অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ


একুশে প্রতিবেদক : গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতনের পর, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে একটি কঠিন পথ অতিক্রম করতে হবে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে সরকার পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে এই সরকারকে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি, সরকারকে আরও বেশকিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, বাকস্বাধীনতা খর্ব, দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং উচ্চ বেকারত্বে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ অভ্যুত্থানে প্রকাশ পেয়েছে। নতুন সরকারকে এই ক্ষোভ প্রশমিত করতে হবে।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং বিশাল বিদেশি ঋণের চাপ মোকাবিলা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে, যার কারণ সরকার মেয়াদের বিষয়ে স্পষ্টতা না থাকা।

গত ১৬ জুলাই আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার দুই দিন পর থেকে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন পর্যন্ত ১৯ দিন অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতার সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ চলেছে। এই সংঘর্ষে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর গুলিতে চার শতাধিক আন্দোলনকারী এবং সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। পাল্টা আঘাতে বেশ কয়েকজন পুলিশও প্রাণ হারিয়েছে।

আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনামলের পতনের পর, প্রায় সব থানায় পুলিশ সরে গেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে থানাগুলোর ওপর হামলা হয়েছে। জনগণের মধ্যে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর গুলিতে প্রাণহানি, গ্রেপ্তার, ও নির্যাতন নিয়ে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, প্রতিটি হত্যার সঠিক বিচার হবে।

সরকার পতনের পর পুলিশ বাহিনীর অনুপস্থিতিতে বিভিন্ন স্থানে লুটপাট, আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িতে হামলা, এবং সংখ্যালঘুদের মন্দিরে নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষ এখন রাতভর সড়কে পাহারা দিচ্ছেন লাঠি হাতে।

অতিরিক্তি পুলিশ মহাপরিদর্শক শাহাব উদ্দিন খান স্বীকার করেছেন যে, জনগণের সাথে পুলিশের আস্থার সম্পর্ক একেবারেই ভেঙে গেছে। তবে তিনি বলেছেন, দায়িত্ব পালন এবং সেবার মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করেছে পুলিশ বাহিনী। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানোই সরকারের অগ্রাধিকার।

সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎ করা এক আইনজ্ঞ আভাস দিয়েছেন, নতুন সরকার সংবিধান বাতিল করতে পারে। অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি তুলেছে, কিন্তু কীভাবে তা বাস্তবায়িত হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত। তারা সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধনের দাবি তুলেছে এবং গণপরিষদ গঠন করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং গণভোটে অনুমোদনের পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়া কীভাবে হবে, তা এখনও অনির্দিষ্ট।

সংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, এবং বিশেষ করে শেখ হাসিনার আমলে নিয়োগ পাওয়া আপিল বিভাগের বিচারপতিদের অপসারণের দাবি উঠেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন বলেছেন, অভ্যুত্থানে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা ছিল, যা পূরণ করাই নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। অপশাসন, দুর্নীতি রোধ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আন্দোলনকারী জনতাকে সন্তুষ্ট রাখতে হবে। তবে এই কাজগুলো খুবই কঠিন।

নতুন সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জনপ্রত্যাশা পূরণের, কিন্তু কীভাবে তা করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হবে সরকারে। তবে তাদের সম্পৃক্ত করার কাঠামো এবং পদ্ধতি এখনও নির্ধারিত হয়নি।

অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সম্প্রতি দেশে অসন্তোষ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অভ্যুত্থানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের অন্যতম কারণ। রিজার্ভ ক্রমেই কমছে, রপ্তানি হ্রাস পাচ্ছে, এবং আগের সরকারের সময়ে ভুয়া তথ্য দিয়ে অর্থনীতিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।

নতুন সরকারকে দ্রুত অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে হবে, মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে হবে, এবং রিজার্ভ সঠিক করতে হবে। যদিও এ কাজগুলো কঠিন, তবে তা অসম্ভব নয়।

নতুন সরকার কতদিন ক্ষমতায় থাকবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। সংবিধান অনুযায়ী, তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। দৈব-দুর্বিপাকের কারণে এটি আরও তিন মাস পর্যন্ত পেছানো যেতে পারে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত নির্বাচন চায়।

অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন হবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। সরকার যদি সংস্কারের পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তবে তা বাস্তবায়নে বেশ কয়েক বছর লাগতে পারে। নির্বাচনের আগে সংস্কার ছাড়া, ভবিষ্যতে আবারও স্বৈরাচারের উদ্ভব হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভারতসহ কয়েকটি দেশের সমর্থন নতুন সরকার কতটা পাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন বলেছেন, বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর, বার্তা সংস্থা এএফপি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূস স্বল্প সময়ে ‘স্বপ্নের বাংলাদেশ’ পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে, এই সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, এবং কবে নাগাদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়েও নিশ্চিত কিছু জানা যায়নি।

এছাড়াও, বিবিসি, আল-জাজিরা, সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স, এনডিটিভি সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে আসছে। এসব সংবাদমাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের খবর গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নিলেন ইউনূস।’ ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ড. ইউনূসের মন্ত্রিসভায় সরকারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া দুইজন ছাত্রও রয়েছেন। প্রতিবেদনটিতে আশা প্রকাশ করা হয় যে, ‘দরিদ্রের ব্যাংকার’ হিসেবে খ্যাত ড. ইউনূস গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবেন।

প্রায় একই ধরনের শিরোনামে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং দ্রুত নির্বাচনের আয়োজনের লক্ষ্যে কাজ করবে। ইতিমধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই সরকারের প্রতি শুভকামনা জানিয়েছেন। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও ড. ইউনূসের সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র এগিয়ে নিতে একযোগে কাজ করতে প্রস্তুত তারা।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কলহবিধ্বস্ত একটি দেশকে সারিয়ে তুলতে দায়িত্ব নিলেন ড. ইউনূস।’ সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেশে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে, এবং এই পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব এখন ড. ইউনূসের ওপর ন্যস্ত হয়েছে। এরপর তাঁর প্রধান দায়িত্ব হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন তাদের প্রতিবেদনে ড. ইউনূসের জীবন ও কাজের বিস্তারিত তুলে ধরেছে। তারা উল্লেখ করেছে, ড. ইউনূস ২০০৬ সালে দারিদ্র্য বিমোচনে তার অবদানের জন্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনার কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর দেশের নেতৃত্বে শূন্যতা দেখা দেয়, যা সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের আশঙ্কা তৈরি করেছিল। তবে ড. ইউনূস এই শূন্যতা পূরণে দ্রুত নেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে সম্মত হন।

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম দ্য ডন ও জিও নিউজ, এবং ভারতের এনডিটিভিসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলোও বাংলাদেশের এই অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের খবরকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক আন্দোলনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ড. ইউনূস তাঁর সরকারের প্রথম দিনটি শুরু করেন। শপথ গ্রহণের সময় ৮৪ বছর বয়সী এই অর্থনীতিবিদ সংবিধান রক্ষা ও সমুন্নত রাখার শপথ নেন। তবে, তাঁর সরকারের সামনে যে কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা স্বীকার করতেও ভুল করেননি।