দেশের পোশাক শিল্পে সহায়তা কমছে, সংকট বাড়ছে


একুশে প্রতিবেদক : বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প বর্তমানে এক চরম সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সব ধরনের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের নগদ সহায়তা প্রদানে বিলম্ব ও প্রাপ্য অর্থের এক-তৃতীয়াংশ কর্তন শিল্পকে আরও বড় বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে প্রথম থেকেই সমস্যায় জর্জরিত শিল্পের ওপর নতুন করে আরও সমস্যা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর বাধ্যবাধকতার কারণে তারা প্রথম থেকেই কঠিন পরিস্থিতিতে ছিলেন। ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি না হওয়ায় সরকারের প্রাপ্য নগদ সহায়তা দিয়ে কোনোমতে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এখন সেই সহায়তাও সময়মতো না পাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাদের মতে, এই অবস্থার অবসান না হলে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।

এই সংকট নিরসনে শিল্পোদ্যোক্তারা প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি নীতিনির্ধারকদের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের মতে, আমদানি নির্ভরতার কারণে পোশাক খাত মূলত শুধু ‘দরজিগিরি’র পর্যায়েই রয়ে গেছে। তুলনামূলক সস্তা শ্রমের কারণেই এই শিল্প কোনোমতে টিকে আছে। তাই সরকারের উচিত নগদ সহায়তা বৃদ্ধি করা এবং দেশীয়ভাবে কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণ উৎপাদনে উৎসাহ প্রদান করা। ভারতের মতো সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের প্রসারে সহায়তা প্রদানের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

শিল্পোদ্যোক্তারা আরও মনে করেন, তুলা উন্নয়ন বোর্ডকে আরও কার্যকর করে দেশীয় তুলা উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

পোশাক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, বর্তমান সরকার সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে পরামর্শ না করেই তড়িঘড়ি করে অবাস্তব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা বলছেন, গ্যাসের দাম অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে, যদিও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইডিএফ ফান্ড ৩ কোটি ডলার থেকে কমিয়ে ২ কোটি ডলার করা হয়েছে, যা অধিকাংশ ব্যাংক দিতেও রাজি নয়। ব্যাংক ঋণের সুদের হার অনেক বেড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ হয়েছে, যা আগের চেয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি। এছাড়া, শ্রমিকদের মজুরিও ৭০ শতাংশ বেড়ে গেছে।

ডলারের অভাবের কারণে কারখানা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের প্রায় ৪০ শতাংশ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এছাড়াও তুলা ও অন্যান্য কাঁচামাল আমদানির জন্য ব্যাংকগুলো ঋণপত্র (এলসি) খুলতে অনীহা প্রকাশ করছে। এতসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শিল্পমালিকরা শুধুমাত্র নগদ সহায়তার উপর নির্ভর করে কোনোমতে টিকে আছেন। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার অজুহাতে এই নগদ সহায়তাও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, নগদ সহায়তার টাকা পেতে শিল্পমালিকদের মাসের পর মাস ব্যাংকে ধরনা দিতে হয়।

বাংলাদেশের শিল্পোদ্যোক্তারা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাধা মোকাবেলা করে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছেন। যদিও চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার বড় হয়েছে, তবুও নগদ সহায়তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি। চলতি অর্থবছরের (২০২৪-২৫) বাজেটে রপ্তানি প্রণোদনা বাবদ বরাদ্দ ৯ হাজার ২৫ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের (২০২৩-২৪) সংশোধিত বাজেটের সমান। এমনকি ২০২২-২৩ অর্থবছরেও বরাদ্দ ছিল একই, যদিও প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকৃত ব্যয় ৯ হাজার ৯ কোটি টাকা হলেও বরাদ্দ ছিল ৭ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি প্রণোদনায় ব্যয় হয় ৪ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা।

