এক বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম শহরেই লবণাক্ততা বেড়েছে তিনগুণ।
- ফাতেমা বেগম।
আবদুল আলী : ফাতেমা বেগম বসবাস করেন সাগরের খুব কাছে, এলাকার নামও সাগরিকা। সেখানে সাগরের গর্জন শোনা যায়, নির্মল বায়ুতে নিশ্বাস নেওয়া যায় মন ভরে। কিন্তু চট্টগ্রাম শহরের পশ্চিম প্রান্তের এই এলাকায় বেশিরভাগ নলকূপেই সুপেয় পানি মেলে না।
স্থানীয় অন্য বাসিন্দাদের মতো ফাতেমাও চট্টগ্রাম ওয়াসার পানির উপর নির্ভর করেন। কিন্তু ওই এলাকায় ওয়াসার পানি সবসময় সহজলভ্য নয়। আবার পাইপে পানি আসলেও মাত্রাতিরিক্ত লবণের কারণে কখনও কখনও তা পান করার অযোগ্য হয়ে পড়ে।
একুশে পত্রিকাকে ফাতেমা (৪৫) বলেন, “গত জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত বাসায় ওয়াসার পানি ঠিকমতো পাইনি। আবার ওয়াসার পানি আসলেও কখনও কখনও সে পানিতে ছিল মাত্রাতিরিক্ত লবণ। এতে অসুস্থ হয় পরিবারের সদস্যরা। বাধ্য হয়ে এক কলসি পানি ১৫ টাকায় কিনতে হয়েছে।”
আগামী জানুয়ারিতে শুষ্ক মৌসুমের আগেই সাগরিকা এলাকার এই বাসা বদল করে চট্টগ্রাম শহরের উত্তর দিকে বাসা নেওয়ার কথা জানান ফাতেমা।
গৃহিনী ফাতেমা চট্টগ্রাম শহরের পশ্চিম থেকে উত্তরে গিয়ে লোনাপানি থেকে মুক্তির কথা ভাবছেন। কিন্তু কৃষক আবেদ আলী (৬৫) নোয়াখালী থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে চট্টগ্রামে এসেছিলেন স্বস্তি পেতে। লোনা পানি থেকে রেহাই পেতে তাদের মতো জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুচ্যুত মানুষেরা ছুটছেন এক জেলা থেকে অন্য জেলা, এমনকি শহরের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তেও।
- গত এপ্রিল মাসে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন স্থানে ওয়াসার পানি–সংকট ছিল চরমে। পানি না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয় নগরবাসীকে। যাদের বাড়িতে গভীর নলকূপ রয়েছে, সেসব বাড়িতে পানি নিতে কলসি দিয়ে লাইন ধরেন অনেকেই। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর এলাকা থেকে গত ১৬ এপ্রিল তোলা ছবি।
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় চাষাবাদ করে সংসার চালাতেন আবেদ আলী। লবণাক্ততা ও নদী ভাঙনের শিকার হয়ে তিনি সপরিবারে ২০২০ সালে আরেক দ্বীপ সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নে ঠাঁই নেন। ২০২১ সালে একই সমস্যার শিকার হয়ে ঠিকানা বদলে আবেদ এখন বসবাস করেন চট্টগ্রাম নগরীর আউটার রিং রোডের পাশে লামাপাড়ায়।
আবেদ আলী একুশে পত্রিকাকে বলেন, “হাতিয়া থেকে সন্দ্বীপে গিয়ে অন্যের জমিতে চাষাবাদ করতাম। গত বছর ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে ওই জমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ে, ফসল নষ্ট হয়। সেখানে আর চাষাবাদও করা যাচ্ছিল না। নলকূপের পানিতেও লবণাক্ততা। এ কারণে লামাপাড়ায় ঠাঁই নিয়েছি। কিন্তু এখানেও সেই লোনাপানি। নলকূপের পানি পান করা যায় না। তাই অন্যত্র চলে যাওয়ার কথা ভাবছি।”
চট্টগ্রাম নগরের পশ্চিম প্রান্তের ইপিজেড থানা এলাকায় দুই মাস আগেও বসবাস করা মুনতাসির ইসলাম (৩২) ইতোমধ্যে নগরের উত্তর প্রান্তের বহদ্দারহাট এলাকায় বাসা স্থানান্তর করেছেন।
মুনতাসির একুশে পত্রিকাকে বলেন, “শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততার জন্য ওয়াসা পানি সরবরাহ কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়। যার কারণে ইপিজেড এলাকায় ঠিকমতো ওয়াসার লবণাক্ত পানিও পৌঁছে না। শুষ্ক মৌসুমে যাতে সমস্যায় পড়তে না হয়, সেজন্য বহদ্দারহাটে নতুন বাসা ভাড়া নিয়েছি।”
