চামড়াশিল্পে ৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের হাতছানি

চট্টগ্রাম : প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে গার্মেন্টসশিল্পের মতো বাংলাদেশের চামড়াশিল্প হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা-অর্জনকারী একটি বৃহত্তম খাত। আগামী তিন বছরের মধ্যে এই খাতে বাংলাদেশের সামনে ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের হাতছানি।

এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এগিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের রিফ লেদারসহ দেশের চারটি নেতৃস্থানীয় চামড়াশিল্প প্রতিষ্ঠান। ইতালির মিলানে সদ্যসমাপ্ত আন্তর্জাতিক চামড়া মেলায় অংশ নিয়ে বিশ্ববাজারে এই অমিত সম্ভাবনার গল্প শুনিয়েছেন বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের উদ্যোক্তারা। চামড়াশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশিরাও মনে করেন বাংলাদেশের চামড়াশিল্প এগিয়েছে বেশ।

পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ‘মিলান ফিয়েরা লিনিয়া পেল্লে’ বা আন্তর্জাতিক চামড়ামেলা শেষ হয়েছে গত ১২ অক্টোবর। এতে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর ১৪৮টি দেশ। বিশ্বের ২ হাজার চামড়াজাত পণ্য স্থান পায় এই মেলায়। আর সেখানে বরাবরের মতো এবারও সগৌরবে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশের রিফ লেদার (চট্টগ্রাম), বেঙ্গল লেদার কমপ্লেক্স লিঃ, এপেক্স ট্যানারি ও আকিজ গ্রুপ।

বিশ্বের নামিদামি প্রদর্শনীতে দেশিয় চামড়াজাত পণ্যের গুণগত মান তুলে ধরে এই প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক পরিম-লে জানান দিয়েছে চামড়াশিল্পে বাংলাদেশের অযুত সম্ভাবনা ও শক্তিশালী অবস্থান।

১৯৭৬ সালে যখন চামড়াশিল্পের গোড়াপত্তন, তার অব্যবহিত পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের বাজার ছিল একেবারে ছোট, ১৬ কোটি টাকা। আর সে বাজার এখন ২ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ২শ’ কোটি ডলার। নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে এই বাজার তৈরি করেছেন আমাদের চামড়াশিল্প উদ্যোক্তারা।

বাংলাদেশের সামনে এখন ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের চামড়ার বাজারের লক্ষ্যমাত্রা। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এখন দরকার অনুকূল পরিবেশ ও সরকারের যৌক্তিক পৃষ্ঠপোষকতা। দরকার এই শিল্পের জন্য প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা ও দক্ষ মানবসম্পদ।

মেলায় অংশ নিয়েই সেখানকার সাংবাদিকদের কাছে এই সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন এপেক্স’র চেয়ারম্যান সৈয়দ মনজুর এলাহী। তিনি বলেন, ‘আমরা নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে বাংলাদেশের চামড়াশিল্পকে এই পর্যায়ে এনেছি। আমাদের কোয়ালিটি বাড়ানোর জন্য প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বিকল্প নেই। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন হিউম্যান রিসোর্সেস বা দক্ষ মানবসম্পদ। এ জন্য আমাদের না আছে পড়াশোনা, না আছে ওয়ার্কশপ। লেদার ইনস্টিটিউট একটি আছে নামকাওয়াস্তে। আমাদের অনেক লোক আছে, কিন্তু এমপ্লয়েবল লোক নেই। এজন্য আমাদেরকে বাইরের দেশের উপর নির্ভর করতে হয়।’

চামড়াশিল্পের গুণগতমান উন্নয়নের জন্য ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ও ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট’র প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করে সৈয়দ মনজুর ইলাহী বলেন, ‘টেকনোলজিই আপনাকে ফার্স্ট করবে। দিস ইজ অ্যা গ্লোবালাইজড ওয়ার্ল্ড। ওয়ার্ল্ড কী চায় আপনাকে সেটা বুঝতে হবে। ওয়ার্ল্ডের ডিমান্ডের সাথে এডজাস্ট করতে হবে। ওয়ার্ল্ড আপনাকে এডজাস্ট করবে না। ওয়ার্ল্ডের সাথে এডজাস্ট করার জন্য আমাদের চেষ্টার সাথে সরকারের আনুকূল্য জরুরি। তবেই আমরা আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হবো।’

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি ও অক্টোবর মাসে ইতালির মিলানে অনুষ্ঠিত হয় তিনদিন ব্যাপী আন্তর্জাতিক চামড়া মেলা। প্রতিবারই অংশ নিয়ে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করছে আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত চট্টগ্রামের চামড়াশিল্প প্রতিষ্ঠান রিফ লেদার। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (অপারেশন) মোখলেসুর রহমানের কণ্ঠে ছিল বাংলাদেশি চামড়াশিল্পের গৌরবগাথা ও অর্জনের সুর।

মেলায় তিনি বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরেন এভাবে, ‘চামড়াশিল্পে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। ব্যবসা নয়, বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করাই আমাদের মেলায় অংশগ্রহণের মূল উদ্দেশ্য। বিশ্বমানের চামড়াজাত পণ্যের পসরা সাজিয়ে মূলত চামড়াশিল্পে বাংলাদেশের অর্জনকেই আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করি। এতে করে বিদেশিরা দিন দিন আমাদের উৎপাদিত চামড়াজাত পণ্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, এই আশা-প্রত্যাশার জায়গায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ চামড়াশিল্পে বিশ্বজয় করবে। তবে সেজন্য দরকার অনুকূল পরিবেশ ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা। বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য সম্পর্কে বিশ্ববাজারে আমরা ধারণা পাল্টে দিতে পেরেছি, নতুন ট্রেন্ট আনতে সক্ষম হয়েছি- এ মুহূর্তে সেটাই বাংলাদেশের সব থেকে বড় অর্জন।’

এপেক্স’র মহাপরিচালক রহমত উল্লাহ এমপি বলেন, ‘দেশের চামড়াশিল্পের প্রসারে বর্তমান সরকার আন্তরিক। তবে এ আন্তরিকতা আরো বাড়াতে হবে। চামড়াশিল্পের জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যে সুযোগ-সুবিধা রয়েছে আমাদের দেশে সেগুলো নিশ্চিত করা গেলে আগামী তিনবছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়াশিল্প নেতৃত্ব দেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’

বেঙ্গল লেদার কমপ্লেক্স লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘চামড়াশিল্পে অনেকগুলো সমস্যা রেখেই আমরা এতদূর হেঁটেছি। সরকারি সহযোগিতা পেলে চামড়াশিল্পে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা হবে ঈর্ষন্বীয়।’