বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

গ্যাস-সংকট নিরসনে বিকল্প চিন্তা করুন

প্রকাশিতঃ ২১ জানুয়ারী ২০২৪ | ৮:০৪ অপরাহ্ন


নজরুল কবির দীপু : গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে দেশজুড়ে। এতে ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কলকারখানার উৎপাদন। গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্প-কারখানার কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এছাড়া বাসাবাড়ি, সিএনজি স্টেশন, পেট্রোল পাম্প-সর্বত্রই একই অবস্থা। সারা দেশে গ্যাসের তীব্র সংকটের মধ্যেই এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় শুক্রবার চট্টগ্রামে বাসাবাড়ি ও শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জনজীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ।

কক্সবাজারের মহেশখালীতে বঙ্গোপসাগরে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে পাওয়া গ্যাস চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় সরবরাহ করা হয়। জানা যায়, একটি এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিলে শুক্রবার ভোর থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। মেরামত শেষে টার্মিনালটি চালু করতে গেলে পুনরায় যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

জানা যায়, চট্টগ্রামে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি গ্যাসের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে ৫০ মিলিয়ন আবাসিক ও ৫০ মিলিয়ন শিল্প-কারখানায় সরবরাহ করা হয়। বাকি গ্যাস ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ ও সার কারখানায়। আমরা মনে করি, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যে কোনো সময় টেকনিক্যাল সমস্যা হতেই পারে। তবে সে সমস্যা সমাধানের জন্য আগাম প্রস্তুতি রাখা প্রয়োজন। একটি টার্মিনালে সমস্যা হলে বিকল্প হিসাবে যেন অন্য একটি থেকে গ্যাস সরবরাহ করা যায়, সেই ব্যবস্থা থাকতে হবে।

আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, দেশে বেশ কিছুদিন ধরেই গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতিবছরই শীত মৌসুমে দেশে গ্যাসের সংকট দেখা দেয়। মূলত চাহিদানুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না থাকাই এর মূল কারণ। তবে এবারের সংকটের ফলে শিল্প উৎপাদনে ধস নেমেছে। অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে।

শ্রমিকরা কারখানায় এলেও গ্যাস সংকটের কারণে কাজ করতে পারছেন না। কারখানা মালিকরা প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা লোকসান গুনলেও সংকটের কোনো সুরাহা মিলছে না। এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেছেন, শিল্প-কারখানা বন্ধ হলে কিংবা বেতন দিতে না পারলে লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে যাবে। এতে অর্থনীতির ওপর চাপ পড়বে।

দেশে ডলার আসার যে কয়টি ক্ষেত্র রয়েছে তার মধ্যে রপ্তানি বাণিজ্য অন্যতম। রপ্তানিমুখী শিল্প-কারখানা যদি গ্যাস সংকটে ভোগে, তাহলে উৎপাদন যেমন ব্যাহত হবে, তেমনি ডলার আয়ের প্রবাহ কমে গেলে এর প্রভাবও দেশের অর্থনীতিতে পড়বে। আবার গ্যাসের অভাবে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারে ব্যয় বেড়ে গেলে উৎপাদিত পণ্যের দামও বেড়ে যাবে, যার প্রভাব অভ্যন্তরীণ তো বটেই, আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়বে। চাহিদামাফিক উৎপাদিত পণ্য সময়মতো সরবরাহ করতে না পারলে কিংবা পণ্যের গুণগত মান ঠিক না থাকলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিতে, এমনকি বাতিলও করতে পারেন, যা অর্থনীতির জন্য কোনোভাবেই মঙ্গলজনক হবে না।

পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ রয়েছে ২৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। পেট্রোবাংলাসহ জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের এপ্রিলের পর এবারই দেশে গ্যাসের সরবরাহ সর্বনিম্ন। অবশ্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমানে যে সংকট চলছে কিছুদিনের মধ্যেই তার সমাধান হবে। মূলত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করা গ্যাস সরবরাহে দেশে দুটি রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) আছে। গত বছরের নভেম্বরে একটি ইউনিট সংস্কারের জন্য পাঠানো হয়। এ কারণে গ্যাসের সংকট বেড়েছে। এছাড়া ২০২৬ সালের মধ্যে দেশে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের কাজ চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

আমরা জানি, শীতকালে দেশে এমনিতেই বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে দৈনিক গড়ে দশ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুুতের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন করা হচ্ছে প্রায় এগারো হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু গরমকালে এই চাহিদা ব্যাপক পরিমাণে বেড়ে যাবে।

এর আগে গরমকালে সাধারণত ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুতের চাহিদা দেখা গেলেও এবার সেটি সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াটের উপরে চলে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। বিপুল পরিমাণ এই বিদ্যুতের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি আসে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো থেকে। পেট্রোবাংলার হিসেবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসের চাহিদাই হবে এবার দেড় হাজার মিলিয়ন ঘটফুটের মতো। তবে উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সার্বিক চাহিদা হলো ২২৪০ এমএমসিএফডি।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহ করা হচ্ছে সাড়ে সাতশ-আটশ এমএমসিএফডি গ্যাস। অর্থাৎ গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের যে চাহিদা রয়েছে সেটির বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ৪০ শতাংশের মতো। কাজেই গ্যাসের বর্তমান সংকট চলমান থাকলে আসছে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ বিভ্রাট প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। গরমকালে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক বেড়ে যাবে। তখন যদি এই গ্যাসের সমস্যা থাকে, তাহলে গরমকালে বিদ্যুৎ বিভ্রাট প্রকট হবে।

এরই মধ্যে আবহাওয়াবিদরা পূর্বাভাস করেছেন যে, চলতি বছর গরমের মাত্রা আরও বাড়তে পারে। তাদের এই বক্তব্য সত্যি হলে গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা এবারে আরও বাড়বে। কিন্তু বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া দৈনিক উৎপাদন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গ্যাস সংকটের কারণে এখনই ডজনখানেক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কম হচ্ছে, বেশ কয়েকটি বন্ধও রাখা হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে আসছে গরমকালে সরকার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে কীভাবে, সেই প্রশ্ন উঠছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্পকারখানা টিকিয়ে রাখতে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে সরকারকে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। সরকার কি শিল্পকে গ্যাস দেবে না কি সার কারখানাকে গ্যাস দেবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। কিছু কিছু সার দেশে উৎপাদন করার চেয়ে আমদানি করলে কম ব্যয় হয়। সেসব সার উৎপাদন বন্ধ রেখে শিল্পে গ্যাস দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া গ্যাস সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি এলএনজি আমদানির পরিমাণও প্রয়োজনমাফিক বাড়াতে হবে। সর্বোপরি জ্বালানি খাতে স্মার্ট ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে নিকট ভবিষ্যতে এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে না। সরকার দ্রুত গ্যাস সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।