শুধু ফাতেমা, আবেদ বা মুনতাসির নয়-চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বসবাস করা অন্তত অর্ধকোটি মানুষ সুপেয় পানির সংকটে ভুগেছেন। এদের অনেকেই চট্টগ্রাম নগরের পশ্চিম প্রান্ত (সাগরের কাছাকাছি) ছেড়ে উত্তর প্রান্তের এলাকাগুলোতে বাসা সরিয়ে নিচ্ছেন।
ওই তিন ভুক্তভোগীর কথার মিল পাওয়া যায় চট্টগ্রাম ওয়াসার তথ্যে। সংস্থাটির পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় তিনগুণ।
“হালদা নদীর যে পয়েন্ট থেকে মোহরা প্রকল্পের পানি সংগ্রহ করা হয় সেখানে চলতি বছর লবণের পরিমাণ ছিল প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৭০ মিলিগ্রাম। স্বাভাবিক সময়ে এই লবণের পরিমাণ থাকে প্রতি লিটারে ১০০ থেকে ৩০০ মিলিগ্রাম,” জানান চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম।
লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণ জানিয়ে তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টি কম হওয়ায় কাপ্তাই লেকে পানি কম ছিল। এই কারণে চলতি বছর কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পানি কম ছাড়ায় হালদা নদীতে মিঠা পানির পরিমাণ কমে যায়। হালদায় উজানের পানির চাপ কমে যাওয়ায় কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের লবণাক্ত পানি হালদায় প্রবেশ করে।”
- শাহ আমানত সেতুর পাশে কর্ণফুলী নদীর তীর দখল করে গড়ে ওঠা বস্তিতেও রয়েছে সুপেয় পানির সংকট। বস্তির অনেক বাসিন্দা নিয়মিত পানি কিনে খাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম শহরে লবণাক্ততার প্রাদুর্ভাব ও সুপেয় পানির সংকট বিষয়ে ২০২২ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত নজরুল ইসলাম ও অলক পাল সম্পাদিত “চট্টগ্রাম মহানগর: ভৌগোলিক সমীক্ষা” শীর্ষক এক গবেষণা গ্রন্থে সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) প্রকল্প সমন্বয়কারী আকিব জাবেদ লিখেছেন, “সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি অব্যহত এবং অতিমাত্রায় পানি উত্তোলনের কারণে ভূগর্ভের জলাধারগুলো ক্রমশ ফাঁকা হতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে লবণাক্ততা চট্টগ্রাম শহরের অর্ধেকের বেশি এলাকা গ্রাস করে নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা শহরবাসীকে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য করবে।”
ঘরছাড়া করেছে লোনা পানি
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ লবণাক্ততা ও নদীভাঙনসহ নানা কারণে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছেন। কিন্তু শহরের পশ্চিম দিকে লবণাক্ততার প্রকোপ থাকায় যাদের সামর্থ্য আছে তারা আবার ঠিকানা বদল করে উত্তর দিকে চলে যাচ্ছেন।
লবণাক্ততা ও ভাঙনের কবলে পড়ে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া ছেড়ে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পুকুরিয়া গ্রামের পাহাড়ে পরিবার নিয়ে বসবাস করছে অন্তত ২০টি পরিবার। বাঁশখালীর ওই পাহাড়ি এলাকা এখন “কুতুবদিয়া গ্রাম” নামে পরিচিত পেয়েছে।
সেখানে বসবাস করা আবদুর রহমান বলেন, “লবণাক্ততার কারণে কুতুবদিয়ায় বসবাস করা কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। অন্যত্র বসবাস করার আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। তাই ৫ বছর আগে পুকুরিয়ার পাহাড়ে বসবাস শুরু করেছি।”
কুতুবদিয়ার দক্ষিণ প্রান্তের আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, “লবণাক্ততার সমস্যা তো ছিলই। তার ওপর আমাদের ইউনিয়নের অনেকটাই সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। সে কারণে হাজার হাজার মানুষ পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন এলাকায় ঠাঁই নিয়েছেন। কেউ গিয়েছেন কক্সবাজারের কুতুবদিয়া পাড়ায়, কেউ গিয়েছেন বাঁশখালীর কুতুবদিয়া পাড়ায়।”
