কক্সবাজার: দুই বছর আগে ফেনীতে ইয়াবাসহ ধরা পড়েছিল টেকনাফ থানার সাবেক এক এএসআই। তার স্বীকারোক্তিতে ইয়াবা পাচারে কক্সবাজার ডিবি পুলিশের অনেক সদস্যের নাম উঠে আসে। এরপর টানা ছয়মাস নিস্ক্রিয় ছিল ডিবি পুলিশ। দুই বছরের মাথায় এবার টেকনাফের এক ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে ১৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে কক্সবাজার ফেরার পথে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সাত সদস্যের একটি দলকে আটক করেছে সেনাবাহিনী।
বুধবার ভোরে সাবরাং হারিয়াখালী এলাকায় একটি মাইক্রোবাসসহ ১৭ লাখ টাকা নিয়ে তাদের আটক করে সেনাবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়।
গাড়িতে এসআই আবুল কালাম আজাদ, এসআই মো. মনিরুজ্জামান, এসআই (সেকেন্ড অফিসার) মনিরুজ্জামান, এএসআই মো. ফিরোজ, এএসআই মোস্তফা কামাল, এএসএই মো. আলাউদ্দিন, কনস্টেবল মোস্তফা আজম ও মো. আল আমিনসহ আটজন ছিলেন। গাড়ি থামানোর পর এসআই (সেকেন্ড অফিসার) মনিরুজ্জামান কৌশলে পালিয়ে যান।
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরুজুল হক টুটুল বলেন, অভিযুক্ত দুই এসআই, তিন এএসআই ও দুই কনস্টেবলকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে বুধবার বিকালে নিশ্চিত করেছেন।
ডিবির কাছে আটক ব্যবসায়ীর নাম হলো আবদুল গফুর। তিনি টেকনাফ পৌরসভার ৮নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মনিরুজ্জামানের ভাই ও কম্বল ব্যবসায়ী।
কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান বলেন, আবদুল গফুর গত মঙ্গলবার কক্সবাজার আয়কর অফিসে রিটার্ন জমা করতে যান। সেখান থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায় ডিবির একটি দল। এরপর তাকে ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে চালান করে দেয়ার হুমকি দিয়ে পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা দাবি করে ডিবির ওই দলটি। দর-কষাকষির পর ১৭ লাখ টাকায় তাকে ছেড়ে দিতে সম্মত হয় ডিবি দল। এসব বিষয় সেনাবাহিনীকে অবহিত করা হয়। কথামতো টেকনাফ এসে টাকা বুঝে পাওয়ার পর তাকে বুধবার ভোররাতে মেরিন ড্রাইভ এলাকায় ছেড়ে দেয় আটককারিরা।
বুধবার ভোরে ডিবির ওই সাত সদস্যকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে টেকনাফের সাবরাং ত্রাণকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা মেজর নাজিম আহমেদ জানান, তাঁর নেতৃত্বে ডিবির ওই দলটিকে আটক করা হয়।
মেজর নাজিম আহমেদ বলেন, আবদুল গফুরকে মঙ্গলবার সকালে অপহরণ করে ডিবির একটি দল। এরপর মুক্তিপণ হিসেবে পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা দাবি করে তারা। কিন্তু দর-কষাকষির পর ওই ব্যবসায়ীর পরিবার ১৭ লাখ টাকা দিতে রাজি হয়। টাকা পাওয়ার পর তাঁকে ভোররাতে কক্সবাজারের টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর ওই ব্যবসায়ীর পরিবার বিষয়টি সেনাবাহিনীকে জানান।
সেনাবাহিনীর সদস্যরা টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ এলাকার লম্বরী সেনাবাহিনীর তল্লাশিচৌকিতে ডিবির গাড়িটি সংকেত দিয়ে থামানো হয়। এ সময় মনিরুজ্জামান নামের একজন উপপরিদর্শক (এসআই) গাড়ির কাচ ভেঙে কৌশলে পালিয়ে যান। এসময় সাতজনকে আটক করা হয়। গাড়ি থেকে মুক্তিপণ হিসেবে আদায় করা ১৭ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। পরে ভোররাতেই তাঁদের সাবরাং সেনাবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়।
মেজর নাজিম জানান, তাদের আটকের পর পরেই জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরুজুল হক টুটুল সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে আসেন এবং তাদের সাথে আলোচনা হয়। আটকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দুপুরের পর তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যান। তবে মাইক্রোবাস ও উদ্ধার করা টাকা গুলো সেনাবাহিনীর হাতে রয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরুজুল হক টুটুল বলেন, বর্তমানে তারা পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। এটি জেলা গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক ইয়াসির আরাফাতের নিয়ন্ত্রণাধীন ২ নম্বর টিম। ইনচার্জকে না জানিয়ে আটকরা এসব অপকর্ম করেছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র বলছে, তালিকাভূক্ত এক ইয়াবা ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছিল। তারা কৌশলে ডিবি পুলিশকে ফাঁসিয়েছে।
এদিকে ২০১৫ সালের ২০ জুন ৬ লাখ ৮০ হাজার ইয়াবা নিয়ে ফেনীর লালপোলে র্যাবের হাতে ধরা পড়েন টেকনাফ থানার সাবেক এএসআই মাহফুজ। জিজ্ঞাসাবাদে মাহফুজ জানিয়েছিল, তার কাছ থেকে উদ্ধার করা ইয়াবাগুলো ছিল কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এএসআই বেলালের। একই সাথে গোয়েন্দা পুলিশের এসআই আমিরুল ইসলাম, এসআই কামাল আব্বাস, এসআই আনিসুর রহমান ও এসআই আনিসের ভাই হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রেঞ্জের কুমিরা ফাঁড়ির এসআই আশিকুর রহমানের নামও উঠে আসে।
পুলিশের একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) ব্যবহার করে ইয়াবা ব্যবসায় নেমে পড়ে বলে অভিযোগ উঠে। ওই ঘটনায় জুনের শেষ দিকে গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) দেওয়ান আবুল হোসেনসহ সকল পুলিশ কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি করা হয়েছিল।
