ডলারের দাম কমছে না কেন? হুন্ডির মাধ্যমে আবারও বিদেশে পাচার!

ডলার
ঢাকা : সাধারণত বাজারে পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে দাম কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পেলেও দাম সেই অনুপাতে কমছে না। বর্তমানে প্রতি মাসে দুই বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে আসছে। অন্যদিকে, প্রত্যাশিত বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। অথচ এই খাতেই ডলারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এই অবস্থাতেও ডলারের দাম ১২০ টাকার নিচে নেমে আসছে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অতিরিক্ত ডলার হুন্ডির মাধ্যমে আবারও বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সরকার পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা যতটা সম্ভব ডলার সঙ্গে নিয়ে বর্ডার পার হয়ে অন্য দেশে চলে গেছেন, অনেকে যাওয়ার চেষ্টায় আছেন। আবার যাঁরা পালিয়ে বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন, তাঁরা হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে ডলার নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, আমাদের দেশে বর্তমানে প্রতি মাসে পণ্য আমদানি করতে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার খরচ হচ্ছে। অন্যদিকে, রপ্তানি থেকে আমরা মাসে ৩০০ কোটি ডলার আয় করছি। ফলে, আমাদের প্রতি মাসে ২০০ কোটি ডলারের ঘাটতি থাকে, যা মূলত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের মাধ্যমে পূরণ হয়। কিছু কিছু মাসে রেমিট্যান্স আয় ২৫০ কোটি ডলারেও পৌঁছায়।

এই অবস্থায়, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ডলারের দাম কেন ১২০ টাকার নিচে নেমে আসছে না? বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে ঋণপত্রের (এলসি) চাহিদা কমে গেছে। এছাড়াও, বিদেশ ভ্রমণ এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়া মানুষের সংখ্যাও কমেছে। আবার, আগামী জানুয়ারি মাসের আগে শিক্ষার্থীদের বিদেশে টিউশন ফি দেওয়ার চাপও তৈরি হবে না। এই পরিস্থিতিতে, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশে আসা ডলারের একটা অংশ অবৈধভাবে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশের সম্পদ রক্ষা করতে এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আওয়ামী লীগের অর্ধশত মন্ত্রী-এমপি বিপুল অর্থ-সম্পদ বিদেশে পাচার করেছেন। গত ১৫ বছরে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে যে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তাঁরা, এর বেশির ভাগই বিদেশে পাচার করেছেন। এই তথ্য বের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান, আমলে নেওয়া অভিযোগ এবং কমিশনের গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্যানুসারে, গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশ থেকে অন্তত ১৪ হাজার ৯২০ কোটি বা ১৪৯.২০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় পাচার করা টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলারে ১১৮ টাকা ধরে)। এ হিসাবে গড়ে প্রতিবছর পাচার হয়েছে অন্তত এক লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, টাকা পাচারের অন্যতম কারণ হলো রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে পাচার হওয়া সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এছাড়াও, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এই সমস্যার জন্য দায়ী। তিনি বিশ্বাস করেন যে, পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার এখনই উপযুক্ত সময়।

এদিকে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাজ্যে ৭২টি সম্পত্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব সম্পদের বেশির ভাগ তিনি গড়েছেন হুন্ডি পাচারের মাধ্যমে। বিষয়টি তদন্তের জন্য ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির (এনসিএ) কাছে চিঠি লিখেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি আফসানা বেগম। পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসের পপলার অ্যান্ড লাইম হাউস আসন থেকে নির্বাচিত আফসানা বেগম জানান, শুধু যুক্তরাজ্য নয়, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিভিন্ন দেশে যেমন—যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায়ও অনেক সম্পদ রয়েছে।

