বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি দায়বদ্ধতা ও রাষ্ট্রের কোটা চাপ


মাসুদ ফরহান অভি : বাঙালি জাতিকে স্বাধীন রাষ্ট্রীয় সত্তা এনে দিতে মুক্তির চূড়ান্ত মিছিল তৈরি করে জীবন হাতে নিয়ে ছুটেছিল দামাল কিশোর, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, জনতা। মুক্তির নেশায় বুদ হয়ে এই তরুণেরা একটি রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি করেছিল।

পাকিস্তান সামরিকজান্তার কামান/বুলেটগুলোকে পরোয়া না করে যারা স্বাধীন মানচিত্র দিয়েছেন এ জাতিকে, সে মুক্তি সংগ্রামীরা আজ অসম্মানবোধ করছে।

কারণ তারা তাদের স্বপ্নের এই রাষ্ট্রে পদে পদে বৈষম্য চাননি। তারা পাকিস্তানের বৈষম্যের বিরুদ্ধে জীবনবাজি রেখেছিলেন। তারা চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা। অনেকক্ষেত্রেই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অতিউৎসাহী ভূমিকায় দেখা গেছে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকদের। এই মুক্তিযোদ্ধাদের আবেগ-অনুভূতিকে অনেক সময় রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা হয়েছে। যারা আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। যে সরকারিই ক্ষমতায় থাকুক, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সম্মান শতভাগ রক্ষা করা হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ কোটা কি মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি ছিল? নিশ্চয় ছিল না। এত বেশি পরিমাণ কোটা বর্তমান সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করছে। কারণ এত সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোনো পদে আবেদনকারীই থাকে না। তাহলে স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর পর এত সংখ্যক কোটা মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের নামে রেখে দিতে হবে?

রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থার মাধ্যমে অথবা সরকার সময়ে সময়ে পরিসংখ্যান নিয়ে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়মিত করতে পারতো। এ সংস্কার না করার কারণেই বৈষম্য তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে।

এবার নারীদের বিষয়য়ে কিছুটা আলোকপাত করা যাক। এই উপমহাদেশে নারীদের চাকরিতেই শুধু অংশীজন করা নয়, তাদের ঘরের নেতৃত্ব দেওয়ার মানসিকতা পুরুষদের মেনে নিতে কষ্ট হয়। নারীরা যুগের পর যুগ এই উপমহাদেশে নিগৃহীত হয়েছে। পদে পদে নারীকে মানুষ হিসেবে ভাবা হয়নি। অধিকার দেওয়ার কথা কেউ চিন্তাও করেনি। এ মাটিতেই একসময় চালু ছিল সতীদাহ প্রথা। বিধবাদের সতীদাহ, অবহেলা এবং তাড়িয়ে দেওয়া, প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল। এই সমাজে এখনো নারীর উত্তরাধিকার ন্যায্যতার ভিত্তিতে নিশ্চিত হয়নি।

রাষ্ট্র যখন আধুনিক হতে শুরু করে, সভ্যতা যখন কিছুটা আলোকিত হয়, তখন থেকে নারীদের অধিকার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। সে আলোচনা সাম্প্রতিক অতীতে কিছুটা বেগ পেয়ে নারীদের অধিকার নিশ্চিতের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

এই নারীরা এই রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে কতটা ন্যায্যতা পেয়েছে, সে প্রশ্ন ঘুরেফিরে আলোচিত হয়েছে। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত প্রতিটি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নারীর কথা ভেবেই, নারীর রাষ্ট্রের কাছে যে অধিকার তা নিশ্চিত করতে, নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাকরি ব্যবস্থায় নারীর জন্য কোটা বিধান রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদ সর্বস্তরে নারীর সঙ্গে অংশগ্রহণ নিশ্চিত রাখার কথা বলেছে। রাষ্ট্রের সকল জনগোষ্ঠী যাতে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিসহ সকল ক্ষেত্রে সমভাবে সুযোগ প্রদানের কথাও এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হবে৷ মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করার জন্য, নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধাদান নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে৷ জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে নারীদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।’

সরকারি চাকরিতে অতিমাত্রায় আরোপিত ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কোটা কমিয়ে আসন্ন কোটা সংস্কার নিয়ে বৈঠক-আলোচনায় নারীদের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কোটা নিশ্চিত রাখা যায়। নারীদের জন্যও যথোপযুক্ত সুযোগ রেখে সরকারি চাকরিতে কোটা নির্ধারণ সময়ের দাবি।

পাশাপাশি, এই রাষ্ট্র কোটা ইস্যুর চাপে পড়ে যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে দিকে সকলকে সচেতন হতে হবে।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক সহ সভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি।