চাহিদার চেয়ে ৩০% বেশি ডিম উৎপাদন, তবুও দাম কেন বেড়ে চলেছে?

ডিম egg
একুশে প্রতিবেদক : সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ডিমের উৎপাদন ২,৩৭৪ কোটি ৯৭ লাখ পিস, যেখানে চাহিদা মাত্র ১,৮০৯ কোটি ৬০ লাখ পিস। ফলে চাহিদার তুলনায় ৩০ শতাংশ উদ্বৃত্ত রয়েছে।

তবুও, ব্যবসায়ীরা উৎপাদন সংকট তুলে ধরে ডিমের দাম প্রতিদিনই বাড়িয়ে চলেছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে ডজনপ্রতি দাম বেড়েছে ২০-৩০ টাকা পর্যন্ত, বর্তমানে খোলাবাজারে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়।

প্রান্তিক খামারিরা অভিযোগ করছেন, দেশের পোলট্রি পণ্যের বাজারের সিংহভাগই বড় কয়েকটি কোম্পানির দখলে থাকায় তারা মূলত বাজারের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করছে। যদিও ডিমের দাম বেশি, খামারিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।

বিভিন্ন বাজারে গতকাল ফার্মের ডিমের হালি বিক্রি হয়েছিল ৫৮-৬০ টাকা করে, যেখানে সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ দাম ছিল ৪৮ টাকা। গত সপ্তাহেও ডিমের হালি ছিল ৫৫ টাকা।

বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি হলেও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে দাম বাড়ছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে পদক্ষেপ নেয়া গেলে দাম কমানো সম্ভব হতে পারে।

এছাড়াও, সবজি, মাছ ও মাংসের দাম বাড়ার প্রভাবও ডিমের উপর পড়েছে বলে মনে করছেন তারা। মৌসুমগত কারণে ডিমের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, এবং ছয়-সাতবার হাতবদল হওয়ার ফলে বাজার উত্তপ্ত হচ্ছে।

ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, “সরকার চুপ থাকায় ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফার লোভে বাজার অস্থির করছেন। নতুন সরকারের প্রথম দুই সপ্তাহে অবশ্য দাম বাড়েনি, কিন্তু পরবর্তীতে কোনো পদক্ষেপ না থাকায় দাম বাড়তে থাকে।”

ডিম উৎপাদন পর্যাপ্ত থাকলেও দামে সিন্ডিকেটের খেলা

দেশে বর্তমানে দৈনিক সাড়ে চার কোটি ডিমের চাহিদা থাকলেও ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, দৈনিক চার কোটি পিস উৎপাদন হচ্ছে। অথচ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডিমের চাহিদা ছিল ১,৮০৯ কোটি ৬০ লাখ পিস এবং উৎপাদন হয়েছে ২,৩৭৪ কোটি ৯৭ লাখ পিস, উদ্বৃত্ত ছিল ৫৬৫ কোটি ৩৭ লাখ পিস।

আগের অর্থবছরেও চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি ছিল, উদ্বৃত্ত ছিল ৫৩১ কোটি ১৫ লাখ পিস। ২০২১-২২ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরেও চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি ছিল।

প্রান্তিক খামারিরা বাজার সিন্ডিকেটের কারণে দাম বাড়ছে বলে বড় কয়েকটি গ্রুপকে দায়ী করছেন।

বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার বলেন, “দিনে চার কোটি ডিমের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন হয় সাড়ে চার কোটি পিস। বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলো সিন্ডিকেট করছে, যা মুরগির ফিড ও একদিনের মুরগির দাম নিয়ন্ত্রণ করছে।”

তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আমান উল্লাহ দাবি করছেন, “আমরা দিনে মাত্র ১৪-১৫ লাখ ডিম সরবরাহ করি, তাই দাম নিয়ন্ত্রণের কোনো সুযোগ নেই। আমরা মেসেজের মাধ্যমে দাম নির্ধারণ করি না। কেউ এমনটা করলে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারে।”

কাজী ফার্মস পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল হাসান বলেন, “এখন বৃষ্টির সময়, ডিমের চাহিদা বেশি। টানা বৃষ্টির কারণে অনেকেই ফার্ম থেকে ডিম সরবরাহ করতে পারেননি। আগামী মাসে শীতের সবজি এলে দাম কমে আসবে।”

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: বাজার মনিটরিং ও সমন্বয় প্রয়োজন

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বাপন দে জানান, “প্রতি পিস ডিমে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩-৪ টাকা বেশি নেয়া হচ্ছে। বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক না। ছয়-সাতবার ডিম হাতবদল হচ্ছে, ফলে উৎপাদনকারী কম লাভ পাচ্ছেন, কিন্তু ভোক্তা পর্যায়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে বাজার মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন।”

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মাসুদ করিম জানান, “চাহিদার তুলনায় উৎপাদনের কোনো ঘাটতি নেই। আমরা চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য নিয়ে দাম নির্ধারণ করেছি। তবে ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি।”

বাজার মনিটরিংয়ের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিশেষ যৌথ টিম গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।