বাঁশখালীর সাংবাদিক বেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, বাঁশখালী পৌরসভার জঙ্গল জলদি, সাধনপুরের বৈলগাঁও, পুঁইছড়ি ইউনিয়নের নাপোড়া গ্রামে বাস্তুহারা জনগোষ্ঠী বসবাস করছেন; যারা মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কুতুবদিয়া থেকে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছেন।
কুতুবদিয়ার ৬০ ভাগেরও বেশি মানুষ অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে। ২০১৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রবন্ধে এই তথ্য জানান যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট বিশ্ববিদ্যায়ের গবেষক মুনশী খালেদুর রহমান। তিনি জানান, কক্সবাজার জেলা সদরসহ এমন কোনও এলাকা পাওয়া যাবে না যেখানে কুতুবদিয়ার মানুষ নেই। কুতুবদিয়া পাড়া নামে পরিচিতি পেয়েছে কিছু এলাকা, যেখানে মূলত কুতুবদিয়া থেকে স্থানত্যাগকারীরাই ওইসব এলাকায় বসতি স্থাপন করেছেন।
“কুতুবদিয়া দ্বীপের মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের পরিবেশগত ও সামাজিক ভোগান্তি এবং জীবিকা” শীর্ষক এই গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, “১৯৭২ সালের পর এই দ্বীপে কৃষি জমি কমে গেছে প্রায় অর্ধেক এবং লবণ পানির দখলে গেছে দ্বিগুণ এলাকা।”
একইভাবে ভূমিহীন অথবা লবণপানি থেকে বাঁচতে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের কয়েক হাজার মানুষ স্থানান্তরিত হয়েছেন চট্টগ্রাম সিটির এক নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের পাহাড়ি এলাকায়। ওই এলাকাটি “সন্দ্বীপ কলোনি” নামে পরিচিতি পেয়েছে।
কলোনির বাসিন্দা বৃদ্ধ রফিকুল ইসলাম (৬৫) বলেন, “আমার বাড়ি ছিল সন্দ্বীপের রহমতপুরে। সেখানে লবণাক্ততাসহ নানা কারণে বসবাস করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই ১০ বছর আগে সন্দ্বীপ কলোনিতে এসে আশ্রয় নিই।”
সন্দ্বীপ থেকে আসা স্বপ্ন আরা (৫৫) বাস করছেন চট্টগ্রাম নগরের সাগরিকা জেলেপাড়ায়। তিনি বলেন, “১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি হারিয়ে সন্দ্বীপ থেকে এসে নগরের আউটার রিং রোডে বসবাস শুরু করি। সেখানে নলকূপগুলোতে লবণ পানি আসা শুরু করায় বছর দুয়েক আগে সাগরিকা জেলেপাড়ায় আসি। এখানেও মিঠা পানির সংকট, কিন্তু ঠিকানা বদল করার আর্থিক সঙ্গতি নেই।”
ওয়াসার পানিতে অস্বাভাবিক লবণাক্ততা
মোহরা পানি শোধনাগার প্রকল্প থেকে চট্টগ্রাম ওয়াসা পানি সরবরাহ করে। সেখান থেকে বঙ্গোপসাগরের দূরত্ব ৩৬ কিলোমিটার। তথ্য অধিকার আইনে আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৯ নভেম্বর ওয়াসার মোহরা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, হালদা নদীর যে পয়েন্ট থেকে মোহরা প্রকল্পের পানি সংগ্রহ করা হয় সেখানে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল লবণের পরিমাণ ছিল প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৭০ মিলিগ্রাম। সাধারণত মিঠা পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা থাকে ০.৫০ মিলিগ্রাম।

ওয়াসার তথ্যমতে, ২০২৩ সালে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে হালদা নদীর ওই এলাকার পানিতে লবণের পরিমাণ ছিল প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ মিলিগ্রাম।
এ ছাড়া প্রতি লিটারে লবণের পরিমাণ ছিল; ফেব্রুয়ারির প্রথম দুই সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০০ মিলিগ্রাম, মার্চে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২৪০ মিলিগ্রাম, এপ্রিলে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৭০ মিলিগ্রাম, মে মাসে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫৮০ মিলিগ্রাম এবং জুনের প্রথম দুই সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২৬০ মিলিগ্রাম।
