মানবিক পুলিশের নতুন গল্প

ফয়সাল করিম : পাঠক, মানবিক পুলিশের দ্বিতীয় পর্ব এবার। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল ইসলামের আরো একটি অজানা গল্প।

শুনেছিলাম চমেক হাসপাতালের জরুরী বিভাগে জহিরুল ও তার সহকর্মীদের মুখ থেকেই। কথা হয়েছিল দীর্ঘদিন অজ্ঞাত হিসেবে হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকা এক তরুণী মনিরা ও তার স্বজনদের সাথেও, যাকে নিয়ে এবারের গল্প।

২০১৬ সালের কোন এক শীতের সকাল। নগরীর বটতলি রেল স্টেশনের ব্যস্ত প্লাটফর্ম। কুলির হাঁকডাক, মুটে মজুরের আনাগোনা আর যাত্রীদের অবিরাম যাতায়াতে সরগরম চট্টগ্রাম নগরীর প্রধান রেল জংশন। মানুষের গুঞ্জন আর কোলাহল ছাপিয়ে হঠাৎ একটি জটলা নজর কাড়ল সকলের। আনুমানিক ২৪ বছরের এক তরুণীকে ঘিরে ভিড় জমেছে। প্লাটফর্ম থেকে কিছুটা দূরে একটি টং দোকান। তার ঠিক পিছনেই অজ্ঞান অবস্থায় এক তরুণীকে আবিষ্কার করেছে কিছু মজুর।

হাত, মাথা আর শরীরের বিভিন্ন অংশে জখমের দাগ, ছোপ ছোপ রক্তের প্রলেপ। সাহস করে কেউ এগিয়ে না এলেও মেয়েটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন বৃদ্ধ চায়ের দোকানি। এক হাত তার কপালে রেখে অন্যহাতে দেখে নিলেন মেয়েটির শ্বাস প্রশ্বাস। বেঁচে আছে নিশ্চিত হয়ে হাত লাগালেন তাকে উদ্ধারে। সাথে সাথে এগিয়ে এল আরো কয়েকজন। ধরাধরি করে তাকে একটি সিএনজি অটোরিক্সায় তুললেন কয়েকজন মজুর। তারপর সরাসরি হাসপাতালে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ড। রোগী আর স্বজনে গিজগিজ। ভিড়ভাট্টা-হট্টগোলের মধ্যেও, চোখ খুলতেই শূন্যতা ভর করল আহত মনিরার মনে। চারদিক তাকিয়ে ধীরে ধীরে আবিষ্কার করল কোন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে সে। অনেক চিন্তা করেও কখন কীভাবে এই অচেনা জায়গায় এল তার কোন কুল কিনারা করতে পারল না ২৪ বছর বয়সী তরুণী। চিৎকার করে কাউকে ডাকতে গিয়ে, গোঙ্গানির মত শব্দ বেরিয়ে এল।

অল্প দূরেই ছিলেন একজন মাঝবয়সী সেবিকা। এগিয়ে এলেন। মেয়েটির মুখে আগ্রহের ছাপ দেখে জানালেন, কয়েকজন মজুরের তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার গল্প। তবে অনেক চেষ্টা করেও কিছু মনে করতে পারল না তরুণী, কেবল নিজের নাম ছাড়া। তার বাকি পরিচয় ভাবতে ভাবতে গোলকধাঁধায় পড়ে গেল মনিরা, মাথায় তীব্র ব্যথার সাথে বাড়ল শূন্যতা। হঠাৎ আরো দুজন সেবিকা এগিয়ে এলেন, তারপর বাম হাতের মাংসপেশিতে সূঁচ ঢোকার তীব্র অনুভূতি। অতীত মনে করার গোলকধাঁধায় হারাতে হারাতে ঘুমের রাজ্যে হারাল তার বিধ্বস্ত শরীরটি।

