চট্টগ্রাম: বাংলাদেশের বেশিরভাগ পুলিশ সদস্য জনগণের সঙ্গে মিশে ভালো কিছু করতে চায় বলে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর কার্ল ক্লার্ক। পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব হলে অনেক সমস্যার সহজ সমাধান হবে বলেও মনে করেন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে কর্মরত এই কর্মকর্তা।
সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের সদরঘাট থানার জুটরেলী কলোনী এলাকায় বিট পুলিশিং সভা পরিদর্শন করতে এসে তিনি এসব কথা বলেন।
কার্ল ক্লার্ক বলেন, আমরা ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশে পুলিশের সাথে কাজ করা শুরু করেছি। বিশেষ করে আমরা পুলিশকে যে বিষয়টাতে সহযোগিতা করতে চাচ্ছিলাম, জনগণের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করা। পুলিশের যে সাধারণ কার্যক্রমগুলো আছে, তারা তদন্ত করে, তারা জনগণের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। সেই বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন সময় আমরা পুলিশকে প্রশিক্ষণও দিয়েছি। ২০১০ সাল থেকে এই পর্যন্ত প্রায় ১৮ হাজার পুলিশ কর্মকর্তাকে আমরা বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা সবসময় বলে থাকি যে, ছোট ছোট বীজ রোপন করছি, সেই বীজ থেকে চারা হবে, বড় গাছ হবে। আমরা যখন ২০১০ সালে শুরু করছিলাম, তখন পুলিশ কর্মকর্তারা বলতেন, সময় নেই। অনেক কাজে তারা ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু আজকে সাত বছর পর এসে আমরা দেখি, পুলিশ কর্মকর্তারা জনগণের সামনা-সামনি বসে সমস্যার কথা শুনছে। তার মানে সে গাছটা আস্তে আস্তে বড় হয়েছে। আমি একজন পুলিশ অফিসার ছিলাম আমেরিকায়। অনেক জায়গায় দেখেছি, মানুষ শুধু বলে, হ্যাঁ, ঠিক আছে পুলিশ জনতার সাথে মিশে কাজ করবে। কিন্তু আজকে এখানে এসে দেখছি, এটা শুধু বলা কথা নয়। এটা আসলেই ঘটে, এটা আমি দেখতে পাচ্ছি।
কার্ল ক্লার্ক বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন পদের পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমি কাজ করেছি। আমি একটা বিষয় দেখেছি, ভালো-খারাপ সবসময় থাকে। কিন্তু বেশিরভাগ পুলিশ সদস্য জনগণের সঙ্গে মিশে ভালো কিছু করতে চায়। এটা আমি অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি। তারা কী সবসময় নির্ভুল হতে পারে? সবসময় হয় না। আমরা কেউই শতভাগ নির্ভুল না। পুলিশ চায় ভালো কিছু করতে জনগণের সাথে মিশে, সহযোগিতা নিয়ে। এটা আমি দেখতে পেয়ে আনন্দিত। পুলিশের ভাই-বোনেরা তাদের কাজটা কখনোই পুরোপুরি সম্পন্ন করতে পারবে না জনগণ সহযোগিতা না করলে।
তিনি বলেন, এখানে এসে আমি দেখতে পাচ্ছি, পুলিশের সাথে অন্তত কথা বলতে মানুষ এসেছে। আপনারা পুলিশকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছেন। এটা বড় একটা ধাপ। এতে আপনারা এগিয়ে গেছেন। এটা অনেকটা সম্পর্ক গড়ে তোলার মতো। আমরা যখন একটা পরিবারে থাকি, আমাদের মধ্যে অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝি হয়। অনেক সময় পরিবারের মানুষ ভুল করে। কিন্তু আপনারা পুলিশের কাছে এসে যদি কথা না বলেন, সবসময় তাদের সম্পর্কে একটা খারাপ ধারণা নিয়ে থাকেন, সেই ভুল বোঝাবুঝিটা দূর না করার চেষ্টা করেন, তাহলে কিন্তু এই সমস্যাটা বড় হয়ে যাবে। তাই পুলিশের কাছে এসে কথা বলতে হবে। ধরে নিতে হবে, তারাও একটি পরিবারের সন্তান। তাদের ভুল বা আমাদের ভুলটা কথা বলে দূর করা যেতে পারে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে কার্ল ক্লার্ক বলেন, আমি যখন আমেরিকায় পুলিশ কর্মকর্তা ছিলাম, তখন আমি আমার এলাকার জনগণকে সবসময় তিনটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতাম। প্রথমটি হচ্ছে, আপনার এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যাটা কী আপনার মতে? দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আমরা পুলিশের পক্ষ থেকে ওই সমস্যা দূর করতে আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি? তৃতীয় প্রশ্নটি হচ্ছে, ওই সমস্যাটা সমাধান করতে আপনি কীভাবে আমাকে সহযোগিতা করতে পারেন? কারণ এটা