চবিতে শিক্ষক সমিতির একাংশ গেল কর্মবিরতিতে, উপাচার্য বললেন ‘অন্য উদ্দেশ্য তাদের’


চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে টানা ৪ দিন কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষক সমিতি। এদিকে দাবি পূরণ হওয়ার পরও কেন আন্দোলনে অনড় রয়েছে শিক্ষক সমিতির একাংশ, এমন প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে।

রোববার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের এস রহমান হলে এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষক সমিতির নেতারা। দীর্ঘ দিন ধরে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ১৫-২০ জন শিক্ষক এই আন্দোলন করে আসছেন। সমিতির কার্যকমিটির সদস্য তাদের এই আন্দোলনে সমর্থন দেননি। আন্দোলনকারী শিক্ষকরা প্রায় সকলেই বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উপাচার্যের আমলে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

যদিও উপাচার্যের দাবি, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই মন্ত্রীসভা যেদিন গঠিত হয় তার পরদিন থেকেই তারা ৮-১০ জন মিলে আন্দোলনের নামে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এসব শুরু করেছে। ‘অন্য কোনো উদ্দেশ্যে’ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আন্দোলনের নামে শিক্ষক সমিতির মত একটি প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের প্লাটফর্ম ব্যবহার করছেন। তাদের ২৬ দফা দাবির মধ্যে ৯০ ভাগ দাবিই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাকিগুলো কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে যাবে। তাদের তিনি চিঠি দিয়েও আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়েছেন। মুঠোফোনে কল দিয়ে ও দফায় দফায় প্রতিনিধি পাঠিয়েও আলোচনায় বসতে বলেছেন। কিন্তু শিক্ষক সমিতি আসছে না।

এদিকে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের পদত্যাগের দাবি থাকলেও একাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে কোনো কর্মসূচি নেই শিক্ষক সমিতির।

ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে শিক্ষক সমিতির অবস্থান সম্পর্কে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে সভাপতি প্রফেসর ড. মুস্তাফিজুর রহমান ছিদ্দিকী ‘অপ্রস্তুত’ বলে জানান।

তিনি বলেন, এই ঘটনার জন্য আমাদের বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। এটি শিক্ষকদের জন্য অসম্মানের বলে আমি মনে করি। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন আছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যাতে ন্যায়বিচার হয় এই দাবি জানাচ্ছি।

আন্দোলন ও দাবি-দাওয়া নিয়ে শিক্ষক সমিতিকে উপাচার্যের ডাকে সাড়া না দেওয়ার প্রসঙ্গে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর আবদুল হক বলেন, ‘চিঠি দিয়ে, মৌখিকভাবে ও সরাসরি দফায় দফায় তার সঙ্গে বৈঠক করেছি। তিনি আমাদেরকে ডেকে মুখে সবকিছু মেনে নেন। কিন্তু এরপর তিনি অগ্রহণযোগ্য কাজগুলো দ্বিগুণ বেগে শুরু করেন।’

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর আবদুল হক বলেন, দেশের অন্যতম বৃহৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমরা আজ যখন শিক্ষার্থীদের নিয়ে ক্লাস, পরীক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যস্ত থাকার কথা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ দু’জন অভিভাবক উপাচার্য এবং উপ-উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন কিংবা এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা অত্যন্ত অনাকাঙ্খিত এবং চরম দুর্ভাগ্যজনক।

‘আপনারা জানেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য এবং উপ-উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন অগ্রহণযোগ্য কার্যক্রমের কারণে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানামুখী বির্তকের জন্ম দিয়ে আসছিলেন। তাঁদের নেতৃত্বাধীন এ প্রশাসন মহান বিজয় দিবস উদ্যাপনের ব্যানারে শহীদ মিনারের ছবি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়েরীতে বঙ্গবন্ধু টানেলের নামে যুক্তরাষ্ট্রীয় টানেলের ছবি স্থাপন করে যেমনি অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে তেমনি শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত অডিও কেলেঙ্কারীতে যুক্তদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারকে চরম লজ্জার মধ্যে নিপতিত করেছে।’

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৭৩ কে সমুন্নত রেখে মাননীয় উপাচার্য এবং উপ-উপাচার্যের নেতৃত্বে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও বিধিবদ্ধ পর্ষদ সিন্ডিকেট কর্তৃক যথাযথ আইন অনুসরণে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগসহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা যে সিন্ডিকেটের সভাপতি মাননীয় উপাচার্য নিজে এবং পদাধিকার বলে মাননীয় উপ-উপাচার্য একজন প্রভাবশালী সদস্য।’

