাত আমাকে মাফ করে দিয়েন। আমি আপনার জন্য কিছু করতে পারলাম না।আমার শেষ সময় এখন।’

আমি ওনাকে থামিয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, সব ঠিক হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবেন। হাসান জাহাঙ্গীর ভাইকে দেখে আজাদ ভাই বললেন, ‘আপনার প্রমোশন হয়েছে জেনেছি। খুব খুশি হলাম। আপনাকে অভিনন্দন। সাজ্জাতকে একটু দেখে রাখবেন। সে খুব ভালো ছেলে। জীবনে কিছু করতে পারে নাই।’ হাসান জাহাঙ্গীর ভাই থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনি কষ্ট করে কথা বলবেন না।’ এরপর আমরা হাসপাতালে অনেকক্ষণ থেকে মন খারাপ করে চলে আসলাম। আমার বিশ্বাস ছিলো, মিরাকল কিছু একটা হবে। আজাদ ভাই একেবারে সুস্থ হয়ে যাবেন।

পরেরদিন আমি যখন চট্টগ্রামে ফিরছি, আমার স্ত্রী আজাদ ভাইয়ের বিষয়ে শুনে দেখতে যেতে চাইলো। আর বললো, ‘তুমি যখন কারাগারে উনি তখন চিকিৎসার জন্য ভারত ছিলেন, সেখান থেকে প্রতিদিন আমার হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দিয়ে খবর নিতেন। কিছু টাকাও পাঠিয়েছেন তোমার জন্য। তোমার জামিনটা যখন স্ট্রে করে দেয় সেটা শুনে তিনি হাসপাতালের ওটি রুম থেকে আমাকে ফোন দিয়ে কোথায় কার কাছে জানাতে হবে সেটাও বলেছেন। তিনি সত্যিকারের তোমার আপনজন। তোমাকে অনেক ভালোবাসে।’ আমার হাতে তখন সময় না থাকাতে বলেছি বৌকে, ‘আগামীবার যখন আসবো তখন তোমাকে নিয়ে যাবো। ঢাকায় একবার জ্যামে পড়লে টিকেট নষ্ট হবে।’

কয়েকদিন পর আবার ঢাকায় গিয়ে সরাসরি হাসপাতালে গিয়ে দেখি উনি এইচডিইউতে। অনেক অনুরোধ করে ভেতরে গেলে ওনাকে যে অবস্থায় দেখি তখন বুঝে গেলাম আর কয়েকদিন বাঁচবে বড় জোর। বউকে বললাম, আর দেখার সুযোগ হবে না তোমার। শুধু দোয়া করো। ঠিক একদিন পর তিনি চলে গেলেন।

আমার অনেক আত্মীয়-স্বজন, অনেক প্রিয় মানুষ এই পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। সকলের জন্য অনেক খারাপ লেগেছে। সময়ের সাথে সাথে অনেকের কথা মনেও পড়ে না। কিন্তু আজাদ ভাই আমার জীবনে অনেক স্মৃতি রেখে গেছেন। অনেক কিছু শিখেছি উনার কাছ থেকে। আমার অনেক অর্জন ওনার কারণে।

আজাদ ভাই, আপনাকে আমি আপন ভাই মনে করি। আপনাকে আমি কখনোই ভুলবো না। যেমনটা আমি আমার বাবাকে ভুলি না…।

লেখক : সভাপতি, বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলা, চট্টগ্রাম মহানগর।