সত্যি যে, পুলিশের যেমন দায়িত্ব রয়েছে জনগণের উপরে, জনগণেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে পুলিশের প্রতি ও সমাজের প্রতি। কাজেই পুলিশ যেমন তাদের দায়িত্ববোধ থেকে সহযোগিতা করবে, তেমনি জনগণকেও তাদের দায়িত্ববোধ থেকে সহযোগিতা করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, এই তিনটি প্রশ্ন করার কারণ হচ্ছে, আমি চাইতাম সমস্যাটা প্রথমে জানা। এবং পরে সমাধানে পুলিশ ও জনগণকে একসঙ্গে করা। কারণ সবসময় একার পক্ষে সমস্যা সমাধান কখনো সম্ভব হয় না। তাই এমন যেন না হয়, পুলিশই বার বার আপনাদের কাছে গিয়ে বলছে। আপনারাও পুলিশের কাছে যান। ইউনিফর্ম পরিহিত যে কোন পুলিশের কাছে যান, বলুন আপনার সন্দেহের কথা, সমস্যার কথা। পুলিশ না আসলে আমরা যাবো না, এটা যেন না হয়। আপনারা পুলিশকে মানুষ হিসেবে জানার চেষ্টা করুন। নিজেদের এলাকার একজন সদস্য হিসেবে জানার চেষ্টা করুন। ইউনিফর্ম পরে থাকার কারণে পুলিশ যে আলাদা সেটা যাতে মনে না করেন।
তিনি বলেন, আজকের অনুষ্ঠানে কম বয়সী তরুণ-যুবকদের দেখে আমরা ভালো লাগছে। কারণ আপনারাই হচ্ছেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আপনাদেরও একটা বড় দায়িত্ব আছে। হয়তো একদিন আপনাদের মধ্যেই অনেকেই আছেন যারা পুলিশের ইউনিফর্ম পরতে পারবেন। যখন আপনি সেই জায়গায় যাবেন, তখন কখনোই ভুলে যাবেন না যে আপনিও এই এলাকা থেকেই উঠে এসেছেন।
অনুষ্ঠানে নিউইয়র্ক পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মুহাম্মদ করিমজাদা বলেন, এই ধরনের অনুষ্ঠানে আসতে পেরে আমি গর্বিত। এখান থেকে আমি অনেক কিছু শিখে যাচ্ছি। নিউইয়র্ক পুলিশে ২৫০ জন বাংলাদেশ পুলিশ কর্মকর্তা আছেন।
আবুধাবিতে কর্মরত যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ কর্মকর্তা এন্ড্রু কামারচিভাকুল বলেন, আমি সম্মানবোধ করছি এই ধরনের অনুষ্ঠানে আসতে পেরে। বাংলাদেশটা সুন্দর। চট্টগ্রামকেও দেখতে অনেক সুন্দর মনে হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় এখানের মানুষগুলো খুব সুন্দর। পুলিশকে ধন্যবাদ, এই ধরনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর কার্ল ক্লার্ক ও দুই পুলিশ কর্মকর্তার দেয়া ইংরেজি বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ করে দেন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কর্মকর্তা তানিক মুনীর।
সদরঘাট থানার ওসি মর্জিনা আক্তার বলেন, কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, ইভটিজিংয়ের কারণে মেয়ে সন্তানকে দ্রুত বিয়ে দিয়ে ফেলে অভিভাবকরা। কম বয়সের এই মেয়ে শশুরবাড়িতে গিয়ে কিছুই ভালোমতো সামলাতে পারে না। ফলে সৃষ্টি হয় ঝামেলা। এর জেরে অনেকেই আত্মহত্যাও করে বসে। এভাবেই প্রতিটি পদক্ষেপেই অন্যায় অপরাধ সৃষ্টি হচ্ছে। তাই আমার থানা এলাকায় ইভটিজিং ঠেকাতে আমি সর্বদা তৎপর। আমি যতদিন সদরঘাট থানায় আছি, ইভটিজিং চলবে না।
তিনি আরও বলেন, সাধারণ শিক্ষা অনেক ছেলে-মেয়ে নিতে চায় না। কিন্তু অভিভাবকরা তাদেরকে জোর করে সাধারণ শিক্ষা নিতে বলেন। এটা ঠিক না। এর ফলে তারা ভালোমতো পড়ালেখা করে না, অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এরকম ছেলে-মেয়েদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করা যায়। এতে তারা কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত হবে, অপরাধেও জড়িয়ে পড়বে না।
সভাপতির বক্তব্যে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেন বলেন, সামাজিক নানা অপরাধ কমানোর জন্য বিট পুলিশিং চালু করা হয়েছে। ছোট ছোট অপরাধগুলো স্থানীয়ভাবে সমাধান করে এলাকায় শান্তি বজায় রাখাই বিট পুলিশিংয়ের উদ্দেশ্যে। বিট পুলিশিং চালু করে জনগণের সাথে আরও বেশী সম্পর্ক স্থাপন করে আমরা সফলতাও পাচ্ছি।
সদরঘাট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রুহুল আমিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্থানীয় ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুর আহমেদ চৌধুরী, জুটরেলী কলোনীর সর্দার মো. মুনির ও স্থানীয় বাসিন্দা জোসনা বেগম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
