চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবণতা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ


ফারুক আবদুল্লাহ : দীর্ঘ সময় ধরেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় চালিকাশক্তি চীন। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় দেশটির অর্থনীতি মন্দা ভাবের দিকে যাচ্ছে। এক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি। এই কারণে আন্তর্জাতিক নেতাদের ও বিনিয়োগকারীদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে তারা। মন্দা মোকাবেলায় এখন তারা চীনের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না।

গত আগস্টে ডলারের বিপরীতে ইউয়ান ১৬ বছরের সর্বনিম্নে ঠেকেছে। কভিডকালীন লকডাউন কাটার পর চীনের অর্থনীতি খুব দ্রুত বাড়তে থাকে। তবে সেই প্রবণতা বেশি দিন অব্যাহত থাকেনি। বর্তমানে দ্রুত ভোক্তামূল্য কমতে শুরু করেছে। গভীর হচ্ছে রিয়েল এস্টেট খাতের সংকট। কমে গেছে রফতানির পরিমাণও। তরুণদের বেকারত্বের হার এতটাই খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরকার এখন এ-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা বন্ধ করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিষয়ক গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের অর্থনৈতিক সংকট দেশটির দূরবর্তী প্রদেশগুলোতেও সম্প্রসারিত হয়ে পড়েছে। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, চীন অনেক ধীর গতির প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করছে। প্রতিকূল জনসংখ্যা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তাঁর মিত্রদের সাথে বাণিজ্যিক লেনদেন কমে যাওয়ায় দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্যকে হুমকির মুখে পড়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই অর্থনৈতিক মন্দা নির্দিষ্ট একটি সময়ের নয়, বরং এটি দীর্ঘায়িত হতে পারে।

এদিকে পরিস্থিতি এতটাই নেতিবাচক দিকে বাঁক নিয়েছে যে, একটি প্রধান গৃহনির্মাতা ও একটি বিশিষ্ট বিনিয়োগ কোম্পানি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় তাদের বিনিয়োগকারীদের থেকে অর্থ পায়নি। ফলে আবাসন বাজারের চলমান অবনতি দেশটির আর্থিক পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তোলার আশঙ্কা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে জোরালো পদক্ষেপের অভাব ও পরিস্থিতি সামনে আরো খারাপ হতে পারে এমন ভয় ছড়িয়ে পড়ায় খরচ কমিয়ে দিয়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। ফলে বাজারের মন্দা দশা আরো প্রকট হয়ে উঠেছে। বেশ কয়েকটি বড় বিনিয়োগ ব্যাংক চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসকে ৫ শতাংশের নিচে কমিয়ে দিয়েছে।

ইউবিএস বিশ্লেষকরা সম্প্রতি প্রকাশিত নোটে লিখেছেন, চীনের প্রপার্টি মন্দা আরো গভীর হয়েছে, রপ্তানি চাহিদা আরো দুর্বল হয়েছে এবং প্রত্যাশা অনুযায়ী নীতিগত সমর্থনও পাওয়া যায়নি। ফলে আমরা চীনের প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাসকে কমিয়ে দিয়েছি। নোমুরা, মরগান স্ট্যানলি ও বার্কলেসের গবেষকরা আগেই তাদের পূর্বাভাস সংশোধন করে কমিয়ে দিয়েছেন। তার মানে চীন তার প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশের সরকারি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে, যা হবে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন চীনা নেতৃত্বের জন্য বেশ বিব্রতকর হবে।

ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন স্তরের সরকারি ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ ২০২২ সালের হিসাবে চীনের জিডিপির প্রায় ৩০০ শতাংশে পৌঁছেছে। যা যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০১২ সালে দেশটিতে ঋণের হার ছিল জিডিপির ২০০ শতাংশেরও কম।

এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন চীনের অর্থনীতিকে ‘টিকিং টাইম বম্ব’ অর্থাৎ ক্রমশ এক বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি আশঙ্কা করছেন, চীনে অসন্তোষ আরও বাড়বে। তবে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর পাল্টা জবাব দিয়ে বলেছেন, ‘চীনের অর্থনীতি অনেক টেকসই, এর সম্ভাবনা দারুণ আর আছে অনেক প্রাণশক্তি।’

একইসঙ্গে দেশটির অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চীন ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। দেশের বাজারকে আপাতত মন্দা মনে হলেও কম মূল্যে পণ্য নিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের আরও লাভের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল ও সৌদি থেকে ইউয়ানে জ্বালানি কিনে পরবর্তী সময়ে বড় অর্থনৈতিক সূচকের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে চীন।

চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের মান আগস্টে আরও হ্রাস পেয়েছে। এটিকে ভালো লক্ষণ উল্লেখ করে অর্থনৈতিক বিশ্লেষক কেন চিয়ুং বলেন, ‘দুর্বল মুদ্রা রপ্তানির জন্য সুবিধাজনক।’ এতে অন্যরা ইউয়ানে ব্যবসা করতে আরও উৎসাহী হবে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইউয়ানের সর্বজনীন ব্যবহার বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

লেখক: সাংবাদিক।