
একুশে প্রতিবেদক : ইউনিয়ন ব্যাংক, একটি বেসরকারি ব্যাংক, এস আলম গ্রুপের ঋণের বিশাল পরিমাণ ও অনিয়মের কারণে বর্তমানে আর্থিক সংকটে পড়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে এসেছে, ব্যাংকটির মোট ঋণের ৬৫ শতাংশ, অর্থাৎ ১৮ হাজার কোটি টাকা একাই নিয়েছে এস আলম গ্রুপ। এই ঋণগুলো কাল্পনিক লেনদেনের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে, যার বিপরীতে কোনো জামানতও নেই।
ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা গেছে, ৪২ শতাংশ ঋণ ইতোমধ্যেই খেলাপি হয়ে পড়েছে, যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তারা জানিয়েছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ শতাংশের কম।
অনিয়মের কারণে আর্থিক বিপর্যয়ে পড়া এই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এক মাস আগে পুনর্গঠন করা হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ থেকে ব্যাংকটি মুক্ত করে। নতুন পর্ষদে পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এস আলম গ্রুপের প্রভাব এখনো কমেনি, ফলে পরিচালকেরা ব্যাংকের প্রকৃত চিত্র জানতে পারছেন না।
জানা গেছে, ব্যাংকটির স্বয়ংক্রিয় তথ্যভান্ডার থেকে এস আলমসহ কিছু প্রতিষ্ঠানের ঋণ ও লেনদেনের তথ্য সরিয়ে ফেলা হয়েছে, যা প্রকৃত তথ্য বের করা কঠিন করে তুলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শকরা যখন এস আলম গ্রুপের ঋণের তথ্য চাইছেন, তখন তারা ঠিকমতো তথ্য পাচ্ছেন না। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোকাম্মেল হক চৌধুরী, যিনি ২০২০ সাল থেকে ব্যাংকটির এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, এর পেছনে ভূমিকা রাখছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
মোকাম্মেল হক চৌধুরী এর আগে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। তাঁকে এস আলমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ইউনিয়ন ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংকটির মোট ঋণ ২৭ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে ১১ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা বা ৪২ শতাংশ ঋণ ইতোমধ্যেই খেলাপি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ২৬২ কোটি টাকা ক্ষতিজনক মানে রয়েছে, যা আদায় করা বেশ কঠিন। তবে ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য গোপন করেছে এবং মাত্র ৪ শতাংশ খেলাপি ঋণের কথা জানিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির মোট ঋণের ৬৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৮ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে, যা পর্যাপ্ত জামানতবিহীন ও কাল্পনিক লেনদেনের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, ব্যাংকটির পরিস্থিতি আগেই সবার জানা ছিল। পর্ষদ পরিবর্তন করলেই উন্নতি হবে এমনটা বলা যাবে না। ব্যাংকটি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রা আটকে দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তাঁদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যায় এবং বিচারের আওতায় আনা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালনায় থাকা অনিয়ম এবং এস আলম গ্রুপের সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে। যদিও নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়েছে, ব্যাংকটির প্রকৃত অবস্থার কোনো পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়।
নতুন পর্ষদ ব্যাংকটিকে পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা না পেলে ব্যাংকটি সচল রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান মু. ফরীদ উদ্দিন আহমদ।
ইউনিয়ন ব্যাংকের ঋণের বিশাল পরিমাণ এবং এস আলম গ্রুপের প্রভাবের কারণে ব্যাংকটি বর্তমানে তারল্য সংকটে রয়েছে। ব্যাংকের নতুন পর্ষদ বিষয়টি তদন্ত করছে, তবে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ না হলে আর্থিক সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