এক সপ্তাহ পরের ঘটনা। মনিরার ঘুম ভেঙ্গেছে অনেক আগে। দুর্বল শরীরে এখনো প্রবল রুগ্নতার ছাপ। ঘোর নিয়ে চারপাশে তাকিয়ে এলোমেলো চিন্তার সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে সে। হঠাৎ তার বিছানার সামনে এসে দাঁড়ালেন মাঝ বয়সী একজন লম্বাচওড়া মানুষ। মাথায় ক্যাপ, হাতে ওয়ারল্যাস, পরনে হাফ হাতা চেক শার্ট। মনিরা বুঝতে পারল তিনি কোন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোক। চিন্তায় পড়ে গেল সে। দ্বিধায় পড়ে ভাবল, তার কাছেই বা কেন এল লোকটি! তবে তরুণীর দ্বিধা ভেঙ্গে কিছুটা ভাঙ্গা গলায় কথা বলে উঠলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর জহিরুল ইসলাম।

কুশল জানিয়ে মুখে একগাল হাসি এনে জিজ্ঞাসা করলেন, এখন শরীর কেমন আপনার?

লোকটির সরল হাসিতে খুব আশ্বস্ত হল মনিরা, অনেকটা মৃদু স্বরে সে উত্তর দিল ‘ভাল’।

মনিরার মৃদু উত্তরে ইন্সপেক্টর জহিরুল কথা এগিয়ে নিলেন কিছুদুর। তবে ঠিকানা ও স্বজনদের নাম পরিচয় জানতে চাইলে কথার খেই হারাল মেয়েটি। অনেক চেষ্টা করেও কিছু মনে করতে পারল না মনিরা। এসময় মেয়েটির বিছানার সামনে এসে দাঁড়ালেন প্রথমদিনের মাঝবয়সী সেই নার্সটি। খুশিখুশি মুখ করে মনিরাকে জানালেন তার চিকিৎসা চালিয়ে নিতে পুলিশ জহিরুল ইসলামের মানবিক হাত বাড়ানোর গল্প।

জানালেন, প্রথমদিন যখন নিয়ে আসা হয় তখন অজ্ঞান থাকায় মনিরাকে অজ্ঞাত রোগী হিসেবেই ভর্তি করা হয়, সার্জারি ওয়ার্ডে। ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তার সেবা শুশ্রষা আর ঔষধ কেনার জন্য এগিয়ে আসেনি কেউ, জোটেনি বিছানাও। তাই প্রথম দিন মেঝেতেই পড়ে ছিল তার ক্ষতবিক্ষত দেহ। এসময় অজ্ঞাত এই রোগীর স্বজনদের খোঁজ না পেয়ে ওয়ার্ড এসে প্রথমে বিছানার ব্যবস্থা করেন পুলিশ ইন্সপেক্টর জহিরুল ইসলাম। তারপর তার প্রাথমিক ঔষধপত্র আর খাবার জোগাড়ে সাহায্যের হাত বাড়ান এই পুলিশ সদস্য। সেই থেকে নিয়মিত এসে দেখে যান, নেন খোঁজ খবর। সেবিকার কাছ থেকে সব কথা শুনে কৃতজ্ঞ মুখে পুলিশের দিকে তাকালো মনিরা বেগম। হাসি দিয়েই জানাল ধন্যবাদ।

আজও মেয়েটিকে দেখতে এসে তার সাথে প্রথম কথা হল জহিরুল ইসলামের। তবে তার মুখ থেকে স্বজনদের নাম পরিচয় না পাওয়ায় এবার আশঙ্কা দানা বাঁধল জহিরুলের মনে। প্রায় এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে, পত্রিকায় দেয়া হয়েছে বিজ্ঞাপন অথচ মেয়েটির খোঁজে এখনও আসেনি কোন স্বজন। হাল ছাড়লেন না জহির। সোর্স আর নানা মাধ্যমে খবর দিয়ে মেয়েটির ঠিকানা উদ্ধারে চেষ্টার কোন ক্রুটি রাখলেন না তিনি।

তিন মাস পরের গল্প। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। ধীরে ধীরে সেরে উঠছেন মনিরা। শরীরের ক্ষতগুলো শুকিয়েছে অনেকটাই। দাঁড়াতে না পারলেও এখন বিছানায় উঠে বসতে পারে এই তরুণী। প্রথম প্রথম খাওয়া-দাওয়া অন্যের সহায়তায় ছাড়া করতে না পারলেও এখন নিজ হাতে সে মুখে তুলে নেয় খাবার। মাথার ক্ষত সারতে আরো সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তাই স্মৃতিশক্তিও পুরোপুরি ফিরতে আরও অপেক্ষা করতে হবে তাকে। পায়ের দুই জায়গায় বেশ জখম থাকলেও এখন তা উন্নতির দিকে। তবে সুস্থভাবে হাঁটতে হলে আরো সময় গুণতে হবে, জানালেন হাসপাতালের সেবিকারা। তারাই বিছানায় তার খাওয়া-দাওয়া আর শৌচকাজের ব্যবস্থা করে দেন, রাখেন ঔষুধপত্র ঠিকঠাক খাওয়ার খোঁজখবর। তাদের অনেকের সাথে এরইমধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠেছে মনিরার। এ কজনই এখন তার স্বজন, নিবিঢ় আত্মীয়। তবে একজনের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ মনিরা। পুলিশ পরিদর্শক জহিরুল ইসলাম। তিনি এ কয়েক মাস তার সব চিকিৎসা খরচ জোগাড় করেছেন। কখনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলে কখনো দয়ালু বিত্তশালী মানুষদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে মহৎপ্রাণ এ পুলিশটি চালিয়েছেন অসহায় মনিরার চিকিৎসা খরচ। মানুষটির প্রতি তাই অকৃত্রিম শ্রদ্ধায় আপ্লুত মনিরা।

শুরু থেকেই জহিরুল মনিরার ঠিকানা আর স্বজনদের সন্ধানে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্মৃতি শক্তি এখনও পুরোদমে ফিরে না আসায় এই পুলিশ সদস্যকে সহায়তা করতে না পারার আফসোস তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। দিন যায়, মাস ফুরায় তবু মনিরার মন স্মরণ করতে পারে না তার গ্রামের বাড়ি, বাবা-মা কিংবা ভাইবোনের নাম ঠিকানা। ধীরে ধীরে আপন হয়ে যায় পর, হাসপাতালের অপিরিচিত মুখগুলো হয়ে উঠে প্রিয় স্বজন।

অনেকদিন পর। হাসপাতালে আসার প্রায় আট মাস পরের কথা। মাথার আঘাতটি অনেকটাই সেরে উঠায় সচল হতে শুরু করেছে মনিরার মস্তিষ্ক। বিশ্বাসঘাতকতা করা অনেক স্মৃতিই এখন ধীরে ধীরে ধরা দিতে শুরু করেছ মনিরার কাছে। ভাবতে গিয়ে একদিন হঠাৎ মাথায় তার ঘুরপাক খেল বোনের নাম আর গ্রামের বাড়ির ঠিকানা। বিষয়টি সেবিকাদের জানাতেই তারা সাথে সাথে খবর পাঠালো জহিরুল ইসলামের কাছে। জহির এলেই মনিরা জানাল তার বোনের নাম রহিমা বেগম আর তাদের গ্রামের বাড়ি বেলদিয়া, যেটি গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানায় অবস্থিত। এ তথ্য পেয়ে একরাশ নিখাদ আনন্দ ভিড় করল জহিরুলের চোখেমুখে। সাথে সাথে সে যোগাযোগ করল গাজীপুরের শ্রীপুর থানায়। মনিরা আর তার বোনের বিস্তারিত তথ্য দিলে স্থানীয় থানার কর্মকর্তা জানালো দুদিন পরেই সব খবরাখবর নিয়ে জহিরুলকে সব জানাবেন। আশ্বস্ত হলেন জহির। দীর্ঘদিন পরে হলেও মেয়েটি তার স্বজনদের কাছে ফিরে যেতে পারবে এই ভেবে খুশিতে আত্মহারা জহিরুল।

দুদিন পর থানা থেকে একটি দু:সংবাদ আসলো। থানার কর্মকর্তা জানালেন শ্রীপুর থানায় বেলদিয়া নামের কোন গ্রাম নেই। নেই রহিমা বেগম নামে মনিরার কোন বোনও। সব শুনে এবার বেশ হতাশায় আচ্ছন্ন হলেন জহিরুল। এতটুকু এসেও সব আশা মাটি হবে এমনটি ভাবেননি তিনি। মনিরাকে এ কথা জানাতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে। নিজের স্মৃতিশক্তির উপর আত্মবিশ্বাস ফিরে আসতে থাকলেও এ সংবাদে সব এলোমেলো হয়ে গেল তার। আবারও মস্তিষ্কের তীব্র ব্যথায় কুকড়ে গেল মনিরা। তার প্রচণ্ড চিৎকার ওয়ার্ডের করিডোর ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ল আশপাশের ওয়ার্ডেও। তারপর আবার সূচের ফলা শরীরে বিদ্ধ হওয়ার তীক্ষ অনুভূতি, আবারো ধীরে ধীরে নিথর হয় তার শরীর।