ওয়াসার তথ্যে দেখা যায়, গত বছর (২০২২) মোহরা পানি শোধনাগার প্রকল্পের জন্য হালদা থেকে সংগ্রহ করা পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩০০ মিলিগ্রাম। তার মানে এক বছরের ব্যবধানে লবণাক্ততা বেড়েছে প্রায় তিনগুণ।
অবশ্য ২০২১ সালে মোহরা পানি শোধনাগার প্রকল্পের জন্য হালদা থেকে সংগ্রহ করা পানিতে প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৯৬০ মিলিগ্রাম লবণ পায় ওয়াসা।
এর আগে ২০২০ সালের এপ্রিলে হালদা থেকে সংগ্রহ করা পানিতে ১২০ থেকে ১ হাজার ৬৮০ মিলিগ্রাম এবং ২০১৯ সালের মে মাসে ৪০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মিলিগ্রাম লবণ পাওয়া যায়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির (এইচআরআরএল) সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, “বিভিন্ন পাহাড়ি স্রোতধারা আর খালে একের পর এক স্লুইস গেট ও বাঁধ দেওয়ার ফলে হালদা নদীর উজানে ৩৫ শতাংশ পানির প্রবাহ হ্রাস পেয়েছে। উজান থেকে পানির প্রভাব কমে এলে নদী সবসময়ই বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের পানিতে সেই ঘাটতি পূরণ করে।”
তবে হালদার বর্তমান অবস্থার জন্য জলবায়ু পরিবর্তন প্রধানত দায়ী বলে মনে করেন তিনি।
মনজুরুল কিবরীয়ার মতে, “চট্টগ্রাম ওয়াসার প্লান্টে লবণ আলাদা করার ম্যাকানিজম নেই। কিন্তু লবণাক্ততা তো প্রতি বছরই বাড়বে। এটা কমাতে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে যৌথভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। এ ছাড়া নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে নদী থেকে সব ধরনের স্লুইস গেট ও বাঁধ অপসারণ করতে হবে।”
উপকূলের গ্রামগুলোতেও লবণাক্ততা
এক যুগ আগে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ জরিপে বলা হয়েছিল, ১৯৭৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চার দশকে চট্টগ্রামে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছিল ১২ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণা প্রবন্ধে দাবি করা হয়, চট্টগ্রাম জেলার ৩ লাখ ৯ হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা আনোয়ারার রায়পুর, হাইলধর, চাতরী ও আনোয়ারা সদর ইউনিয়নে লবণাক্ততার পরিমাণ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। যেসব এলাকায় আগে লবণাক্ততা ছিল না, সেসব এলাকায় লবণাক্ত পানি পাওয়ার কথা জানালেন স্থানীয়রা।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার উপ সহকারী প্রকৌশলী প্রিয়াংকা চাকমা একুশে পত্রিকাকে বলেন, “আনোয়ারায় উপকূলীয় গ্রামগুলোতে আগের চেয়ে লবণাক্ততা অনেক বেড়েছে। ২০২০-২১ সালে যেখানে লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল লিটার প্রতি ১ হাজার ৫০০ মিলিগ্রাম, তা এখন ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৬০০ মিলিগ্রাম হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “নলকূপ বসাতে গিয়ে বেশিরভাগ এলাকায় লবণাক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। কোনও কোনও এলাকায় লবণের কারণে পানি পানের অযোগ্য।”
“লবণাক্ততার কারণে যেসব এলাকায় নলকূপ বসানো যাচ্ছে না, সেসব এলাকা চিহ্নিত করে আমরা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প হাতে নিয়েছি,” জানান প্রিয়াংকা চাকমা।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সীতাকুণ্ড উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী রাশেদুজ্জামান বলেন, “সীতাকুণ্ডের প্রায় সব জায়গায় নলকূপের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেশি।”