‘বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ধারনার সাথে সংগতি সাধনের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৭৩ অনুযায়ী উপ-উপাচার্যসহ ১৪ সদস্য বিশিষ্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরীরত শিক্ষকগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যাটাগরির (অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক, ডিন, প্রভোস্ট এবং একাডেমিক কাউন্সিল) ৭ জন নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধি থাকার বাধ্যবাধকতা আছে। যার প্রায় সবগুলো পদ বর্তমান প্রশাসনের অধিকাংশ সময়জুড়ে শুন্য ছিল। অপর ৭টি সিন্ডিকেট সদস্য পদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট কর্তৃক মনোনীত ৩ জন প্রতিনিধির (২ জন সিনেট প্রতিনিধি এবং ১ জন বিশিষ্ট নাগরিক) মধ্যে একজন সিনেট প্রতিনিধি পুনরায় নির্বাচন না হওয়ার কারণে প্রায় ২৮ বছরব্যাপী কাজ করছেন এবং অপর দু’টি পদ বছরের পর বছর শুন্য। ফলশ্রুতিতে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের এই প্রশাসন দীর্ঘ সময় ধরে মাত্র ৫ জন সিন্ডিকেট সদস্য কর্তৃক (৩ জন চ্যান্সেলর কর্তৃক মনোনিত, ১ জন সরকার মনোনীত সরকারি কর্মকর্তা এবং ১ জন ২৮ বছরের পুরানো সিনেট প্রতিনিধি) বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে আসছেন যা কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৭৩ এর চরম লঙ্ঘন।’

লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ডিন’স কমিটির সভায় ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের সম্মানিত ডিন সিন্ডিকেটে প্রতিনিধি নির্বাচনের দাবি জানালে উপাচার্য তাঁর সাথে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এক পর্যায়ে সংবাদ মাধ্যমে উপাচার্যের দুর্নীতি বিষয়ক মতামত দানের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে কারণ দার্শানের নোটিশ করা হয় যার জবাবে ডিন বইয়ের আকারে মাননীয় উপাচার্য ও তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন দুর্নীতি বিষয়ক খতিয়ান উপাস্থাপন করেন। দ্রুত শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচানোর জন্য শিক্ষক সমিতি সরকারের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছে।

তিনি বলেন, প্রশাসনের নানান অগ্রহণযোগ্য কার্যক্রম বিষয়ক সংবাদ প্রদর্শনী ও আন্দোলন চলতে থাকবে। পাশাপাশি আগামী ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত এবং ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিক্ষক সমিতি বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক কর্মবিরতি (পরীক্ষা আওতামুক্ত থাকবে) ঘোষণা করছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চবি উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার এ প্রসঙ্গে বলেন, আমি শিক্ষক সমিতির সভাপতি মহোদয়কে বারবার কল করেই যাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরও বুধবার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এর আগে দুই জন সিনিয়র প্রফেসর গেছেন ওনাদের কাছে। ওনারা আসছেন না। ওনাদের দাবির প্রেক্ষিতে বাংলা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ আমি স্থগিত রেখেছি৷ আইন অনুষদের বিষয়ে শিক্ষক সমিতির আলোচনা করে আমি সমাধান করতে চাচ্ছি দীর্ঘদিন ধরে। ওনাদের আলোচনায় বসা উচিত। আন্দোলন করার কিছুই নেই। ২৬ দফা দাবির ২০ দফা আমি অনেক পরিশ্রম করে বাস্তবায়ন করেছি। মাঝেমধ্যে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুল ফটকে তালা দেয়। ট্রেন আটকে দেয়। ভাঙচুর করে বসে। এসবতো দীর্ঘদিনের সমস্যা। চাইলেই একদিনে সমাধান সম্ভব নয়। শিক্ষক সমিতি বলে, এসব আমাদের সমাধান করতে হবে। আমার কথা হলো, এসব দাবি সম্মিলিত প্রয়াসে সমাধান করতে হবে। ব্যাপারগুলো রাজনৈতিক।

উপাচার্য আরও বলেন, শিক্ষক সমিতির দাবি ছিল নতুন বাস দিতে হবে। আমি কয়েকদিন আগেই কয়েকটি বাস ও মাইক্রোবাস যুক্ত করেছি। শিক্ষকদের পারিতোষিক ৮০ শতাংশ বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিয়েছি। ঢাকার গেস্ট হাউজে নতুন ফ্ল্যাট কিনেছি। মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা করে সিনিয়র শিক্ষকদের টেলিফোন বিল প্রদান করেছি। চট্টগ্রামে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য ক্লাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছি। এ জন্য ফ্ল্যাট অথবা ভবন ক্রয়ে কমিটি করে দিয়েছি। শিক্ষক সমিতি বাংলা ও আইন বিভাগের নিয়োগ স্থগিত চেয়ে আন্দোলন শুরু করে। আমি যখন এগুলোও সমাধান করতে গেলাম, তারা পদত্যাগ চেয়ে আন্দোলন শুরু করলো। তাদের উদ্দেশ্য যদি দাবি আদায় হয়, তাহলে তাদেরতো আলোচনায় বসে সমাধান করতে হবে। আমার দরজা খোলা। আমি যেকোনো সময় আলোচনায় বসে সকল দাবি পূরণের মানসিকতা রাখি। এটা অতীতেও আমি করেছি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মন্ত্রীসভা গঠনের পরদিন থেকে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট করার সরকারবিরোধী পত্রিকায় নিউজ করিয়েছে। তা এখন ব্যানারে প্রিন্ট করিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে সাটিয়ে দিয়েছে। তবুও আমি বলেছি, আইন অনুষদের বিষয়টি শিক্ষক সমিতির সঙ্গে বসেই সমাধান করবো। তারা যেকোনো মুহূর্তেই আসতে পারে। আমি চিঠি দিয়ে রেখেছি। বারবার কল দিয়েছি সভাপতি মহোদয়কে।