
আবছার রাফি : অবশেষে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগে দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভেঙে হতে যাচ্ছে নতুন কমিটি। মেয়াদোত্তীর্ণ বর্তমান কমিটিতে ছাত্রত্বহীন, বিবাহিত ও ব্যাবসায়িক নেতার সংখ্যা আশংঙ্কাজন হারে বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টিতেও দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। এমনকি খোদ চার-চারবার কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগে নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও দীর্ঘ ১০ বছর ধরে নগর ছাত্রলীগ পরিচালিত হয়ে আসছে ২০১৩ সালের পুরোনো কমিটি দিয়ে। তাছাড়া নানা সময়ে বর্তমান কমিটির বিরুদ্ধে ইউনিট কমিটি গঠনে ‘মাই ম্যান’ কমিটি দেওয়া, গ্রুপভিত্তিক কাঁদা ছোড়াছুড়ি ও স্বেচ্ছাচারিতাসহ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে বারবার গণমাধ্যমের শিরোনাম হতে হয়েছে। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকেও পড়তে হয়েছে তোপের মুখে।
কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সূত্রে জানা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের নতুন কমিটি গঠন নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কাছে। ফলে তারা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে পুরাতন কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠনের পথে অগ্রসর হচ্ছেন। নতুন কমিটিতে অছাত্র, বিতর্কিতদের বিপরীতে ক্লিন ইমেজ, তরুণ, মেধাবী, দুঃসময়ে সংগঠনের জন্য কাজ করা কর্মীদের মূল্যায়ন করার কথা ভাবছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।
নগর ছাত্রলীগের নতুন কমিটি গঠন প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের আকাশে যখনই কমিটির চাঁদ উঠবে তখনই দেখতে পাবেন। চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের আকাশে খুব দ্রুতই কমিটির চাঁদ উঠবে।’
এদিকে দীর্ঘদিন পর নগর ছাত্রলীগের নতুন কমিটি গঠনের আভাস তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ায় নেতাকর্মীদের মাঝে উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে। নিজেকে শীর্ষপদে এগিয়ে রাখতে কেউ কেউ যোগাযোগ বাড়িয়ে চলছেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে। আবার অনেকে নগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, এমপি ও মন্ত্রীদের সুনজরে থাকতে চালাচ্ছেন জোর প্রচেষ্ঠা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন কমিটিতে শীর্ষপদ পাওয়ার ক্ষেত্রে আলোচনায় রয়েছেন দেড় ডজনখানেক ছাত্রলীগ নেতা। শীর্ষপদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন— রাকিব হায়দার; তিনি নগর ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ডবলমুরিং থানার সাধারণ সম্পাদক। দায়িত্ব পেয়ে এক শিক্ষিকাকে লাঞ্চনাসহ একাধিক অভিযোগে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছেন এই ছাত্রলীগ নেতা। শিক্ষামন্ত্রীর অনুসারী হিসাবে পরিচিত এই ছাত্রলীগ নেতা নতুন কমিটিতে শীর্ষপদে আসা নিয়ে কেন্দ্র থেকে নগরে সব জায়গায় আলোচনায় আছেন। তিনি এসএসসি-০৮ ও এইচএসসি-১০ ব্যাচের ছাত্র।
মোশারফ চৌধুরী পাবেল; এমইএস কলেজ ছাত্রলীগের এই নেতা ২০১৩ সালে হওয়া বর্তমান কমিটিতে কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে মহানগর ছাত্রলীগের দপ্তর সেলের দায়িত্বও পালন করেছেন। দীর্ঘদিন যাবত ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকা মোশারফ চৌধুরী পাভেল অতীতের ন্যায় সাম্প্রতিক সময়েও আলোচনায় আছেন। তিনি এসএসসি-০৮ ও এইচএসসি-১০ ব্যাচের ছাত্র।
