
একুশে প্রতিবেদক : রপ্তানি পণ্যের নমুনা পাঠাতে সাধারণত বেশি খরচ হয় না। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে যেখানে নমুনা পাঠানোর নামে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার পোশাক রপ্তানি করা হয়েছে। কাস্টমসের ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’ সফটওয়্যারের ‘ত্রুটির’ সুযোগ নিয়ে এই অর্থ পাচার করা হয়েছে। এই ঘটনায় কোনো মুদ্রা দেশে ফেরত আসেনি। আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কাতার, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এই অর্থ পাচার হয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ২০২৩ সালে চারটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ১ হাজার ৭৮০টি চালানের মাধ্যমে রপ্তানির আড়ালে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা পাচার করেছে। এই ঘটনার অধিকতর তদন্তের জন্য কাস্টমস গোয়েন্দা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি যৌথ টিম গঠন করা হয়েছে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে গঠিত জাতীয় টাস্কফোর্সের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত দশম সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় কাস্টমসের ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’ সফটওয়্যারের ত্রুটি নিয়ে আলোচনা হয় এবং অর্থপাচার রোধে সফটওয়্যারটি নিয়মিত আপডেট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়াও চট্টগ্রাম বন্দরের এক্সিট গেটে আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আবু মোহাম্মদ আমিন উদ্দিনের সভাপতিত্বে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে ‘বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ বাংলাদেশে ফেরত আনার বিষয়ে গঠিত টাস্কফোর্স’-এর একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং টাস্কফোর্স সংক্রান্ত কমিটির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় ১৩টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর মধ্যে রপ্তানির আড়ালে চারটি প্রতিষ্ঠানের (সাবিহা সাকি ফ্যাশন, এশিয়া ট্রেডিং কর্পোরেশন, ইমু ট্রেডিং কর্পোরেশন ও ইলহাম কর্পোরেশন) ৪০০ কোটি টাকা পাচারের ঘটনায় কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং দুদকের যৌথ অনুসন্ধান অন্যতম।
শুল্ক গোয়েন্দার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রথমে সাবিহা সাকি ফ্যাশন নামের প্রতিষ্ঠানটির জালিয়াতি ধরা পড়ে। পরে আরও তিনটি প্রতিষ্ঠানের অর্থপাচারের তথ্য পাওয়া যায়। এই চারটি প্রতিষ্ঠানের কোনো এলসি ছিল না এবং তারা অন্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ইএক্সপি ব্যবহার করেছে।
তিনি আরও জানান, এই চারটি প্রতিষ্ঠান ১ হাজার ৭৮০টি চালানের মাধ্যমে ১৮ হাজার ২৬৫ টন পণ্য রপ্তানি করেছে বলে দেখিয়েছে, যার ঘোষিত মূল্য ৩৮২ কোটি টাকা (তিন কোটি ৭৮ লাখ ১৭ হাজার ১০ মার্কিন ডলার)। তবে ধারণা করা হচ্ছে, পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
তিনি বলেন, জালিয়াত চক্র রপ্তানি মূল্য দেশে না আনার জন্য পণ্যের মূল্য কম দেখানোর চেষ্টা করে। এক্ষেত্রেও বৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ফেরত আনার কোনো সুযোগ ছিল না এবং মানিলন্ডারিংয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সাবিহা সাকি ফ্যাশন ৮৬টি চালানের মাধ্যমে ৯৯৭ টন পণ্য রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে রয়েছে মেন্স ট্রাউজার, টি-শার্ট, বেবি সেট, ব্যাগ, পোলো শার্ট, জ্যাকেট, প্যান্ট ও হুডি। এর বিনিময় মূল্য ১৮ লাখ ৪৫ হাজার ৭২৭ মার্কিন ডলার বা ২১ কোটি টাকা। যদিও প্রতিষ্ঠানটির টি-শার্ট ও লেডিস ড্রেস রপ্তানির কথা ছিল, তবুও বেবি ড্রেস, জিন্স প্যান্ট, লেগিন্স, শার্ট ও শালসহ ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য রপ্তানির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই পণ্যগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব ও নাইজেরিয়ায় রপ্তানি করা হয়েছে।
