
ঢাকা : ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ পেয়েছিলেন গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনূস। ড. ইউনূসের নোবেল জয়ে আনন্দের জোয়ার আসে সারাদেশেই। কিন্তু বাঙালির সর্বজনশ্রদ্ধেয় ‘আইকন’ হতে পারেননি তিনি; বরং কিছুদিন পরপরই বিতর্কিত আলোচনার জন্ম দেন এই নোবেল লরিয়েট।
মাঝখানে অনেকদিন আলোচনার বাইরে ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। হঠাৎ আবার তিনি আলোচনায় এলেন একের পর এক ‘হট’ ইস্যু নিয়ে। দেশে এখন রাজনৈতিক আলোচনার গরম উনুনে ড. ইউনূস যেন উত্তপ্ত ঘি।
নির্দলীয় সরকারের এক দফা দাবিতে অনেক দিন ধরেই মাঠগরমের রাজনীতি করছে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি। কথায় কথায় সরকারপতনের হুমকি দিচ্ছে দলটি। উচ্চ আদালতের রায়ে বাতিল হয়ে যাওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনার দাবিতে অনড় তারা। মূলত ২০০৬ সালে নির্বাচন নিয়ে তাদের অনড় মনোভাবের কারণেই দেশে ওয়ান-ইলেভেন আসে এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর ক্ষমতায় ছিল।
বর্তমানে রাজনীতিতে কানাঘুষা চলছে, আবারো ওয়ান-ইলেভেনের মতো ষড়যন্ত্র করছে একটি মহল। আর সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হচ্ছেন গত ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলব হিসেবেই রাজনীতিতে পরিচিত নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ওয়ান-ইলেভেনের মতো ইউনূসের নেতৃত্বে একটা নতুন সরকার এমন কথাবার্তা বাজারে আছে।
এদিকে জুলাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর ফাঁকির মামলায় ১২ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে মর্মে হাইকোর্টের রায় ড. ইউনূসকে আবার আলোচনায় নিয়ে এসেছে। গত ২৩ এনবিআর পাওনা বাবদ ১২ কোটি টাকা দানকর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দিতেই হবে বলে রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
এছাড়া শ্রম আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলার বিচার চলমান রয়েছে। অভিযোগ গঠন প্রক্রিয়া বৈধ বলে যে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট, তা বহাল রেখেছেন উচ্চ আদালত। এর আগে শ্রম আইন লঙ্ঘনের এ মামলায় গত ৬ জুন গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতের বিচারক। পরে অভিযোগ গঠনের আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেন ড. ইউনূসসহ চারজন।
মূলত ২০২১ সালের ১৬ আগস্ট কলকারাখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা রাজধানী ঢাকার মিরপুরে গ্রামীণ টেলিকমের কার্যালয় পরিদর্শন করে শ্রম আইনের লঙ্ঘন দেখতে পান। একই বছরের ১৯ আগস্ট অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গ্রামীণ টেলিকমকে চিঠি দেয়া হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয় যে, ৬৭ জন কর্মচারীর চাকরি স্থায়ী করার কথা থাকলেও গ্রামীণ টেলিকম কর্তৃপক্ষ তা করেনি। এছাড়া কর্মচারী অংশীদারত্ব ও কল্যাণ তহবিল গঠন এবং কোম্পানির ৫ শতাংশ লভ্যাংশ কর্মচারীদের পরিশোধ করা হয়নি। পরে, ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কলকারাখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শক (সাধারণ) এস এম আরিফুজ্জামান মামলা দায়ের করেন। গত ৬ জুন ঢাকার শ্রম আদালত-৩ এর বিচারক শেখ মেরিনা সুলতানা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে এ মামলায় অভিযোগ গঠন করেন। এই শ্রম আদালতে মামলা নিয়েই আলোচনায় রয়েছেন ড. ইউনূস।
অন্যদিকে গত সোমবার বারাক ওবামা ও হিলারি ক্লিনটনসহ বিশ্বের ১৬০ জন ব্যক্তি ও নেতা অধ্যাপক ইউনূসের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি খোলাচিঠি দিয়েছেন। বিবৃতিদাতাদের মধ্যে একশর বেশি নোবেল বিজয়ী রয়েছেন। এ চিঠিতে ড. ইউনূসের মামলার বিচারকাজ স্থগিত করার জন্য তারা প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানান।
এই খোলাচিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মামলা প্রত্যাহারের তিনি কেউ নন; বরং, যারা তার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছে তারা বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী পাঠিয়ে সব দলিল দস্তাবেজ খতিয়ে দেখুক যে সেখানে অন্যায় বা অসামঞ্জস্যতা আছে কিনা। কেউ যদি ট্যাক্স না দেয় আর শ্রমিকের অর্থ আত্মসাৎ করে এবং সেই শ্রমিকের পক্ষে শ্রম আদালতে মামলা হলে আমরা কি সেই মামলার বিচার বন্ধ করে দেব? ‘ল উইল টেক ইটস ওন কোর্স’। এটা সাফ কথা।
নোবেলজয়ী বলে কি ব্যবস্থা নেয়া হবে না- এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, পৃথিবীতে এমন বহু নোবেল বিজয়ী আছেন, পরবর্তীতে তাদের কাজের জন্য কারাগারে আছেন। আদালত স্বাধীনভাবে চলবে। ভয় পেলে চলবে না। শ্রমিকদের পাওনা তাদের দিতে হবে। এখন যদি জিজ্ঞেস করি, গ্রামীণ ব্যাংক কিন্তু সরকারি। তাহলে সরকারি বেতনভুক্ত একজন কীভাবে বিদেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন? কীভাবে তিনি এগুলো করেন?
