:: একুশে প্রতিবেদক ::
চট্টগ্রাম: ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে খুন হন চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অঞ্জলী দেবী (৫৭)। সর্বশেষ গত ৫ জুন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে গিয়ে গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন হন এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গত দুই বছরে উগ্রপন্থিরা দেশে যেসব হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে, তার সঙ্গে এই দুটি হত্যার মিল পেয়েছেন তারা। যথারীতি পুলিশ তদন্তে নামলেও এই দুই ঘটনার রহস্য এখনো উদঘাটন হয়নি। এছাড়া গত ১০ জুন থেকে শুরু হওয়া জঙ্গিবিরোধী অভিযানে ১৩ জুন পর্যন্ত চারদিনে চট্টগ্রামে একজন জঙ্গিও গ্রেফতার হয়নি। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, জঙ্গিবাদ দমনে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) সক্ষমতা নিয়ে!
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গি সংশ্লিষ্ট মামলা তদন্তের পরিবেশ পুলিশে নেই। পুলিশে যারা সুপারভাইজ করেন, তারা জঙ্গিদের সম্পর্কে অনেকটাই অজ্ঞ। এ সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা না থাকায় তাদেরকে বুঝাতেই দিন পার হয়ে যায় অধঃস্তন কর্মকর্তাদের। জঙ্গিদের নিয়ে কাজ করার স্বাধীনতাও কম। এমনকি এসব মামলা তদন্ত করতে সক্ষমতা আছে, এমন কর্মকর্তাও অপ্রতুল। চোর-ডাকাত-ছিনতাইকারী ধরা পর্যন্ত থানা পুলিশের দৌড়, এখন তাদেরকেই জঙ্গি মামলার তদন্তে কাজে লাগানো হচ্ছে। অথচ জঙ্গি মামলা তদন্ত করার সক্ষমতা একেবারেই নেই থানা পুলিশের।
এদিকে জঙ্গিবাদ বিরোধী যে কয়েকটি অভিযান নগর গোয়েন্দা পুলিশ পরিচালনা করছে, তা তৎকালীন এডিসি বাবুল আক্তারের নেতৃত্বে। অপরাধ দমনের সাথে সরাসরি যুক্ত অতিরিক্ত কমিশনার ও কয়েকজন উপকমিশনারসহ উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তার জঙ্গি সংক্রান্ত মামলার তদন্ত কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে সফলতার অভিজ্ঞতা নেই। এতে তদন্তে নেমে সমস্যায় পড়েন পরিদর্শক ও এসআই পর্যায়ের কর্মকর্তারা। এছাড়া জঙ্গিবাদ দমনে কাজ করেন নগর গোয়েন্দা পুলিশে এমন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা আগে থাকলেও, তা এখন হাতেগোনা। বর্তমানে নগর গোয়েন্দা পুলিশ একটি রিজার্ভ ইউনিটে পরিণত হয়েছে। সিএমপিতে সংযুক্ত হওয়া কিছু বিতর্কিত কর্মকর্তাকে সেখানে পদায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্লু-লেস মামলার তদন্তভার ডিবিকে দেওয়া হলেও নেই কাজ করার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এবং লজিস্টিক সাপোর্ট। জঙ্গিবাদ যেভাবে মাথাচড়া দিয়ে উঠেছে, সেভাবে মোকাবেলার জন্য সিএমপির শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্যোগও নেই। জঙ্গি সংশ্লিষ্ট ঘটনা তদন্তে নেই সিএমপির বিশেষায়িত কোন টিম।
২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি সকালে নগরীর তেলাপট্টি মোড় এলাকায় কুপিয়ে খুন করা হয় নার্সিং কলেজের শিক্ষক অঞ্জলী দেবীকে। এ ঘটনায় খুনিদের এখন পর্যন্ত আটক করতে পারেনি পুলিশ। খুনের কারণ কী, সে বিষয়েও পরিবার ও পুলিশ সুনির্দিষ্ট কিছু জানাতে পারেনি। পুলিশের ধারণা, নার্সিং কলেজে হিজাব পরা নিয়ে আন্দোলনের জের ধরে এ ঘটনা ঘটতে পারে। এ নিয়ে ঘটনার ৬ মাস পর গত বছরের ১৪ জুন মোঃ রেজা নামের এক মাদ্রাসা শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়। তবে তাকে পাঁচদিনের রিমান্ডে নিয়েও কোন তথ্য বের করতে পারেনি গোয়েন্দা পুলিশ। দীর্ঘদিনেও খুনিরা গ্রেফতার না হওয়ায় অঞ্জলীর স্বজনেরা হতাশ হয়ে বিচারের দাবি ও আশা ছেড়ে দিচ্ছেন।
সর্বশেষ গত ৫ জুন সকালে জঙ্গিবিরোধী বিভিন্ন অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতুকে তার বাসার কাছে ছুরিকাঘাত ও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সন্দেহভাজন দুইজনকে গ্রেফতার করা হলেও ঘটনার কারণ ও কারা জড়িত তা নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম বলেন, গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে জঙ্গিরা আরো খুন-নাশকতা করতে পারে। তাই এখনই তাদের অপতৎপরতা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। জঙ্গি দলে রিক্রুট ও অর্থায়ন বন্ধে নানামুখি পদক্ষেপ নিতে হবে। এর জন্য দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের নিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বিশেষায়িত একটি টিম গঠন করা উচিত। এই টিমের সদস্যদের এ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ ও বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। এখন যেভাবে পুলিশ কার্যক্রম চালায়, সেভাবে জঙ্গিবাদ দমন সম্ভব না। জঙ্গিরা প্রযুক্তি জ্ঞানে উচ্চশিক্ষিত। তাদের সাথে পেরে উঠা সাধারণ মানের পুলিশ দিয়ে হবে না।
এদিকে জঙ্গি নিয়ে কাজ করতে পুলিশ কর্মকর্তাদের অনাগ্রহী হয়ে উঠার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় তারা ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে নিযুক্ত হতে চান না। নগর গোয়েন্দা পুলিশের যে কয়েকজন এসআই পদবীর কর্মকর্তা জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিয়মিত অংশ নিয়েছেন, তাদের পরিবারের নিরাপত্তায় অস্ত্রধারী কোন পুলিশ সদস্য নেই। পুলিশ পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মুখে মুখে থাকলেও বাস্তবে তা করা হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের একজন পরিদর্শক বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিষয়ে সিএমপির অনেক পুলিশ কর্মকর্তা বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কিন্তু দেশে ফিরে তারা এ বিষয়ে কাজে যুক্ত হচ্ছেন না। নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ে থাকায় জঙ্গিদের নিয়ে কাজ করতে তারা আগ্রহী হন না। এই যে পুলিশ পরিবারের সদস্যকে মেরে ফেলা হয়েছে, এরপর থেকে জঙ্গি নিয়ে কাজ করতে অফিসাররা আরো অনাগ্রহী হবেন। কারণ, ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে যারা জড়িত হন তাদের পরিবারের নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক পুলিশ থাকছে না। ঝুঁকি অনুযায়ী সে পরিমাণ ভাতা, সোর্স মানি ও প্রণোদনাও থাকে না। তাহলে কেন একজন পুলিশ অফিসার এতটা ঝুঁকি নেবেন?