চলতি বছরের পহেলা জুলাই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার ৩৮টি খাতে নগদ সহায়তা কমিয়ে দেয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পোশাক খাত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগে দেশীয় সুতা ব্যবহার করে উৎপাদিত তৈরি পোশাক যদি কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন বাজারে রপ্তানি করত, তবে তারা সর্বোচ্চ ৯.১% নগদ সহায়তা পেত। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এই সহায়তা কমে এখন মাত্র ৫.৯%।

নগদ সহায়তা কমানোর যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হবে, ফলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুসারে রপ্তানি প্রণোদনা দেওয়া সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে, হঠাৎ করে সহায়তা বন্ধ করলে রপ্তানি খাত মারাত্মক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে, তাই সরকার ধীরে ধীরে এই সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শিল্পমালিকদের মতে, এলডিসি উত্তরণের অজুহাতে নগদ সহায়তা কমানো হয়েছে, যদিও এলডিসি উত্তরণে এখনও প্রায় আড়াই বছর বাকি। এমনকি উত্তরণের পরেও ২০২৯ সাল পর্যন্ত শিল্প খাত নগদ প্রণোদনা পেতে পারে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, যারা বিশ্বের ৫ম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং টেক্সটাইল শিল্পে শীর্ষস্থানীয়, ২০০৪ সালে এলডিসি উত্তরণের পরেও টেক্সটাইল শিল্পকে নানাভাবে সহায়তা দিয়ে আসছে। তাই, শিল্পমালিকরা মনে করেন, এলডিসি উত্তরণের নামে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পের প্রণোদনা কমানোর এই সিদ্ধান্ত শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সরকারের কাছে ৬ হাজার কোটি টাকার নগদ সহায়তা দাবি করা হলেও মাত্র ২ হাজার কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এখনও কোনো নগদ সহায়তা বিতরণ শুরু হয়নি, তবে এখন পর্যন্ত জমা হওয়া আবেদনগুলোর ভিত্তিতে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের পরিচালক আবুল বসার জানিয়েছেন, নগদ প্রণোদনার অর্থ বাজেট থেকে সরকার প্রদান করে থাকে, তবে চাহিদার তুলনায় কম অর্থ বরাদ্দ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, গত অর্থবছরে ৬ হাজার কোটি টাকা দাবি থাকলেও মাত্র ২ হাজার কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এখনও কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি, তবে এখন পর্যন্ত জমা হওয়া আবেদনগুলোর ভিত্তিতে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।

তিনি আরও জানান, সরকার যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এখানে কোনো ভূমিকা নেই। রপ্তানিকারকদের আবেদনের ভিত্তিতে একটি চাহিদাপত্র পাঠানো হয় এবং বরাদ্দকৃত অর্থ প্রাপ্তির পর তা বিতরণ করা হয়। কখনোই চাহিদাপত্র অনুযায়ী শতভাগ অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি এবং এর ফলে যে বিলম্ব হয়, তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নয়, বরং সরকারই দায়ী।

বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মন্তব্য করেছেন যে পোশাক খাত বর্তমানে এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যার উৎস দুই ধরনের – অভ্যন্তরীণ এবং বৈশ্বিক। বৈশ্বিক চাপ হয়তো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, কিন্তু সঠিক নীতিমালা ও সহায়তার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ চাপ কমানো সম্ভব। দুর্ভাগ্যবশত, সরকারের পদক্ষেপে সে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, রপ্তানি উৎসাহিত করতে যে নগদ সহায়তা দেওয়া হতো, এবারের বাজেটে তা বাড়ানোর পরিবর্তে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি সেই সামান্য সহায়তাও শিল্পমালিকরা সময়মতো পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার দাবি জমা পড়ে আছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য অনেক সময় গার্মেন্ট মালিকদের উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে পণ্য রপ্তানি করতে হয়। এটি করা হয় শুধু নগদ সহায়তার ভরসায়। কিন্তু যখন সহায়তা পেতেই বিলম্ব হয়, তখন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের নতুন সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল অভিযোগ করেছেন যে, আগের সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই সব সিদ্ধান্ত নিত। তিনি উল্লেখ করেন যে, এলডিসি উত্তরণের অজুহাতে প্রণোদনা কমানো হয়েছে এবং গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে, কোনো ক্ষেত্রেই ব্যবসায়ীদের মতামত নেওয়া হয়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন সরকার নীতিমালা তৈরির আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করবে, অন্যথায় দেশে শিল্প টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এবং বস্ত্রকল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতে টেক্সটাইল শিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন রাজ্যে এই শিল্পের বিকাশের জন্য নানা ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, তামিলনাড়ু ও মহারাষ্ট্রে নতুন শিল্প স্থাপনে প্রকল্প ব্যয়ের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ এবং শিল্প সম্প্রসারণে ১৫ শতাংশ মূলধন সহায়তা দেওয়া হয়। গুজরাটে ৩০ শতাংশ, অন্ধ্রপ্রদেশে পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপনে ৫০ শতাংশ এবং বিহারে প্রকল্পের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়। শুধু শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রেই নয়, জ্বালানি খরচ এবং ঋণের সুদের হারেও বিশেষ সুবিধা পান ভারতীয় শিল্পোদ্যোক্তারা। যেমন, গুজরাটে শিল্প স্থাপন করলে ১০ বছরের জন্য ব্যাংক ঋণের সুদ ৭ শতাংশ, অন্ধ্রপ্রদেশে ৭ বছরের জন্য ১২.৫ শতাংশ, টেক্সটাইল ও গিনিং শিল্পে ৭.৫ শতাংশ এবং বিহারে সুদের ১০ শতাংশ অর্থ সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়। এছাড়াও, গুজরাটে টেক্সটাইল পার্কে বিনিয়োগ করলে ২৫ শতাংশ বিশেষ সহায়তা দেওয়া হয়।

একইভাবে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিদ্যুৎ খরচেও অনুদান দেওয়া হয়। যেমন, গুজরাটে প্রতি ইউনিটে ২ রুপি, অন্ধ্রপ্রদেশে ১-২ রুপি এবং বিহারে ২ রুপি অনুদান দেওয়া হয়। জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশে মোট প্রকল্পের ৫ শতাংশ বা জমির মূল্যের ৫০ শতাংশ অর্থ, মহারাষ্ট্রে স্ট্যাম্প ডিউটি মওকুফ এবং তামিলনাড়ুতে জমির দামে ৫০ শতাংশ প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়।

জ্বালানি ছাড়াও ভারতে কর সুবিধাও দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, তামিলনাড়ুতে ৫ বছরের জন্য কর অবকাশ সুবিধা, মহারাষ্ট্রে স্ট্যাম্প ডিউটি ও সেলস ট্যাক্স মওকুফ এবং বিহারে শতভাগ সেলস ট্যাক্স ফেরত দেওয়া হয়। এছাড়াও, বিহারে ফ্রেইট খরচে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ অনুদান রয়েছে।

শুধু তাই নয়, তামিলনাড়ু ও মহারাষ্ট্রে দক্ষতা উন্নয়ন অনুদান-ভর্তুকি দেওয়া হয়। বিহারে দক্ষতা উন্নয়নে প্রতি শ্রমিক প্রতি বছর ২০ হাজার রুপি অনুদান এবং শ্রমিক অনুদান হিসেবে ৫ হাজার টাকা করে ৫ বছর দেওয়া হয়।

ভারতের নীতিসহায়তা বিশ্লেষণ করে আরও দেখা গেছে যে, কোনো টেক্সটাইল মিল যদি ৫ কোটি ডলার রপ্তানি করে, তবে শুধুমাত্র সহায়তা হিসেবেই (রোডট্যাপ, ডিউটি ড্র ব্যাক, ফ্রেইট গ্রান্ট) ৩২ লাখ ডলার সাবসিডি পায়। এছাড়াও বিদ্যুতে প্রণোদনা হিসেবে ৯০ লাখ রুপি পাওয়া যায়।