ইমাম উদ্দীন কাদের নয়ন; বর্তমান কমিটিতে দপ্তর সেলের সদস্য হওয়ার পর বেশ পরিচিত পান তিনি। বেশ কয়েক বছর বাহারাইনে প্রবাসজীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে আবারও ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। বাহারাইনে থাকা অবস্থায় বাহরাইন শাখা যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকসহ একাদিক পদ পেয়েছিলেন বলেও শোনা যায়। মহানগর ছাত্রলীগ মূল পদপ্রত্যাশী হতে পারে এমন আলোচনায় ভালো ভাবেই আছেন নয়ন। তিনি এসএসসি-০৮, এইচএসসি-১০ ছাত্র।
মিজানুর রহমান; ১০ বছর আগে ২০১৩ সালে গঠিত চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের কমিটিতে তিনি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান। নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীরের একনিষ্ট কর্মী হিসাবে পরিচিত মিজান পরবর্তীতে বাকলিয়া থানা ছাত্রলীগের আহ্বায়কের দায়িত্বও পেয়েছেন। মহানগর ছাত্রলীগের দায়িত্ব পাওয়ার দৌঁড়ে ভালো ভাবেই এগিয়ে আছেন মিজান। তিনি এসএসসি-০৮, এইচএসসি-১০ ব্যচের ছাত্র।
কাজী নাঈম; নগরের আওতাধীন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট সরকারি হাজী মোহাম্মদ মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের আহ্বায়কের দায়িত্বে আছেন তিনি। দীর্ঘদিন যাবত ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত আছেন তিনি। কলেজে সংগঠিত হওয়া বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে সবসময় আলোচনায় থাকেন তিনি। এসএসসি-০৬, এইচএসসি-০৮ ব্যাচের ছাত্র কাজী নাঈম মহানগর ছাত্রলীগের দায়িত্ব পাওয়ার দৌঁড়ে খুব ভালোভাবেই আছেন বলে আলোচনা আছে।
মাহমুদুল করিম; প্রায় ৬ বছর আগে হওয়া নগরের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পান তিনি। জোর গুঞ্জন শোনা যায় মাহমুদুল করিমই হতে পারেন আগামীতে নগরের কান্ডারী। চট্টগ্রাম কলেজের দায়িত্ব পালনে স্বতন্ত্র ইউনিটের মতো নগর ছাত্রলীগের কর্মসূচির বাহিরে থেকে রাজনীতি করে যাচ্ছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে সাংগঠনিক গঠনতন্ত্র না মেনে নিজেদের স্বাক্ষরে নিজ ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে পুরোনগরে সমালোচিত হয়েছিলেন তিনি। তিনি এসএসসি-০৮, এইচএসসি-১০ ব্যাচের ছাত্র।
হাসমত খান আতিফ; কোনো ইউনিটের মূল পদে না থেকেও খুব ভালোভাবেই আলোচনায় আছেন সৃজনশীল ছাত্রনেতা হিসেবে পুরো নগরে পরিচিত হাসমত খান আতিফ। তিনি নগর ছাত্রলীগের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও কোতোয়ালী থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষামন্ত্রীর একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে কেন্দ্র থেকে নগর সর্বত্র তাকে নিয়ে জোর আলোচনা হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, অন্য আলোচিতদের তুলনায় তরুণ এই নেতা আসতে পারেন নগর ছাত্রলীগের মূল দায়িত্বে। তিনি এসএসসি-১২, এইচএসসি-১৪ ব্যাচের ছাত্র।
ফখরুল রুবেল; চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে বেশ জনপ্রিয় কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ফখরুল রুবেল। মহানগর ছাত্রলীগের নতুন কমটিতে মূল পদ পাওয়ার দৌঁড়ে এগিয়ে আছেন তিনি। দীর্ঘদিন যাবত কমার্স কলেজ ছাত্রলীগের সক্রিয় থাকার পুরস্কার হিসাবে কমার্স কলেজের সভাপতির দায়িত্ব পান। তিনি এসএসসি-০৭, এইচএসসি-০৯ ছাত্র।
আরাফাত রুবেল; নগর আওয়ামী রাজনীতির অন্য আরেকটি ধারা (সিটি কলেজ ব্লক) থেকে নগর ছাত্রলীগের মূল পদে ধারাবাহিক ভাবে দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি অব্যাহত থাকলে মূল পদে দেখা যেতে পারে আরফাত রুবেলকে। বর্তমান মহানগর কমিটির সদস্য আরাফাত রুবেল পরবর্তীতে নগর ছাত্রলীগের দপ্তর সেলের দায়িত্বও পালন করছেন। সিনিয়র নেতাদের কাছে আস্থাভাজন ও সুপরিচিত আরাফাত রুবেল এসএসসি- ১১, এইচএসসি- ১৩ ব্যাচের ছাত্র।
এম. এইচ ফয়সাল; মহানগর ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রলীগ (নৈশ) শাখার যুগ্ম-আহ্বায়ক ফয়সালকে নিয়েও আলোচনা তুঙ্গে। আগামী মহানগর ছাত্রলীগ কমিটির মূল পদে আসীন হওয়ার দৌঁড়ে আছেন তিনি। তিনি এসএসসি-১০, এইচএসসি-১২ ব্যাচের ছাত্র।