কর্ণফুলী উপজেলার ২৫ শতাংশ এলাকায় লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্ণফুলীর উপ সহকারী প্রকৌশলী নাজিম উদ্দীন রাসেল।
- শাহ আমানত সেতুর পাশে কর্ণফুলী নদীর তীর দখল করে গড়ে ওঠা বস্তিতেও রয়েছে সুপেয় পানির সংকট। বস্তির অনেক বাসিন্দা নিয়মিত পানি কিনে খাচ্ছেন।
লবণাক্ততায় বেড়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
ভোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লবণাক্ত পানি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। যদিও চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেন, “ওয়াসার সরবরাহ করা পানি ব্যবহারের সময় লবণাক্ততা অনুভব হলেও তা মানবস্বাস্থ্যে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে না।”
তবে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক, রসায়নবিদ ও কর্ণফুলী নদীর পানি গবেষক ইদ্রিস আলী বলেন, “যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তাদের লবণাক্ত পানি ক্ষতি করবে। লবণাক্ত পানি মানুষের খাদ্য হজমে্ও সমস্য সৃষ্টি করে।”
“পানি সংগ্রহ করে লবণমুক্ত করা ব্যয়বহুল, তবে ভবিষ্যতে এই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। হালদার বিকল্প চিন্তাভাবনা করতে হবে। অন্যান্য প্রাণীর মতো সেখানে মাছও বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তখন মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে যাবে,” বলেন ইদ্রিস আলী।
নগরীর হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা শফিকুল আলম মুবিন (৪০) বলেন, “মে মাসে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানিতে থাকা লবণাক্ত পানি পান করার পর আমরা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হই।”
তবে চট্টগ্রামের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. ওয়াজেদ চৌধুরী অভি বলেন, “গত মে মাসের দিকে অতিরিক্ত গরম এবং পানির সমস্যায় ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছিল।”
কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ প্রদীপ কুমার দত্ত বলেন, “অতিরিক্ত লবণাক্ততা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বেশি লবণাক্ত পানি পানে ডায়রিয়া, পানিশূণ্যতা ও কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে।”
ডা. প্রদীপ বলেন, “কিডনি রোগীদের লবণ পরিহার করতে বলা হয়। কিন্তু সেই রোগী যদি প্রতিদিন ৩ লিটার লবণ পানি পান করে, তাহলে তার শরীরে মাত্রাতিরিক্ত লবণ যুক্ত হবে, যা তার জন্য মারাত্মক ক্ষতি।”
বড় প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছে ওয়াসা
চট্টগ্রামে লোনা পানির এই সমস্যা সমাধানে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৪ হাজার ৪১১ কোটি টাকার বেশি) ব্যয়ে নতুন প্রকল্প নিতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। এটি বাস্তবায়নে দুটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা-ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) আগ্রহি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ফ্রান্সভিত্তিক পরামর্শক সংস্থা সুয়েজ “চট্টগ্রাম ওয়াসা ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (সিডব্লিইউআইপি)” শীর্ষক একটি ধারণাপত্র দিয়েছে। এতে কর্ণফুলী নদীর উপরিভাগ থেকে পানি সংগ্রহের জন্য ইনটেক স্টেশন নির্মাণ, পাইপলাইন, নতুন পানি শোধনাগার নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে সংকট তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। ১০ বছর পর লবণাক্ততা আরও বাড়তে পারে। তাই ধারণাপত্র নিয়ে আমরা দাতা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। দাতারা সেটি পর্যালোচনা করছে।”