সম্প্রতি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ভারতের কলকাতার একটি পার্কে দেখা গেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশ বলছে, তিনি হয়তো অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গেছেন। তিনিও হুন্ডি পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ৬ আগস্ট ঝালকাঠি-২ আসনের সংসদ সদস্য আমির হোসেন আমুর ঝালকাঠির বাসভবন থেকে ডলার, ইউরোসহ প্রায় পাঁচ কোটি টাকা উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী ও পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, বিদেশে পালানোর জন্য তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাই টাকা ও ডলার নিয়ে বাসায় জড়ো করেছিলেন তিনি। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ঝালকাঠি শহরের রোনালসে রোডে আমির হোসেন আমুর বাসভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে। রাত সাড়ে ১২টার দিকে আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা লাগেজ ভর্তি এই টাকা দেখতে পান। পরে বিষয়টি সেনাবাহিনী ও পুলিশকে জানালে তারা এসে লাগেজ ভর্তি টাকা উদ্ধার করেন।

২৪ আগস্ট ভারত সীমান্ত থেকে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে তিনি সীমান্তে প্রতারিত হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। দালালরা মারধর করে তাঁর কাছে থাকা ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা নিয়ে গেছে বলেও জানান। তখনো তাঁর সঙ্গে ছিল বাংলাদেশি ও ব্রিটিশ পাসপোর্ট, ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ও কিছু টাকা। সূত্র বলছে, এই বয়সে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার ব্যাগ বহন করা সম্ভব নয়। এসব টাকা ছিল ডলার ফরম্যাটে।

মানি চেঞ্জার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এস এম জামান জানিয়েছেন, বর্তমানে খোলাবাজারে ডলারের দাম স্থিতিশীল। রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো থাকায় লেনদেনও স্বাভাবিক গতিতে চলছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, আগের তুলনায় খোলাবাজারে ডলার এনডোর্সমেন্ট কিছুটা কমেছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, বর্তমানে বিদেশ ভ্রমণ এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া মানুষের সংখ্যা কমেছে।

এস এম জামান আশা প্রকাশ করেছেন যে, দেশের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে খোলাবাজারে ডলার লেনদেন আরও বেশি বেড়ে যাবে।

এছাড়াও তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, হুন্ডির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধানের মতে, বর্তমানে ডলারের বাজার স্থিতিশীল। এর কারণ হিসেবে তিনি ডলারের চাহিদা হ্রাস পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। কিছুদিন আগেও ব্যবসায়ীরা ডলারের জন্য হন্যে হয়ে ছুটে বেড়াতেন। কিন্তু এখন তারা আর এলসি খুলতে আগ্রহী নন। ফলে কমার্শিয়াল হুন্ডির প্রভাব কমেছে।

যদিও সাইফুজ্জামানের মতো বড় আকারের হুন্ডি পাচার বন্ধ হয়েছে, তবুও খুচরা হুন্ডি এখনও চলছে। এর মাধ্যমে অবৈধভাবে ডলার বিদেশে পাচার হচ্ছে।

বর্তমানে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রতি ডলারের বিপরীতে ১২১ টাকা পাওয়া যাচ্ছে। খোলাবাজারে এই রেট সর্বোচ্চ ১২২ টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর পদক্ষেপের কারণে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা আর লাভবান হতে পারছে না। অফিশিয়াল রেট এবং হুন্ডির রেট প্রায় সমান হয়ে যাওয়ায় প্রবাসীরা ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে আরও বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। এই অবস্থায় হুন্ডি কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হলে বর্তমানে বছরে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের পরিমাণ দ্বিগুণ অর্থাৎ ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে।

বিগত সরকারের আমলে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে সচেতনতা বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছিল প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। বিদেশ থেকে দেশে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে হুন্ডি কারবারিদের দৌরাত্ম্য প্রতিরোধে ১০টি প্রতিবন্ধকতার কথাও বলা হয়েছিল।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন হুন্ডির বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, অবৈধ হুন্ডি কার্যক্রম বন্ধ করতে পারলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। তবে এর জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য।

ড. হোসেন আরও উল্লেখ করেন যে, আন্ডার-ইনভয়েসিং এবং ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে মুদ্রা পাচার করা হয়। এই ধরনের অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তি এবং তাদের সহযোগীদের চিহ্নিত করা জরুরি। তিনি বিশ্বাস করেন যে, এসব তথ্য উন্মোচন করা খুব কঠিন কোন কাজ নয়।