বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

চিকিৎসায় ব্যয় বাড়ছে, মানুষ ভুগছে

প্রকাশিতঃ ৯ জুন ২০২৪ | ৭:১৮ পূর্বাহ্ন


নজরুল কবির দীপু : দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। স্বাস্থ্য খাতে বেশ কিছু অর্জন এবং কিছু সূচকের অগ্রগতি ঘটলেও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে জনতুষ্টি আসেনি। স্বাস্থ্যসেবায় দিন দিন ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এরপরও বরাবরের মতো চলতি বাজেটেও স্বাস্থ্য খাতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলে আসছে। সেই কথা নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে না। জনস্বাস্থ্যবিদেরা মনে করছেন, প্রস্তাবিত বাজেট স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা সমাধানে কাজে আসবে না।

গত ৬ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। এটি প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। গত অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল জাতীয় বাজেটের ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ। অর্থাৎ গত অর্থবছরের তুলনায় এবার বরাদ্দ মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেশি।

এই বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। বাজেট যখন সংশোধিত হয়, তখন দেখা যায় স্বাস্থ্যের বরাদ্দের এই হার আরও কমে যায়। গত অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩–২৪ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল জাতীয় বাজেটের ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ। সংশোধিত বাজেটে তা কমে হয় ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে রাখার কথা বলে আসছে বহু বছর ধরে। এ দেশের জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, ১৫ শতাংশ না হোক, জাতীয় বাজেটের ৮ থেকে ১০ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হোক। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম রাখার এই প্রবণতা দীর্ঘদিনের।

টানা প্রায় ১০ বছর আমরা স্বাস্থ্যে বরাদ্দ ৫ বা ৫ শতাংশের কম দেখতে পাচ্ছি। এটা নানা কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রথমত কম বরাদ্দে মানুষ মানসম্পন্ন সেবা পাবে না। এতে স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তির পকেটের খরচ বাড়বে। মানুষ সেবা নেওয়া থেকে দূরে থাকবে। অথবা সেবা নিতে গিয়ে মানুষ দরিদ্র বা নিঃস্ব হয়ে পড়বে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে চিকিৎসায় বাংলাদেশে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ৭৪ শতাংশ। এটি প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বেশি। এর মধ্যে ওষুধে ব্যয় হয়েছে ৪৪ শতাংশ। গত এক বছরে হাসপাতালগুলোতে রোগনির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষার ফি, চিকিৎসকের পরামর্শ ফি ও ওষুধের ব্যয় বেড়েছে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ।

বাংলাদেশে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতে জনবলের সংকটও এক বড় অন্তরায়। প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য শূন্য দশমিক ৭ জন চিকিৎসক এবং শূন্য দশমিক ৪৯ জন নার্স ও মিডওয়াইফ রয়েছেন। আবার এই স্বল্প জনবলের মধ্যে ২৪ শতাংশ পদ শূন্য (২০২১ সাল)। ডব্লিউএইচওর নির্ধারিত মানদণ্ডের তুলনায় ৭৪ শতাংশ কম চিকিৎসক, নার্স এবং মিডওয়াইফ রয়েছেন।

অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে দেশে বহু মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে অব্যাহত ব্যয়বৃদ্ধির কারণে মানুষ কতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা বহুল আলোচিত। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে চিকিৎসা ব্যয় তিনগুণ বেড়েছে। ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় চিকিৎসা ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে।

জানা যায়, চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে না পারার কারণে অনেকে রোগ পুষে রাখতে বাধ্য হচ্ছে; অনেকের চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বস্তুত চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পারায় দেশের বিপুলসংখ্যক গরিব মানুষ রোগ-শোক নিয়েই বসবাস করছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে কেবল তখনই তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। ওষুধের কাঁচামাল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের আমদানি খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ফিসহ সব ধরনের চিকিৎসা ব্যয় বাড়িয়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, দেশে চিকিৎসাসেবার মূল্য নির্ধারণে জাতীয় মানদণ্ড বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাইডলাইন নেই। এ সুযোগে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো রোগীর কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে।

নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে এমনিতেই মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ওষুধের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে বহু মানুষের চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; অনেকে ঝুঁকছে ঝাড়ফুঁকের দিকে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশের স্বাস্থ্য খাত মুখ থুবড়ে পড়বে।

জানা যায়, চিকিৎসা ব্যয় কমানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আমরা মনে করি, চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে যা যা করণীয়, সরকারকে তার সবই করতে হবে। কোনো ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান অনৈতিকভাবে বাড়তি মুনাফা করার চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া সরকারের দায়িত্ব। সরকারের দায়িত্ব জনগণের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। তা সম্ভব না হলে দেশে কাঙ্ক্ষিত মানের জনশক্তি তৈরি হবে না। তবে চিকিৎসা খাত নিয়ে যত পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা হোক না কেন, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা রোধে কর্তৃপক্ষ কঠোর না হলে মানুষ কাঙ্ক্ষিত সুফল পাবে কি না সন্দেহ। কাজেই এদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।

আমরা মনে করি, স্বাস্থ্যসেবা খাতে সংকটের প্রধান কারণ বাজেট স্বল্পতা, দুর্বল অবকাঠামো ও জনবলঘাটতি। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষতা, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে একই বিশেষজ্ঞ দিয়ে চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হয়। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার আমূল পুনর্গঠনের দাবি জানাচ্ছি।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।