আশীষ সরকার নয়ন; চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ সভাপতির একনিষ্ঠ কর্মী হিসাবে পরিচিত তুলনামূলক তরুণ এই নেতা পেতে পারেন অনাগত কমিটির মূল দায়িত্ব। বিশ্বস্ততার পুরষ্কার হিসাবে ইতোমধ্যে পাওয়া সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রলীগ (নৈশ) শাখার আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত সকলের আলোচনায় আছেন আশীষ সরকার নয়ন। তিনি এসএসসি-১৩, এইচএসসি-১৫ ব্যাচের ছাত্র।
সৈয়দ ইবনে জামান ডায়মন্ড; বর্তমান সময়ে নগর ছাত্রলীগের রাজনীতিতে অধিকতর পরিচিত পাওয়া এই ছাত্রনেতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্রসংসদের জি. এস হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। কলেজে জনপ্রিয় হওয়ার পাশাপাশি সার্বিক বিবেচনায় তার নামও আছে বেশ আলোচনায়, ব্যাটে-বলে মিলে গেলে তিনিও পেতে পারেন নগর ছাত্রলীগের মূল দায়িত্ব। তিনি এসএসসি-১২, এইচএসসি-১৪ ছাত্র।
মীর মোহাম্মদ ইমতিয়াজ; ইসলামিয়া কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পাওয়ার পর রাজনৈতিক মহলে ভালোভাবে পরিচিতি পান তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে নগরজুড়ে বেশ আলোচনায় তুলনামূলক তরুণ এই নেতা। তিনিও পেয়ে যেতে পারেন মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তিনি এসএসসি-১২, এইচএসসি-১৪ ব্যাচের ছাত্র।
এছাড়া আরও আলোচনায় রয়েছে ওমরগণি এম.ই.এস কলেজ ছাত্রলীগের জাহিদুল ইসলাম প্রমি, নুরল আবসার রাফি, ইসলামিয়া কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি রাকিবুল হাসান রাকিব। কমার্স কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আলভী, মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের চার যুগ্ম-আহ্বায়ক রবিউল ওয়াহাব কমল, আনোয়ার হোসেন পলাশ, মায়মুন উদ্দীন মামুন , বোরহান উদ্দীন ও এম.ইউ সোহেল, চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সুভাষ মল্লিক সবুজ, সহ-সভাপতি মনিরুল ইসলাম মনির, সিটি কলেজ ছাত্রলীগের (দিবা) আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলী মিঠু, পতেঙ্গা থানা ছাত্রলীগের সভাপতি হাসান হাবীব সেতু, সিটি কলেজ ছাত্র সংসদের (বৈকালিক) সহ-সভাপতি মোহাম্মদ তাসিন।
তবে ব্যাচ ও সেশনভিত্তিক বয়স, দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বাদ যেতে পারেন আলোচনায় থাকা সিংহভাগ ছাত্রনেতা। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বয়স অনূর্ধ্ব ২৭। যেটা পরবর্তীতে মৌখিকভাবে করা হয়েছে অনূর্ধ্ব ২৯। যদি আলোচিত বেশিরভাগ ছাত্রনেতার বয়স ও নিয়মিত ছাত্র না হওয়ার ব্যাপারটি বাধা হয়ে না দাঁড়ায় তাহলে তারাই অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারেন।
এদিকে এই যাবত নগর ছাত্রলীগের বেশিরভাগ কমিটি দেওয়া হয়েছে কোনোরকম সম্মেলন ছাড়াই। এবার সম্মেলনের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে কি না জানতে চাইলে অবস্থা বুঝে, পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
প্রসঙ্গত, কেন্দ্র থেকে ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর ইমরান আহমেদ ইমুকে সভাপতি ও নুরুল আজিম রনিকে সাধারণ সম্পাদক করে ২৪ জনের আংশিক কমিটি দেওয়া হয়। এরপর ২০১৪ সালের ১১ জুলাই ওই ২৪ জনসহ ২৯১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ নগর ছাত্রলীগের কমিটির অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। বিভিন্ন ঘটনায় আলোচিত-সমালোচিত হওয়ার পর ২০১৮ সালের ১৯ এপ্রিল ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন নুরুল আজিম রনি। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর। পরবর্তীতে তাকেও ভারমুক্তও করা হয়। এক বছর মেয়াদের ওই কমিটি ইতোমধ্যে দশ বছর পার করেছে।
