
ঢাকা : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক, প্রখ্যাত চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. দ্বীন মোহাম্মদ নুরুল হক বলেছেন, ডাক্তারদের মাস শেষে ১০ হাজার টাকা দিয়ে ওষুধ কোম্পানিগুলো নিজেদের ওষুধ লেখায়, এটা অপরাধ।
সোমবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) চক্ষুবিদ্যায় ২০ থেকে ২৩ সাল পর্যন্ত পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করা নবীন বিশেষজ্ঞদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান এসব কথা বলেন তিনি।
অধ্যাপক ডা. দ্বীন মোহাম্মদ নুরুল হক বলেন, চিকিৎসকদের তিনটি গুণ অর্জন করতে হবে, তাহলো: আদর্শ, সততা ও রোগীর প্রতি দায়িত্ববোধ। অনৈতিক উপার্জনের জন্য মরণের পর জবাবদিহি করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মরতে হবে। এসব কথা মাথায় রাখতে হবে। মন থেকে রেফারেল ফি’র চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমার ৪০ বছরে অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, আমি কোনো চশমার দোকান, কোনো ক্লিনিক থেকে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে পয়সা নেইনি। এটা আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি।’
নিজকে গঠন করতে পারলে রেফারেল ফি’র প্রয়োজন পড়বে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, দক্ষতা অর্জন করতে পারলে রোগীরাই খুঁজে বের করবে। এজন্য অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হবে।
বাংলাদেশে রেফারেল পদ্ধতি কমিশন নির্ভর হয়ে গেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, হাসপাতালের সামনে ফার্মেসি, সেখানে হাসপাতালের বিভিন্ন স্টাফ জড়িত। ডাক্তার, আয়া ও নার্সসহ অনেকেই জড়িত। ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক ও ডাক্তাররাও রেফারেল ফি’র সাথে জড়িত। কিন্তু সারা জীবনেও আমি এগুলো করিনি। এটা কেন দরকার হবে? রোগীর সঙ্গে চিকিৎসকের সম্পর্কটা বিশ্বাসের হলে এগুলো দরকার পড়বে না।
চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে রেফারেল ফি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, এখানে লেন্সের ব্যবসা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিদেশি লেন্সের কথা বলে সন্ধ্যায় এসব পয়সা ভাগ করা হতো।
অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নীরিক্ষা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোগীর একটু মাথা ব্যথা হলেই সিটি স্কান, এমআরই দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, অপ্রয়োজনীয় অনেক সার্জারি হয়। আর এতে রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। এমনকি মৃত্যুও হয়।
ইনস্টিটিউটের পরিচালক থাকাকালীন রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার স্বার্থে এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ নেন বলেও জানান অধ্যাপক দীন মোহাম্মদ নুরুল হক।
বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসা সমিতির (ওএসবি) মহাসচিব নোট স্পিকার অধ্যাপক ডা. দীপক কুমার নাগ বলেন, রেফারেল ফি নেওয়া নীতি-নৈতিকতার সাথে যায় না। ওষুধ কোম্পানি থেকে টাকা নেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয় বলেও এ সময় মন্তব্য করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় জেঁকে বসা অনিয়ম নিয়ে “চিকিৎসাসেবকদের লোভের বলি রোগী” শীর্ষক তিন পর্বের আলোচিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেছেন একুশে পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক শরীফুল রুকন। এই ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে তিনি তুলে ধরেন, ওষুধ বিক্রিতে রাজি করাতে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো ডাক্তারদের চেকের মাধ্যমে টাকা দিয়েছে। আরেক পর্বে তুলে ধরা হয়, নীতিমালার পরোয়া না করে বিভিন্ন চিকিৎসক কীভাবে ওষুধ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে দামী উপহার নিচ্ছেন, যে খরচ দিন শেষে ওষুধের দামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। তৃতীয় পর্বে উঠে আসে, ওষুধের মতো রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষাতেও মোটা অংকের কমিশন দিতে হচ্ছে ডাক্তারদের। ফলে, স্বাস্থ্য-পরীক্ষায় রোগীদের দ্বিগুণ খরচ করতে হচ্ছে।
