থেমেছে ‘বিদ্রোহ’, হৃদরোগ নির্ণয়ের খরচ কিছুটা কমেছে

একুশে প্রতিবেদক : ‘কমিশন বাণিজ্যে দ্বিগুণ রোগ নির্ণয়ের খরচ’ শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর হৃদরোগ নির্ণয়ের খরচ কিছুটা কমেছে।

‘কনসালট্যান্ট ফি’ বৃদ্ধির জন্য ডাক্তাররা যে ‘বিদ্রোহ’ করে বসেছিলেন, সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন তাঁরা।

হৃদরোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা করানো ডাক্তাররা আগের মতো ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো থেকে ‘কনসালট্যান্ট ফি’ ৪০ শতাংশ করে নিচ্ছেন না। এখন তাঁরা ডায়াগনস্টিক সেন্টার ভেদে ‘কনসালট্যান্ট ফি’ নিচ্ছেন ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হৃদরোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা করানো তিনজন ডাক্তার, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একজন ম্যানেজার ও পাঁচলাইশ এলাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একজন কাস্টমার কেয়ার অফিসার।

জানা যায়, ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ইকো পরীক্ষার মূল্যের ৪০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে ‘কনসালট্যান্ট ফি’ হিসেবে দিতে চট্টগ্রামের ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে চিঠি দেয় হৃদরোগের ডাক্তারদের সংগঠন ‘চট্টগ্রাম সোসাইটি অব ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি (সিএসআইসি)’। অর্থ্যাৎ কালার ইকো পরীক্ষার জন্য রোগী ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে যে ৩ হাজার টাকা দেবেন, তার ৪০ শতাংশ হিসেবে ১ হাজার ২০০ টাকা চিকিৎসককে দিতে বলা হয়।

কিন্তু কিছু ল্যাব ওই ৪০ শতাংশের দাবি মানছিল না। এই পরিপ্রেক্ষিতে ওই গত ২৮ নভেম্বর হৃদরোগ চিকিৎসকদের কাছে একটি চিঠি পাঠান সিএসআইসির সভাপতি ডা. আশীষ দে ও সাধারণ সম্পাদক ডা. আনিসুল আউয়াল। ‘বিশেষজ্ঞ চিকিংসকদের কনসালট্যান্ট ফি ল্যাব মূল্যের আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি প্রসঙ্গে’ শিরোনামের ওই চিঠিতে বলা হয়, “কার্ডিওলজির সকল নন ইনভেসিভ পরীক্ষার মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম সোসাইটি অব ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে, অক্টোবর ২০২২ হতে সকল নন ইনভেসিভ পরীক্ষা (ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, ইটিটি, হল্টার মনিটরিং, এবিপিএম) এর জন্য সম্মানিত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের জন্য ল্যাব কর্তৃক ধার্যকৃত মূল্যের ৪০ শতাংশ ‘কনসালটেন্ট ফি’ হিসাবে প্রদান করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু কতিপয় ল্যাব এই নির্ধারিত ফি এখনো কার্যকর না করায় সবার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে এই ল্যাবগুলোতে কোনো প্রকার কার্ডিয়াক প্রসিডিউর না করার জন্য আপনাদের প্রতি অনুরোধ জানানো হলো। উক্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য আপনাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করছি।”

এই চিঠির পর দেখা যায় কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হৃদরোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ডাক্তারদের ‘কনসালট্যান্ট ফি’ হিসেবে ৪০ শতাংশ করে দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো প্রতিটি পরীক্ষা বাবদ ২০ থেকে ৪০ শতাংশ টাকা ‘রেফারেল ফি’ হিসেবে রোগীর প্রেসক্রিপশন লেখা ডাক্তারকে কমিশন দিচ্ছে। রেফারেল ফি সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ (৬০০ টাকা) ধরলেও এক ইকো পরীক্ষার ধার্য করা মূল্যের ৬০ শতাংশ বা ১ হাজার ৮০০ টাকা চলে যাচ্ছে দুই ডাক্তারের পকেটে। বাকি থাকে ৪০ শতাংশ (১ হাজার ২০০ টাকা) বা আরও কম; এই টাকাটাই মূলত একটি ইকো পরীক্ষা বাবদ ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো পাচ্ছে।

এই বিষয়টি গত ২৫ জুলাই প্রকাশিত ‘কমিশন বাণিজ্যে দ্বিগুণ রোগ নির্ণয়ের খরচ’ শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর হৃদরোগের ডাক্তারদের সংগঠন সিএসআইসি নমনীয় হয়।

পাঁচলাইশ এলাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একজন বলেন, ৪০ শতাংশ কনসালটেন্ট ফি দেওয়া অযৌক্তিক। এটা চালু রাখা কঠিন। যে প্রতিষ্ঠানের যতটুকু সামর্থ্য তারা ততটুকু দিতে পারেন বা যে যেভাবে ডাক্তারকে ম্যানেজ করতে পারেন, সেভাবে চলা উচিত। ডাক্তারদের সংগঠন থেকে এভাবে কনসালটেন্ট ফি নির্ধারণ করে দিলে স্বাস্থ্য খাতে অস্থিরতা বাড়বে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্রোহ করে ডাক্তারদের কমিশন বৃদ্ধি নিয়ে একুশে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর সিএসআইসি নমনীয় হয়েছে। এখন আমাদের মতো করে আমরা কনসালট্যান্ট ফি দিই, যেটা ৪০ শতাংশ থেকে অনেক কম।

চট্টগ্রাম বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ডা. লিয়াকত আলী খান বলেন, কনসালট্যান্ট ফি খুব বেশি হলে রোগীদের খরচ বাড়বে। এটা যাতে সবসময় নিয়ন্ত্রণে থাকে, আমরা সেই চেষ্টা করছি।

এখন আর কোনও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ৪০ শতাংশ ‘কনসালট্যান্ট ফি’ দেওয়া হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, এর ফলে রোগীদের ক্ষেত্রে হৃদরোগ নির্ণয়ের খরচ কিছুটা কমবে।

তবে হৃদরোগের ডাক্তারদের সংগঠন সিএসআইসির সভাপতি ডা. আশীষ দে এই বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি।