‘বাইরের লোক’ লতিফ জাতীয় নির্বাচনে কতটা সফল হবেন


আবছার রাফি : চট্টগ্রাম-১১ আসনে সংসদ সদস্য পদে এম এ লতিফকে চতুর্থ দফা মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগ; তবে তার মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা। লতিফের মনোনয়ন পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়ে সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি পাঠানোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তও নিয়েছেন তারা। এমন অবস্থায় একটি প্রশ্ন সামনে এল। যদি লতিফের মনোনয়ন বাতিল করা না হয়, তাহলে তিনি কতটা সফল হবেন?

এম এ লতিফ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনে প্রথমে মনোনয়ন চেয়েছিলেন বিএনপি থেকে। সেখান থেকে বিফল মনোরথে ফিরে এসে শেষমেশ উপমহাদেশের প্রাচীনতম দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে জোয়ারে এমপি হয়ে যান। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা খোরশেদ আলম সুজনকে দেওয়া মনোনয়নের চিঠিখানা রাতারাতি নিজের হস্তগত করার কী যাদুকরী কৌশল এম এ লতিফের ছিল তা কারও অজানা নয়।

এরপর ২০১৪ এর ৫ জানুয়ারি বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় দ্বিতীয় ও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো এমপি হন লতিফ। জীবনে কখনো আওয়ামী লীগ করা দূরের কথা; বরঞ্চ জামায়াত ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আজন্ম সখ্যতার পরও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি হিসেবে ব্যবসায়ী কোটায় ২০০৮ সালে প্রথমবার মনোনয়ন পান। নেতা নির্বাচন থেকে শুরু করে, চেম্বারে নেতার সংযোজন-বিয়োজনসহ বরাবরই ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম চেম্বারের নেপথ্য নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার কারণ ছাড়াও বিশেষ জায়গায় ‘কনভিন্স’ করতে পারার সক্ষমতা থেকে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের পর ২০২৩ সালেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান এম এ লতিফ।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, টানা প্রায় ১৫ বছর সরকার দলীয় এমপি হয়ে দেশে-বিদেশে নিজেকে গুছিয়ে নিলেও পক্ষান্তরে দলের জন্য ‘অ্যাসেট’ হওয়ার পরিবর্তে বরং ‘বোঝা’ হয়েছেন এম এ লতিফ। বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃতি, ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রয়াত নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে বিবাদে জড়ানোসহ নানা ঘটন-অঘটনে বিতর্কিত হয়েছেন এমপি লতিফ। বারে বারে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন দলের ভাবমূর্তি।

রাজনীতি সচেতনরা বলছেন, গত ১৫ বছরে সরকারের আপনাআপনি উন্নয়ন বরাদ্দ ছাড়া চট্টগ্রাম-১১ আসনের জনগণের জন্য লতিফের উন্নয়ন-কর্মসূচি ছিল ট্রাকে নিজের ছবি সম্বলিত ব্যানার টাঙিয়ে বন্দর-পতেঙ্গা এলাকার মানুষের জন্য ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি, ওই এলাকার নারীদের নিয়ে আত্মনির্ভরশীলতার কথা বলে সংগঠন করে মাঝে মাঝে বড়সড় কয়েকটি অনুষ্ঠান-শোডাউন– ব্যস এটুকুন।

লক্ষণীয় যে, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর তৃতীয় দফায় এমপি হওয়ার পর অনেকটা গা-ছাড়া ভাব এমপি লতিফের। গত ৫ বছরে অনেকটা নিশ্চুপ, নিষ্প্রাণ তিনি। নিজের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে টুকটাক কর্মসূচিগুলো থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন তৃতীয় মেয়াদের দায়িত্বে। করোনা মহামারির সময় তার তেমন কোনো ভূমিকা না থাকার বিষয়টিও চোখে পড়েছে আওয়ামী লীগের নেতাদের।

এরপরও লতিফের আবারও মনোনয়ন পাওয়া মানতে পারেননি নগর আওয়ামী লীগের সিংহভাগ নেতাকর্মী। মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার জন্য মাঠে নেমেছেন। এ পর্যন্ত ২৯ জন এ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করেছেন বলে জানা গেছে।

গত মঙ্গলবার (২৮ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নগরীর দারুল ফজল মার্কেটের দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির জরুরি সভায় লতিফকে নিয়ে আলোচনা হয়।

মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে ইতোমধ্যে বৈঠক-সভা শুরু করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমন। তিনি এম এ লতিফের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি, দলের নেতাকর্মীদের মামলা-হয়রানিসহ বিগত ১৫ বছরের নানা খতিয়ান তুলে ধরে নগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির কাছে একটি চিঠি দেন।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় সেই চিঠি পড়ে শোনান চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, যিনি নিজেও চট্টগ্রাম-১১ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। এরপর তিনি চিঠিতে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে নেতাদের মতামত জানতে চান। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, সহ সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন, সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াছসহ কয়েকজন নেতা সাংসদ এম এ লতিফের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন।

মোহাম্মদ ইলিয়াছ সভায় জানান, এম এ লতিফ একটি টেন্ডারে অবৈধ হস্তক্ষেপ করায় তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন। তখন লতিফ তাকে মারার জন্য তেড়ে গিয়েছিলেন। এরপর তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করিয়ে জেলে পাঠান লতিফ। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করেন তাকে কালো তালিকাভু্ক্ত করতে। পরে বন্দর কর্তৃপক্ষ সেটা তুলে নেয়ার পরও ইলিয়াছের লাইসেন্স নবায়ন করতে দিচ্ছেন না লতিফ।

মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমি দলের পদে আছি। দলের শৃঙ্খলার স্বার্থে অনেক কথা বলতে পারি না। কিন্তু বারবার একজন বাইরের লোক এসে মনোনয়ন নিয়ে চলে যাবে আর আমরা সহ্য করবো, এতে কষ্ট হয়, দুঃখ লাগে। আমি যদি পদে না থাকতাম, এর জোরালো প্রতিবাদ করতাম।’

আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, লতিফের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতা সরব হয়েছেন। তাকে প্রার্থী করার পর দলের সিদ্ধান্ত না মেনে নিয়েও অনেক নেতাই তাকে বাইরের মানুষ বলছেন। সবাইকে এক করতে না পারলে ভোটে প্রভাব পড়বে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ৩০০ আসনে আওয়ামী লীগ যেসব প্রার্থী দিয়েছে, কারও বিরুদ্ধে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু এই ব্যক্তির (এম এ লতিফ) বিগতদিনের কর্মকাণ্ডে ওয়ার্ড-ইউনিট, থানা, মহানগরের নেতাকর্মী আমরা সবাই অতিষ্ঠ। ২০০৮ সালে তিনি নৌকা মার্কা নিয়ে নির্বাচিত হয়ে এসে জামায়াতের সংগঠন চাষী কল্যাণ সমিতির সংবর্ধনা নিয়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করেছেন। আমাদের নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছেন। আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা তো (লতিফের মনোনয়ন প্রত্যাহারের) অনুরোধ করতেই পারি। কেননা উনি দলের প্রার্থী, কিন্তু দলের লোক না, বাইরের লোক। উনি দল করেন না। সুতরাং দলের সাথে উনার কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক না থাকাতে উনাকে মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য করা হয়েছিল, উনি কোনোদিন একটা মিটিংয়ে উপস্থিত হননি। উনাকে দেখা যায়নি।

খোরশেদ আলম সুজন বলেন, অন্যসব বাদ দিন। এবার যে জ্বালাও পোড়াওয়ের বিরুদ্ধে ১৯টা পয়েন্টে রাতদিন পাহারা দিলাম, উনাকে তো দেখিনি। তো, উনি কষ্টের সময় আসবেন না। মধু খাওয়ার সময় এসে বসে মাখন খাবেন, সেটা তো হয় না। আমরা অনুরোধ করেছি, রাখা না রাখা এটা কেন্দ্রের ব্যাপার। আমরা চিঠিতে জানাব, উনি আমাদের দলের লোক না। কিন্তু কী মধুর কারণে কেন্দ্র তাকে নমিনেশন দেয়, তা কেন্দ্র জানে।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে এম এ লতিফকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে একই প্রসঙ্গে তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, এলাকার দাগী কিছু লোক তার কাছে সুবিধার জন্য আসলেও তিনি কাছে ভিড়তে না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে তারা প্রলাপ বকছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের পাশে আছেন উল্লেখ করে লতিফ বলেন, অনৈতিক কাজ যারা করে তাদের এড়িয়ে চলি। ওদের অপকর্ম ‘ওন’ করে গণদুশমন হব? নাকি আমার নেত্রীকে গণদুশমন বানাব? এই আসনের জনগণই তাদের অপকর্মের জবাব দেবে।