রাতভর কলকাতার রাজপথ দখল করে নারীদের বিক্ষোভ


আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মধ্যরাতের সন্ধিক্ষণে নারীদের গর্জনে গর্জে উঠল পশ্চিমবঙ্গ। ভারতের স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো বাংলায় এত বড় অরাজনৈতিক জনজোয়ার। দেশটির ৭৮তম স্বাধীনতা দিবসের মধ্যরাতে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে নারী স্বাধীনতার এ যেন এক অন্য রূপকথা লেখা হলো বুধবার রাতে।

আরজি কর কাণ্ডের প্রতিবাদে রাজপথের দখল নিল মেয়েরা। কলকাতা থেকে কালনা, বনগাঁ থেকে বেহালা, সর্বত্রই দেখা গেল এক ছবি। শয়ে শয়ে নারী রাজপথে নেমে, মোমবাতি-মশাল হাতে দখল নিল রাতের। কার্যত গণজাগরণ ঘটল পশ্চিমবঙ্গে।

কলকাতার মাল্টি সুপার স্পেশালিটি সরকারি হাসপাতাল আরজি করে এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণের পর খুনের ঘটনায় নজিরবিহীন প্রতিবাদ দেখল ভারত। দোষীদের শাস্তির দাবিতে দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। তার মধ্যেই স্বাধীনতার মাঝরাতে রাতের পথ দখল করতে রাস্তায় নামেন লাখ লাখ নারী পুরুষ। এই ‘রাত দখলের’ প্রথম ডাক দিয়েছেন প্রেসিডেন্সি কলেজের এক প্রাক্তনী রিমঝিম সিনহা। রাজনৈতিক রঙ ছেড়ে শুধু নারী সুরক্ষার কথা ভেবে এই জমায়েতে সামিল হওয়ার বার্তা ছিল। তাতেই সাড়া দিয়েছে গোটা রাজ্য। দাবি শুধু একটাই, শাস্তি চাই। কড়া শাস্তি। তাঁদের স্লোগান, উই ওয়ান্ট জাস্টিস।

কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ, জেলার দার্জিলিং থেকে কাকদ্বীপ মধ্যরাতে লাখো জনতার দখলে চলে যায় রাজপথ। খোদ পুলিশ কর্মীরা বলছেন ‘নন্দীগ্রাম পর্বে জনজোয়ার আছড়ে পড়েছিল কলকাতায়। এবার তা পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। এমন আন্দোলন আমরা দেখিনি।’

বুধবার রাত সাড়ে ১১টা থেকে রাস্তার দখল নিতে শুরু করে মেয়েরা। রাত যত বাড়তে থাকে ভিড় বাড়তে থাকে ততই। যাদবপুর, অ্যাকাডেমি, কলেজ স্ট্রিট থেকে শুরু করে শহরের প্রতিটি কোনা, জেলায় জেলায় চলে জমায়েত। এমনকি রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরুতেও রাত দখলের কর্মসূচি পালন করা হয়েছে ন্যায়বিচারের দাবিতে।

কলকাতার তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায় দিল্লিতেও পালিত হয় ‘মেয়েরা রাত দখল করো’ কর্মসূচি। দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কে রাত দখল বা ‘রিক্লেম দ্য নাইট’-র ডাক দেওয়া হয়। মুম্বাইয়ের আন্ধেরিতে পশ্চিম ইনফিনিটি মলের সামনেও জমায়েতের ডাক দেয়া হয়। বেঙ্গালুরুতে স্লিকবোর্ড জংশন (৫০০ডি বাস স্টপের কাছে), ফিনিক্স মার্কেট সিটি (হোয়াইটফিল্ডের মেইন গেটের কাছে), কোরমঙ্গল ফোরাম মলের সামনে জমায়েত করা হয়।

তবে সারাদেশ জুড়ে এত জমায়েত হলেও রাতের আঁধারে দুষ্কৃতকারীদের দখলে চলে যায় আরজি কর হাসপাতাল। সেখানে রাত দখল কর্মসূচি পালন করতে গেলে মধ্যরাতে হাফ প্যান্ট-স্যান্ডো গেঞ্জি পরিহিত একদল দুষ্কৃতকারী হাসপাতালে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করে।

তারা প্রমাণ লোপাটে সেমিনার রুম, হাসপাতালের ইমার্জেন্সি, ওটি রুম, মর্গ, প্রসূতি বিভাগসহ একাধিক জায়গায় গিয়ে ভাঙচুর চালায়।

পরে পরিস্থিতি সামলাতে একের পর এক কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায় পুলিশ। চলে লাঠিচার্জও। খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছান সিপি বিনীত গোয়েল।

আর জি কর হাসপাতালের চিকিত্সকরা জানান, ওই এলাকায় পুলিশ উপস্থিত থাকার পরেও তাণ্ডব আটকানো যায়নি।

জানা যায় ওই দুষ্কৃতকারীদের হাতে ছিল লাঠি-রড ও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। এ ঘটনায় একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।

গোটা ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তৃণমূল এমপি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, ‘হাসপাতালে তাণ্ডব সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। আমি কলকাতার সিপির সঙ্গে কথা বলেছি। রাজনৈতিক রং না দেখে হামলার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আন্দোলনকারী ডাক্তারদের দাবি ন্যায়সঙ্গত। তাদের সুরক্ষাকেই অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।

দুষ্কৃতীদের হামলা থেকে বাদ যায়নি বামেদের অবস্থান মঞ্চও। ঘটনাস্থল থেকেই এর নিন্দা করেন সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়।