আইনজীবী পাঠাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপেন চ্যালেঞ্জের পর ফের আলোচনায় আসেন ড. ইউনূস। শোক দিবসের আলোচনাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ড. ইউসূনকে নিয়ে আলোচনায় মুখর হচ্ছেন দলের নেতাকর্মীরা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হতে চাওয়া, আরেকটি ওয়ান-ইলেভেনের অপচেষ্টা করে নির্বাচন ভণ্ডুল করার ব্যাপারে কথা বলছেন তারা।
পদ্মা সেতু নিয়ে যে ষড়যন্ত্র ছিল সেই ষড়যন্ত্রে বিএনপি-জামায়াতের পাশাপাশি আরেকটি নাম জড়িত ছিল, তিনি ড. ইউনূস। তারা ষড়যন্ত্র করে সফল হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে টাকা দেয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে নিজেদের অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছেন। শুধু পদ্মা সেতু নয়, রোহিঙ্গা সংকটেও ড. ইউনূসের বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল। সেটাও তিনি করেননি। বাংলাদেশের বিপদে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত মুখ ড. ইউনূসকে কখনোই পাওয়া যায়নি।
এদিকে ড. ইউনূসের সব মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস হলেন এই জাতির একজন সূর্যসন্তান। শত বছর পরেও এই জাতির মানুষ তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে এবং লজ্জিত হবে এই ভেবে যে, এরকম বরেণ্য একজন মানুষের সঙ্গে এ দেশের সরকার কী রকম নীচ আচরণ করেছিল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৭৬ সালে। ‘৮০র দশক থেকে পরিচিতি লাভ করেন তিনি। নোবেল পুরস্কার তাকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয়। তখন পুরো দেশ আনন্দে ভাসলেও নোবেল পুরস্কার লাভ করার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই রাজনৈতিক দল গঠন করার কার্যক্রম শুরু করে সবাইকে অবাক করে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ তিনি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন, যে সময়টায় মাইনাস টু ফর্মুলায় উঠেপড়ে লেগেছিল সেনাশাসিত সরকার।
২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূস দেশের রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করে বলেন, তারা রাজনীতি করে টাকার জন্য। অথচ তিনিই সেনাছাউনিতে বসে রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন।
২০০৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক ড. ইউনূস দেশের মানুষের উদ্দেশে খোলাচিঠি দেন। ওই চিঠিতে তিনি বলেন, নতুন রাজনীতি সৃষ্টির জন্য প্রচণ্ড উদ্যোগ নিতে হবে। এটি করতে না পারলে পুরনো রাজনীতি থেকে পরিষ্কারভাবে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, রাজনীতিতে জড়িত হওয়া মানে বিতর্কিত হওয়া। আপনারা যদি মনে করেন, আমার রাজনীতিতে আসাটা দেশে নতুন রাজনৈতিক পরিমণ্ডল রচনায় সহায়ক হবে তবে আমি তার জন্য এ ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত আছি।
তিনি জানান, রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য তিনি প্রয়োজনে গ্রামীণ ব্যাংক ছেড়ে দেবেন। অবশ্য ওই বছরেরই ৩ মে রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন অধ্যাপক ইউনূস।