মনিরাকে নিয়ে যখন সব আশা ছাড়লেন জহিরুল তখন হঠাৎ দেবদূতের মত একটি সুসংবাদ নিয়ে হাজির হলেন টগবগে যুবক নেছার আহমদ। বেশ কয়েক বছর যাবৎ অজ্ঞাত রোগীদের সেবায় নিয়োজিত এ যুবক হাসি ফুটিয়েছেন হারিয়ে যাওয়া অনেক রোগীর স্বজনদের মুখে। মনিরার কথা নেছারকে জানিয়েছিলেন জহিরুল। তার দেয়া নাম ঠিকানার সূত্র ধরে বেলদিয়া গ্রামের খোঁজ করতে থাকেন নেছার আহমদ। শেষমেষ পরিচিত এক লোকের মারফত তিনি খবর পান গাজীপুরে নয় বরং ময়মনসিংহের পাগলার একটি গ্রামের নাম বেলদিয়া। সেখানেই মনিরার গ্রামের বাড়ি। তবে রহিমা বেগম নামে তার যে বোনের কথা মনিরা বলেছিল তিনি বিয়ের পর স্বামীর সাথে গাজীপুরে শ্রীপুর থানার ডুবাইল গ্রামে বসবাস করেন। সব শুনে জহিরুল বুঝলেন বোনের বাড়ির সাথে নিজের বাড়ির গ্রামের নাম গুলিয়ে ফেলেছিল মনিরা। ভুল ঠিকানায় গিয়ে তাই মনিরার স্বজনদের কোন হদিস পায়নি পুলিশ। এবার কালবিলম্ব না করেই মনিরার বোনের সাথে যোগাযোগে উঠে পড়ে লাগলেন জহিরুল। রহিমা বেগমের ফোন নাম্বার জোগাড় করলেন। মনিরার অবস্থা জানিয়ে শিগগিরি তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে বোনের দায়িত্ব বুঝে নেয়ার জন্য অনুরোধ জানালেন তিনি। খুশির এ সংবাদ নিয়ে জহিরুল হাজির হলেন মনিরার কাছে। বোনের সাথে যোগাযোগ হয়েছে শুনে এবার আনন্দাশ্রু মনিরার চোখে। কৃতজ্ঞতার সাথে ভালবাসা আর শ্রদ্ধা নিয়ে তাকাল সে মানবিক এই পুলিশটির দিকে। জহিরুলের মুখেও স্ফিত হাসি, অসহায় মেয়েটির মাথায় হাত রাখলেন তিনি। বললেন, আর হাসপাতালের জীবন নয় এবার তোমার ঘরে ফেরার পালা।

এ বছরের জুন মাসের কোন এক সকাল। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে অনেকদিন এমন দৃশ্যের অবতারণা হয়নি। সাধারণত বেশিরভাগ কান্না এখানে দু:খের মাতম তোলে, প্রকাশ করে স্বজন হারানোর শোক। তবে ১৭ নম্বর বেডটি ঘিরে যে মানুষগুলোর কান্নার রোল পড়েছে, তা আনন্দের। এ কান্না স্বজন হারানোর নয় বরং ফিরে পাওয়ার। দীর্ঘ আট মাস পর বোনকে পাওয়ার আনন্দ, বাঁধ ভেঙেছে কান্নায়। কথায় কথায় পুলিশ জহিরুলকে রহিমা বেগম জানালেন, গত বছর ঘর থেকে রাগ করে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়েছিল মনিরা। তবে দূরে থাকার এই দীর্ঘ ছেদ ভুলিয়েছে তাদের রাগ-অভিমান, বাড়িয়েছে পারস্পরিক টান। এ ফিরে পাওয়ার কান্না আশপাশের রোগী-স্বজনদের মাঝেও ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রশান্তি আর আশার আলো। যে চারদেয়ালে নিয়ত মৃত্যু আর শোকের আনাগোনা সেখানে এমন অভাবনীয় দৃশ্য দেখতে কারই না ভাল লাগে। হাসপাতালের এই ওয়ার্ডে জহিরুল ইসলামের সহায়তা আর সেবিকাদের শুশ্রুষায় তিলে তিলে সুস্থ হয়ে উঠা মনিরা আজ বিদায় নিবে। আনন্দাশ্রুর সাথে কিছুটা দু:খের ছটা তাই তার চোখে। এতদিন প্রিয় স্বজনদের মতোই আগলে রেখে সেবা-যত্ন করা মানুষগুলোকে ছেড়ে যেতে হবে। আপন ঠিকানায় ফিরে গেলেও মনের মনিকোঠায় আপন হয়ে রবে এই রক্তের বন্ধনহীন মানুষগুলো।