এশিয়া ট্রেডিং কর্পোরেশন ১,৩৮২টি চালানের মাধ্যমে ১৪,০৮৫ টন টি-শার্ট, টপস ও লেডিস ড্রেস রপ্তানি করেছে, যার বিনিময় মূল্য ২ কোটি ৫৮ লাখ ২৬ হাজার ৮৬৬ মার্কিন ডলার বা ২৮২ কোটি টাকা। ইমু ট্রেডিং কর্পোরেশন ২৭৩টি চালানে ২,৫২৩ টন টি-শার্ট, ট্রাউজার ও টপস রপ্তানি করেছে, যার বিনিময় মূল্য ৬৫ লাখ ৪ হাজার ৯৩২ মার্কিন ডলার বা ৬২ কোটি টাকা। ইলহাম কর্পোরেশন ৩৯টি চালানে ৬৬০ টন টি-শার্ট, ট্যাংক টপ ও লেডিস ড্রেস রপ্তানি করেছে, যার বিনিময় মূল্য ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৮৫ মার্কিন ডলার বা ১৭ কোটি টাকা।
কাস্টমস ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে যে, চারটি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি বিলগুলোতে জাল এলসি এবং ইএক্সপি নম্বর ব্যবহার করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, রপ্তানিকারক একটি ব্যাংকের গ্রাহক হলেও অন্য ব্যাংকের এলসি ও ইএক্সপি ব্যবহার করেছে। আবার কখনও কখনও একই ব্যাংকের অন্য গ্রাহকের এলসি ও ইএক্সপি ব্যবহার করেছে।
এছাড়াও, রপ্তানি বিলের হার্ড কপি এবং কাস্টমস সার্ভারের তথ্যের মধ্যেও অনেক অমিল পাওয়া গেছে। যেমন, রপ্তানিকারকের নামের ভিন্নতা, লেনদেনের ধরণ, সিপিসি কোড এবং ইউনিটে গরমিল ইত্যাদি।
টাস্কফোর্সের সভায় কাস্টমসের গোয়েন্দা প্রতিনিধি জানান, ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’ সফটওয়্যারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ৪০০ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। সিআইডি প্রতিনিধিও সফটওয়্যারটির বিভিন্ন ত্রুটির কথা উল্লেখ করেন এবং জানান যে, এ বিষয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে এবং সিআইডি এনবিআরকে ত্রুটি সংশোধনের অনুরোধ জানিয়েছিল। তিনি সফটওয়্যারটি নিয়মিত পর্যালোচনা ও ত্রুটি দূরীকরণের ওপর জোর দেন।
এছাড়াও তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের ‘এক্সিট’ গেটে শুধুমাত্র বন্দরের নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করে বলেন, এখানে অন্যান্য আইন-প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি থাকলে অনিয়ম রোধ সম্ভব।
সভাপতি ‘অ্যাসাইকুডা’ সফটওয়্যার আপডেট ও চট্টগ্রাম বন্দরের ‘এক্সিট’ গেটে নজরদারি বাড়ানোর জন্য এনবিআর ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং চিঠির খসড়া প্রস্তুতের জন্য বিএফআইইউকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণের নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে সভায় দুদকের মহাপরিচালক ও উপপরিচালক চারটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং মামলা দায়ের করা হয়েছে কি না, তা জানতে চান। কাস্টমস গোয়েন্দা প্রতিনিধি জানান, কাস্টমস আইনে মামলা দায়ের করা হলেও মানিলন্ডারিং মামলা এখনো প্রক্রিয়াধীন। দুদক টিম মতামত দেয়, এ ধরনের মামলায় সাধারণত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়িত থাকেন, তাই যৌথ তদন্ত দল গঠন করা উচিত। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, একাধিক সংস্থার অপরাধ জড়িত থাকলে মানিলন্ডারিং মামলা দায়েরের আগে বিএফআইইউকে যৌথ অনুসন্ধান দল গঠন করতে হবে।
