বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

সাপে কাটা রোগীর অপচিকিৎসা, নেই কার্যকর অ্যান্টিভেনম

প্রকাশিতঃ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১:৫৯ অপরাহ্ন


চট্টগ্রাম : দেশে প্রতিবছর সাপের কামড়ে ঠিক কত মানুষ মারা যায় এর সঠিক কোনো হিসাব নেই। ২০১০ সালের পর দেশে এ নিয়ে আর কোন জরিপ হয়নি। ওই জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেশে, বছরে ৭ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়। অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও অপচিকিৎসায় দেশে দিন দিন বাড়ছে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা। বর্ষা মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে আতঙ্কের বিষয় হয়ে ওঠে এই ঘটনা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বছরে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়। এরমধ্যে বিষক্রিয়া ঘটে ১৮ থেকে ২৭ লাখ মানুষের। তাতে মারা যায় ৮০ হাজার থেকে ১৪ লাখ মানুষ। অনেক মানুষ নানা অস্থায়ী অক্ষমতায় ভোগেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উন্নয়নশীল দেশগুলির মানুষ দীর্ঘমেয়াদী জটিলতায় যেমন বিকৃতি, সংকোচন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা, রেনাল জটিলতা, মানসিক কষ্ট এসব সমস্যায় ভোগেন।

অন্যদিকে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়, যার মধ্যে মারা যায় সাড়ে সাত হাজারেরও বেশি। আর প্রতি লাখ মানুষের মধ্যে সাপের ছোবল খায় ২৪৪ জন, যার মধ্যে মৃত্যু হয় ৪-৫ জনের। সব মিলে গ্রামেই ৯৬ শতাংশ ঘটনা ঘটে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত অজ্ঞতা, কুসংষ্কার ও অপচিকিৎসার কারণে সাপের কামড়ে অধিকাংশ মৃ্ত্যুর ঘটনা ঘটে। গ্রামের মানুষ এখনও বিশ্বাস করে, সাপে কাটা রোগীর ভালো চিকিৎসা দিতে পারে ওঝা। এই ভুল বিশ্বাসের কারণে আক্রান্তরা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভুগে থাকেন, এমনকি মৃত্যুও হয়।

সাপে কাটার ঘটনাকে বাংলাদেশের একটি জরুরি অবহেলিত স্বাস্থ্য সমস্যা ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এই সূত্র ধরে সম্প্রতি এ নিয়ে কর্মকৌশল তৈরি করেছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। যাতে ২০৩০ সাল নাগাদ সাপের কামড়জনিত অসুস্থতা ও মৃত্যু ৫০ ভাগ হ্রাসের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। লক্ষ্যে পৌঁছতে নেওয়া হয়েছে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনসিডিসি)। এর আওতায় দেশব্যাপী সাপের কামড়জনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করতে জরিপ চালানো হয়।

জরিপে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগ এবং সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের যৌথ নেতৃত্বে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থার অংশগ্রহণে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সহায়তায় দেশব্যাপী দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্ধারিত দুশটি পিএসইউয়ের ৬২ হাজার খানাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

এর সঙ্গে চট্টগ্রাম এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ৪৪ রোগীর বর্তমান শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা যাচাই করা হয়। এ জরিপ গত ১৮ জুন এনসিডিসি আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রকাশ করা হয়।

জরিপে দেখা গেছে, দেশে বছরে প্রতি লাখে ২৪৪ জন মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং প্রতি লাখে ৪ থেকে ৫ জন মানুষ মারা যান, যাদের ৯৫ ভাগ হলো গ্রামের। আর সারা দেশে বছরে সাপের ছোবলের শিকার হয় প্রায় ৪ লাখ মানুষ, যাদের মধ্যে সাড়ে ৭ হাজার মারা যায়। সাপে কাটার ঘটনা বেশি খুলনা এবং বরিশাল বিভাগে। ২৫-৫৫ বছর বয়সি পুরুষরা বাড়ির আশপাশে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দংশনের শিকার হন। দংশনের শিকার ৮০ শতাংশ মানুষ দংশিত অঙ্গে গিঁট দেন এবং ৬৫ শতাংশ প্রথমেই ‘ওঝা’ বা স্থানীয় চিকিৎসা নেন। এসব ঘটনায় প্রতি হাজারে দুজনের অঙ্গহানি ঘটে এবং ২-২৩ শতাংশ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অবসাদে ভোগে ১০ শতাংশ।

জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাপের কামড়ের শিকার প্রতি ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয় প্রায় দুই হাজার টাকা। জরিপে আরও বলা হয়, বছরে প্রায় ১৯ হাজার গৃহপালিত পশুও সর্পদংশনের শিকার হয় এবং এতে আড়াই হাজার পশু মারা যায়।

চট্টগ্রাম মেডিকেলের ভেনম রিসার্স সেন্টারের সহকারী গবেষক আব্দুল আউয়াল জানান, ২০২২ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১ বছরে সাপে কাটার শিকার হয়েছে ৪ লাখ ৩ হাজার। মেডিকেলের রেজিস্টারের তথ্যানুযায়ী মারা গেছে সাত হাজার পাঁচশজন। তবে অনেক ঘটনাই অজানা থেকে যায়।

