বিদেশে এস আলমের ‘অবৈধ সাম্রাজ্য’, দুদকের তদন্তে নতুন মোড়


একুশে প্রতিবেদক : এস আলম গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা পাচার করে সিঙ্গাপুরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে এস আলম গ্রুপের ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের তথ্য ও নথিপত্র চেয়েছে।

দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত বছর আগস্টে এই অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল, কিন্তু উচ্চ আদালতের আদেশে তা বন্ধ ছিল। আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণের পর আবার অনুসন্ধান শুরু হয়েছে এবং দুদকের মানিলন্ডারিং শাখার পরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী এটি তদারকি করছেন।

এস আলম, যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তার প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে অর্থপাচার ও ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের মুখোমুখি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১২ হাজার কোটি টাকা পাচার করে সিঙ্গাপুরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। এমনকি গত এক দশকে সিঙ্গাপুরে কেনা বিভিন্ন সম্পদের কাগজপত্র থেকেও এস আলম তার নাম সরিয়ে ফেলেছেন। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাড়পত্র ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ নিষিদ্ধ এবং এর শাস্তি সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড ও পাচারকৃত অর্থের দ্বিগুণ অর্থদণ্ড।

১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সাইফুল আলমের এস আলম গ্রুপ বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, যার ব্যবসার পরিধি বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত। ২০২৩ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশ থেকে ৪০.১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে বিনিয়োগের জন্য নেওয়া হলেও, ২০০৯ সালের পর থেকে কেবল সিঙ্গাপুরেই এস আলমের দুটি হোটেল ও একটি বাণিজ্যিক স্পেস কেনার জন্য ব্যয় হয়েছে ৪১১.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা অনুমোদিত বিনিয়োগের পরিমাণের চেয়ে প্রায় দশগুণ বেশি।

অভিযোগ অনুসারে, সাইফুল আলম ও তার স্ত্রী ফারজানা পারভীনের সিঙ্গাপুর, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড এবং সাইপ্রাসে বিনিয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০০৯ সালে সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব এবং সিঙ্গাপুরের বাসিন্দা হিসেবে তারা সিঙ্গাপুরে ক্যানালি লজিস্টিকস প্রাইভেট লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন, যার শুরুতে ইস্যু করা ও পরিশোধিত শেয়ার মূলধনের পরিমাণ ছিল ২২.৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আলম ও তার স্ত্রী যথাক্রমে ৭০% এবং ৩০% শেয়ারের মালিক ছিলেন।

এস আলম এবং তার স্ত্রী ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের একটি অফশোর শেল কোম্পানি পিকক প্রপার্টি লিমিটেডের সাথেও সংযুক্ত। এছাড়াও, ২০১৬ সালে সাইপ্রাসে এস আলম অ্যাকলেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করেন, যার নাম পরবর্তীতে পরিবর্তন করে অ্যাকলেয়ার ইন্টারন্যাশনাল রাখা হয়।

অভিযোগ অনুসারে, ২০১৪ সালের ২৬ আগস্টে এস আলমের ক্যানালি লজিস্টিকস সিঙ্গাপুরে ৩২৮ কক্ষের গ্র্যান্ড চ্যান্সেলর প্রাইভেট লিমিটেড হোটেলটি ১৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে কেনার জন্য চুক্তি করে। কয়েকটি কিস্তিতে নগদে মূল্য পরিশোধের শর্তে ক্যানালি ইতোমধ্যে ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে।

২০২১ সালের শেষে হোটেলটির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ৭.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অধিগ্রহণের এক বছর পরে হোটেলটির নাম পরিবর্তন করে গ্র্যান্ড ইম্পেরিয়াল হোটেল প্রাইভেট লিমিটেড করা হয় এবং বর্তমানে এটি হিল্টন গার্ডেন ইন সেরাঙ্গুন নামে পরিচালিত হচ্ছে।

সিঙ্গাপুরের গণমাধ্যম দ্য বিজনেস টাইমস অনুসারে, ২০১৬ সালে ক্যানালি লজিস্টিকস সিঙ্গাপুরে একটি বাণিজ্যিক স্পেস ১০০.৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে কিনে নেয় এবং পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে উইলকিনসন ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড করে। ২০২১ সালে এই কোম্পানির সম্পদের মোট মূল্য ছিল প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এছাড়াও, অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে যে এস আলম ও তার স্ত্রী ২০২১ সাল পর্যন্ত মধ্য সিঙ্গাপুরে একটি বাড়ির মালিক ছিলেন, যার ২০১৮ সালের বার্ষিক ভাড়ার মূল্য ছিল ৫ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। এছাড়াও, তাদের আরেকটি বাড়ির মালিকানা সিঙ্গাপুরের একটি ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যা সিঙ্গাপুরের করমুক্ত আয় বণ্টন ও এস্টেট শুল্কমুক্ত উত্তরাধিকারের সুবিধা প্রদান করে।