অভাবী মানুষ মনিরার বোন রহিমা বেগম আর তার স্বামী শাহাদাত। হারানো স্বজন নিয়ে ঘরে ফেরার আগে তাদের মেটাতে হলো হাসপাতাল আর ঔষধপত্রের কিছু খরচাপাতি। যেটুকু অর্থ এনেছিল তাতে হাসপাতালের পাট চুকানো গেলেও যাওয়ার জন্য আর রইলো না তিনজনের ট্রেনের টিকেটের টাকা। নিজেদের অভাব লুকোতে পারল না দরিদ্র পরিবারটি। সব বুঝে এবারও এগিয়ে এলেন পুলিশ ইন্সপেক্টর জহিরুল। পুলিশ ফাঁড়ির সদস্য আর নিজ পকেটের টাকায় জোগাড় করে দিলেন মনিরাদের বাড়ি ফেরার টাকাও।

নগরীর বটতলী স্টেশনের সেই চিরচেনা ব্যস্ত প্লাটফর্ম। হাঁটছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম। হাতে গোল্ড লিফের আধখানা অংশের টুকরো ধোঁয়া তুলছে। চওড়া শরীরে মাথাটি হেলে আছে গম্ভীর ভঙ্গীতে। তবে ঠোঁটদুটো স্ফিত। মুখে প্রশান্তির ছাপ। কিছুক্ষণ আগে মনিরা ও তার পরিবারকে সকাল সাতটার কর্ণফুলি ট্রেনে তুলে দিয়ে এলেন। তার সাথে পুলিশ ফাঁড়ির আরো দুই সদস্য। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছেন গত আট মাসের মনিরার গল্প। ঘর পালিয়ে চাকরির সন্ধানে চট্টগ্রাম আসা এই তরুণীকে শহরটি দিয়েছে দু:সহ অভিজ্ঞতা। ক্ষণিক থমকে দাঁড়িয়ে আশপাশে তাকালেন জহিরুল। এই রেল স্টেশনেই তো মেয়েটি অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে ছিল। সেদিনের সেই আঘাতে মনিরাকে জর্জরিত করেছিল যারা তাদের কাউকেই শনাক্ত করা যায়নি। অর্থের অভাবে মামলা করতেও রাজি হয়নি অসহায় মনিরার পরিবার। প্রিয় স্বজনকে ফিরে পাওয়ায় আনন্দই তাদের কাছে বিরাট পাওয়া। জহিরুল ভাবতে থাকলেন, অসহায় মেয়েটির উপর যারাই করুক না কেন বর্বর হামলা, তারা মানুষরুপী পশু। তারাই মনিরাদের জীবন প্রদীপ কেড়ে নেয়, তছনছ করে দেয় তাদের স্বপ্ন। আর এক পক্ষ থাকে যারা মনিরাদের জন্য হয়ে আসে আশীর্বাদ। পাশবিক মানুষের বিরুদ্ধে মানবিক মানুষ। এসব ভেবে নিজের জীবনটাকে খুব মূল্যবান মনে হচ্ছে জহিরুলের। তার গর্বিত হাঁটা দেখে পাশ থেকে মনযোগ কাড়লেন পুলিশ সদস্য হাসনাত। জিজ্ঞাসা করলেন স্যার হাসপাতালে এমন অসংখ্য মানুষের পাশে দাঁড়ান, অথচ কেউ কি আপনাকে আর মনে রাখে! ভাঙ্গা গলায় জহিরুলের উত্তর, মানবিক মানুষ হতে পারার মাঝে যেই আনন্দ তাতে মনে রাখা না রাখার আফসোস অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়…