আব্দুল আউয়াল বলেন, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম নিশ্চিত করেছে সরকার। চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

ভেনম রিসার্স সেন্টারের গবেষক আব্দুল আউয়াল বলেন, পদ্মা ও যমুনা অববাহিকার জেলাগুলোতে সাপের কামড়ের উপসর্গ বিবেচনা করলে দেখা যায়, ওই এলাকায় সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় রাসেলস ভাইপারের কামড়ে।

গবেষকরা বলেছেন, সাপ উদ্ধার এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী কিংবা কাজে আগ্রহীদের বেশিরভাগ সাপের দংশনের পরে প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয়গুলো অবগত নন। তাদের ভালো জ্ঞান থাকলে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে।

ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়া সরীসৃপ প্রজাতির শীতল রক্তবিশিষ্ট প্রাণীর বসবাসের আদর্শ স্থান হওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির সাপ দেখা যায় এখানে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) তথ্যমতে, বাংলাদেশে ৯২ প্রজাতির বিষধর সাপ রয়েছে। এদের মধ্যে ২৬টি প্রজাতি বিষধর, যার ১২টি হলো সামুদ্রিক। বাকি ১৪টি প্রজাতির মধ্যে বেশির ভাগই লোকালয় থেকে দূরে বনে-জঙ্গলে বাস করে।

বিষধর সাপের প্রজাতিগুলোর মধ্যে সাধারণত পদ্মগোখরা, খইয়াগোখরা, শঙ্খচূড়ের কামড়েই আমাদের দেশে মানুষ বেশি মারা যায়। এ ছাড়া রয়েছে পাতিকালাচ ও শঙ্খিনী। দীর্ঘদিন বিলুপ্তির পথে থাকলেও সম্প্রতি তালিকায় যুক্ত হয়েছে রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া সাপের নাম। অধিকাংশ প্রজাতি শান্ত স্বভাবের হলেও ঘটনাচক্রে, উত্ত্যক্ত হয়ে কিংবা ভয় পেয়ে সাপে কামড়ানোর ঘটনা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটে থাকে।

সাপ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ আবু সাইদ বলছেন, গ্রামেগঞ্জে নগরায়ণের কারণে বনাঞ্চল কাটা হচ্ছে, উজাড় হচ্ছে কৃষিজমি, ভরাট হচ্ছে পুকুর, ডোবা, খাল-বিল, নদ-নদী। এতে করে কমছে সাপের আবাসস্থল। ফলে বাঁচার জন্য এবং খাদ্যের সন্ধানে সাপ মানুষের বসতিতে চলে আসছে। ফলে বাড়ছে সাপে কাটার ঘটনা।

তিনি বলেন, সর্পদংশন দেশের একটি অবহেলিত ক্রান্তীয় রোগ হিসেবে চিহ্নিত। ডেঙ্গু, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়ার মতো এটি জরুরি রোগের তালিকাভুক্ত হয়নি। ফলে এটি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তথা সরকারের মাথা ব্যথাও নেই। এ ছাড়া সাপে কাটার ঘটনা যেহেতু গ্রামাঞ্চলেই বেশি ঘটে এবং গরিব মানুষই বেশি মারা যায়, সেজন্য নীতি নির্ধারকদের কাছেও এটি গুরুত্ব পায় না। সাপের কামড়ে মৃত্যুর হার কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশেই যত দ্রুত সম্ভব অ্যান্টিভেনম তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে।

চট্টগ্রাম মেডিকেলে অবস্থিত ভেনম রিসার্স সেন্টারের গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক ইব্রাহীম আল হায়দার বলেন, আমরা ক্লিনিক্যালি অ্যান্টিভেনম তৈরির কাজ শুরু করেছি। আপাতত রাসেলস ভাইপারের ক্লিনিক্যাল অ্যান্টিবডি তৈরির চেষ্টা চলছে। এখন পর্যন্ত ৩৫ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।

তিনি বলেন, সাউথ ইন্ডিয়ার সাপের বিষের অ্যান্টিভেনম দিয়ে বর্তমানে আমাদের দেশে রাসেলস ভাইপারে কামড়ানো রোগীর চিকিৎসা চলছে। তবে এটা পুরোপুরি কার্যকর নয়। কারণ ওই অঞ্চলের আবহাওয়া, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও মাটি ভিন্ন হয়। এ কারণে সেসব অঞ্চলের সঙ্গে আমাদের দেশের সাপের বিষের গুণগত ও পরিমাণগত পার্থক্য থাকে। তাই ভারতের অ্যান্টিভেনম পুরোপুরি কাজ করবে না। বর্তমানে আমরা দেশের পাঁচটি ক্লাইমেটিক অঞ্চল থেকে রাসেলস ভাইপারের বিষ সংগ্রহ করে সমন্বিত বিষের প্রভাবের ওপর অ্যান্টিবডি তৈরি করছি। এটি সফল হলে রাসেলস ভাইপারে কামড়ানো রোগীকে পুরোপুরি সুস্থ করা যাবে বলে আশা করছি।