বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়ন্ত্রণে চাই নিরপেক্ষ কমিশন

প্রকাশিতঃ ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ | ১১:১১ পূর্বাহ্ন


নজরুল কবির দীপু : বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থায় দেশজুড়ে চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছে। বেসরকারি চিকিৎসাসেবা এখন উচ্চ মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা। আর এই ব্যবসা চট্টগ্রামে বেশি রমরমা। মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কাছে জিম্মি রোগীরা। পুরো ব্যবস্থায় এখন চলছে মালিক, চিকিৎসকের স্বেচ্ছাচার ও চিকিৎসা সেবার নামে প্রতারণা।

ঢাকা-চট্টগ্রাম শহরসহ দেশের বিভিন্ন উপজেলায় ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য বেসরকারি ক্লিনিক গড়ে উঠেছে। এসব হাসপাতালে নেই বিদ্যমান আইনের কোনো প্রয়োগ। মালিক, চিকিৎসকদের ইচ্ছাই স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনার আইন। তারা ‘মেডিকেল প্র্যাকটিস, প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’ না মেনে রোগীদের থেকে ইচ্ছামতো ফি আদায় করছেন। অথচ রাষ্ট্রের কাছ থেকে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।

আমরা জানি, সরকারি হাসপাতালের দুর্ভোগ এড়াতে এবং দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার আশায় বেসরকারি হাসপাতালে ভিড় করে সব শ্রেণির মানুষ। উদ্বেগজনক হলো, বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের নাভিশ্বাস উঠেছে; অনেকে জমিজমা বিক্রি করে চিকিৎসা-ব্যয় মেটাচ্ছেন। বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ফিসহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা-ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধির বিষয়টি মেনে নেওয়া যায় না।

ডলারের দাম বৃদ্ধিতে ওষুধের কাঁচামাল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে দুবছর ধরে বিভিন্ন সেবার দাম দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে। চিকিৎসাসেবার মূল্য নির্ধারণে জাতীয় মানদণ্ড বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাইডলাইন না থাকায় এবং নজরদারির অভাবে স্বাস্থ্যসেবা নিতে যাওয়া রোগীদের অতিরিক্ত ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে।

এদিকে চিকিৎসাসেবা নিতে সেবাকেন্দ্রে আসা-যাওয়ায় পরিবহন ভাড়াবাবদ রোগী ও তাদের স্বজনদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। সেবার ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে অনেকে পরিপূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগে মাঝপথে চিকিৎসা নেওয়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। দেশে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।

জানা যায়, চিকিৎসাপ্রার্থীদের ৬০ শতাংশেরও বেশি অর্থ ব্যয় হয় ওষুধের পেছনে। বাকি অর্থ রোগ নির্ণয় বা বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসক দেখানো, হাসপাতালে ভর্তি এবং অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সেবা নেওয়ার পেছনে ব্যয় হচ্ছে।

টিআইবি’র গবেষণায় বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণহীন ও নিম্নমানের বেসরকারি চিকিৎসা সেবায় আর্থিক ও স্বাস্থ্যজনিত ক্ষতির শিকার হচ্ছেন সেবাগ্রহীতারা। কমিশন ব্যবসা ও বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধের মাধ্যমে সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। বেসরকারি চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নসহ এ খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে টিআইবি ১৬টি সুপারিশও পেশ করে। বেসরকারি সাস্থ্যসেবা খাত নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করার প্রস্তাব করা হয় সুপারিশে। স্বাধীন কমিশন গঠন ছাড়াও টিআইবির অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্য খসড়া আইনটি চূড়ান্ত করে আইন হিসেবে প্রণয়ন করা এবং নিয়ন্ত্রণ ও পরিদর্শন কার্যক্রম জোরদার করার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার অভাব, পরিদর্শন ও তদারকির ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি এবং অতি-মুনাফাভিত্তিক প্রকট বাণিজ্যিকীকরণের সম্মিলিত প্রভাবে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাত কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে।

আশার কথা হচ্ছে, নতুন সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন দেশের একজন নামকরা চিকিৎসক। গুণী এই চিকিৎসক স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় দেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি পাবে- এমন প্রত্যাশা করছেন অনেকেই। দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই তিনি অনিবন্ধিত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, ভুল চিকিৎসা হলে অবশ্যই দায়ী ব্যক্তির শাস্তি হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্য যেন অন্যান্য নেতাদের রাজনৈতিক বক্তব্যের মতো ফাঁকা বুলি না হয়। চিকিৎসার মতো একটি সংবেদনশীল বিষয়ে গাফিলতি করাকে অপরাধ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। প্রমাণ সাপেক্ষে এ ধরনের অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

এদিকে ডলার সংকটে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে গত দুবছরে অত্যাবশ্যকীয় ৯০ শতাংশের বেশি ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে। ২০২২ সালের জুলাইয়ে প্রথম প্রজ্ঞাপন দিয়ে ২০টি জেনেরিকের ৫৩টি ব্র্যান্ডের ওষুধের দাম বাড়ানো হয়। এর পাঁচ মাসের মধ্যে ডিসেম্বরে দ্বিতীয়বার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২৪টি ওষুধের দাম বাড়ায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে একদিকে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে, অন্যদিকে জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম শুধু বেড়েই চলেছে। জানা যায়, নতুন করে দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারা করছে ওষুধ শিল্প সমিতি, যা মোটেই কাম্য নয়।

মানুষ যাতে সহজে সরকারি হাসপাতালের সেবা পেতে পারে, সেজন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। বস্তুত চিকিৎসা খাতে মানুষের ব্যয় না কমলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হুমকির মুখে পড়বে, যা দেশের টেকসই উন্নয়নেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আমরা দেখছি, উচ্চ মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে বেসরকারি চিকিৎসা সেবা খাত বিকাশ হচ্ছে। এখানে তদারকির অভাব রয়েছে। সাধারণ মানুষ চিকিৎসা সেবা নিতে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছে। এজন্য এই বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করা দরকার। মান নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না। জনগণ প্রতারিত হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে আমরা পরিত্রাণ চাই।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।