
একুশে প্রতিবেদক : ভারত, পাকিস্তান ও চীনের তুলনায় বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বহুগুণ বেশি। প্রতিবেশী দেশগুলোতে সৌরবিদ্যুতের ট্যারিফ কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাংলাদেশে এখনো উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ক্রয়ে খরচ হচ্ছে ৯ থেকে ১০ সেন্ট, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ১০ থেকে ১৩ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে, ভারতের সাম্প্রতিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ট্যারিফ নির্ধারিত হয়েছে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় মাত্র ৩ সেন্ট, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩ টাকা ৫৮ পয়সার মতো।
জানা যায়, ভারতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে প্রাধান্য দিয়ে ২ হাজার মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য গত বছর মার্চে দরপত্র আহ্বান করে সোলার এনার্জি করপোরেশন অব ইন্ডিয়া (এসইসিআই)। ছয়টি কোম্পানি এই দরপত্রে বিজয়ী হয় এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ নির্ধারণ করা হয় মাত্র ৩ সেন্ট, যা ভারতীয় মুদ্রায় ২ রুপি ৬০ পয়সার সমান। ডলারের বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশী মুদ্রায় দাঁড়ায় ৩ টাকা ৫৮ পয়সা। এই কম ট্যারিফ দেশটির বিদ্যুৎ বাজারে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২৫ বছর মেয়াদি ‘বিল্ড-ওউন-অপারেট’ মডেলের ভিত্তিতে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে ক্রয়চুক্তি করা হয়।
ভারতের মতোই পাকিস্তানেও সৌরবিদ্যুতের ট্যারিফ কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরে সৌরবিদ্যুতের প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টার জন্য সর্বোচ্চ ৫ সেন্ট ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়, যা মূলত আমদানিনির্ভর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কমানোর উদ্দেশ্যে। পাকিস্তানে সম্প্রতি অনুমোদিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে সর্বনিম্ন ট্যারিফ ছিল ৩ সেন্টের কিছু বেশি, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩ টাকা ৮২ পয়সা।
বিশ্বে সৌরশক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে চীন। দেশটির ৬ লাখ ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে, যা বিশ্বে মোট সৌর সক্ষমতার ৪২ শতাংশ। চীন তার নিজস্ব প্রযুক্তি ও কাঁচামাল ব্যবহার করে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি স্টোরেজ উৎপাদনের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুতের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। বর্তমানে চীনে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ছে ৪ সেন্টের সামান্য বেশি, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৫ টাকা ৩৮ পয়সার মতো। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সূর্যের তাপের ব্যবহারিক ক্ষমতা বিবেচনায় চীন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর চেয়ে অনেক এগিয়ে।
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের দাম দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। প্রতি কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ক্রয়ে বাংলাদেশের খরচ গড়ে ৯ থেকে ১০ সেন্ট, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ১০ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে শুরু করে ১৩ টাকা পর্যন্ত। চলতি বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারিতে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নেত্রকোনার চল্লিশা ইউনিয়নে ৫০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এই প্রকল্পে ২০ বছরের মেয়াদে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের জন্য খরচ হবে ৯ সেন্ট বা ১০ টাকা ৭৫ পয়সা। একইভাবে খুলনা, মৌলভীবাজার ও রাজবাড়ীতে তিনটি নতুন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্যও ক্রয়চুক্তি অনুমোদন করা হয়েছে, যেখানে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা ৯২ পয়সা নির্ধারিত হয়েছে।
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের দাম কমিয়ে আনার জন্য সরকারি প্রণোদনা, প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি এবং সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, “নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ট্যারিফ কমিয়ে আনতে সরকার একটি খরচ বেঞ্চমার্ক তৈরি করতে পারে, যাতে আলোচনার মাধ্যমে ট্যারিফ কমানো সম্ভব হবে।” তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর জন্য জমি সংস্থানে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন, যা খরচ কমাতে সহায়তা করবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে জমির সংস্থান, সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আমদানিকৃত যন্ত্রাংশে শুল্ক ও করছাড় দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের (সিইআর) পরিচালক মো. শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, “সৌরবিদ্যুতে সঞ্চালন অবকাঠামো ও জমির সংস্থান সংকট থাকায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।”
বাংলাদেশ সরকার যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভূমি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যবস্থা নেয়, তবে সৌরবিদ্যুতের খরচ বর্তমানের চেয়ে অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
