
একুশে প্রতিবেদক : ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে কিছুটা মন্দা দেখা দেওয়ার খবর দিয়েছে ওষুধের ব্যবহার ও বিক্রি নিয়ে বিশ্বব্যাপী গবেষণায় যুক্ত আইকিউভিআইএ।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদন বলছে, আগের তুলনায় বাংলাদেশে ওষুধ বিক্রি কমেছে। ২০২৩ সালে দেশে ওষুধ বিক্রি ২ শতাংশ বেড়ে ৩০ হাজার ৫৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের চার বছরের গড় প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশের তুলনায় অনেক কম।
আইকিউভিআইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে টার্নওভার ৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৩৯ কোটি টাকায় নেমে এলেও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ওষুধ বিক্রিতে শীর্ষ স্থানে আছে। তবে, আইকিউভিআইএর তথ্যের সঙ্গে একমত নন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম। তাঁর দাবি, তাঁরা এখনও বিক্রির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখেননি।
২০২৩ সালের ২৩ থেকে ২৫ জুলাই দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় জেঁকে বসা অনিয়ম নিয়ে “চিকিৎসাসেবকদের লোভের বলি রোগী” শীর্ষক তিন পর্বের আলোচিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় একুশে পত্রিকা।
এই ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে তুলে ধরা হয়, ওষুধ বিক্রিতে রাজি করাতে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো ডাক্তারদের চেকের মাধ্যমে টাকা দিয়েছে। আরেক পর্বে তুলে ধরা হয়, নীতিমালার পরোয়া না করে বিভিন্ন চিকিৎসক কীভাবে ওষুধ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে দামী উপহার নিচ্ছেন, যে খরচ দিন শেষে ওষুধের দামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
এই সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং বিশ্বব্যাপী একটি উদ্বেগের বিষয়। অনেক দেশেই ওষুধ কোম্পানিগুলো ডাক্তারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। তবে বাংলাদেশে এই সমস্যাটি তুলনামূলকভাবে বেশি প্রকট, কারণ দেশে স্বাস্থ্য খাতে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় সুশাসনের অভাব রয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা শামসুন নাহার বলেন, ‘ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের ওষুধ লেখার জন্য ডাক্তারদেরকে লাখ লাখ টাকার চেক দিয়েছে, এ বিষয়ে একুশে পত্রিকায় খুব ভালো প্রতিবেদন দেখেছি। এরপর থেকে প্রেসক্রিপশন পেলে আমি জানার চেষ্টা করি, ওই ওষুধগুলো আমার আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা। যখন দেখি ভিটামিন, ফুড সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয়েছে, তখন সেগুলো কেনা থেকে বিরত থাকি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন ও বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, ‘কিছু চিকিৎসক ওষুধ কোম্পানি থেকে চেক, দামি উপহার নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ রোগীদের প্রেসক্রিপশনে লিখে দেন। এটি একটি গুরুতর নৈতিক লঙ্ঘন এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের ফলে রোগীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে আমি মনে করি। এছাড়া মূল্যস্ফীতির ইস্যু আছে। যার কারণে রোগীরা এখন অপ্রয়োজনীয় ওষুধ কেনা থেকে বিরত থাকছেন বলে মনে হচ্ছে। ফলে ওষুধের ধীর প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে হতে পারে।’
দেশে ওষুধের খুচরা বিক্রির অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান লাজ ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লুৎফর রহমান জানান, গত কয়েক মাসে ওষুধ বিক্রি কমেছে। বিশেষ করে ভিটামিনের বিক্রি এখন অনেক কমেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক মুজিবুর রহমান জানান, এক বছর আগের তুলনায় ২০২৩ সালে হাসপাতাল ও চেম্বারে রোগীর হার কমেছে। অত্যাবশ্যকীয় নয় এমন ওষুধ প্রেসক্রাইব করার ক্ষেত্রেও চিকিৎসকরা সতর্ক আছেন বলেও জানান তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘দুই কোম্পানির একই ওষুধের দাম দুই রকম। এমনটি হওয়ার কারণ কী? দুই প্রতিষ্ঠানের ওষুধের মানের পার্থক্য কতটুকু সেটি তো সাধারণ মানুষ বোঝে না। তাহলে এসব দেখার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরা কতটুকু দেখছেন, সে প্রশ্ন থেকে যায়। গুরুতর সমস্যা না হলে এখন চেম্বারে যেতে চান না অনেক রোগী।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘প্রথমত ডাক্তারদের লোভের বলি হওয়ার কথা রোগীরা জানতে পেরেছেন। দ্বিতীয়ত উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। যার কারণে রোগীরা অপ্রয়োজনীয় ওষুধ কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। এটি স্বাস্থ্য খাতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রোগীরা এখন আরও বেশি সচেতন হয়ে নিজেদের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিচ্ছেন। এই পরিস্থিতি সরকার এবং নীতি নির্ধারকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে। তারা হয়তো চিকিৎসকদের নৈতিকতা এবং প্রেসক্রিপশন নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারেন।’
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘ওষুধ কোম্পানিগুলো যদি অ্যাগ্রেসিভ মার্কেটিং থেকে সরে আসে এবং এই খাতে খরচ কমিয়ে দেয় তাহলে সবার জন্য ভালো হবে। এজন্য চিকিৎসকদের এগিয়ে আসতে হবে।’
