অভ্যন্তরীণ কারণেই মূল্যস্ফীতি জেঁকে বসেছে


ঢাকা : দেশে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে নিত্যপণ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে এমন মাত্রার মূল্যস্ফীতি এর আগে দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও প্রকৃত আয় ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এ পরিস্থিতির জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বহিঃস্থ উপাদানগুলোকে দায়ী করেছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ কারণই মূলত এ মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ী।

সোমবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন ‘ইনফ্লেশন ডায়নামিকস ইন বাংলাদেশ’-এ জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের মূল্যস্ফীতির বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ প্রান্তিকে হেডলাইন মূল্যস্ফীতির অর্ধেকের বেশি, অর্থাৎ ৫১ শতাংশ, এসেছে খাদ্যপণ্য থেকে।

এর মধ্যে খাদ্যশস্য ও সবজির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল। এর আগে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আমিষ পণ্য, মসলা ও রান্নায় ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মূল ভূমিকা রেখেছিল।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তারা বলছেন, বিগত সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি, আর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার মূলত বাজারে অভিযানের ওপর নির্ভর করছে, যা যথেষ্ট নয়।

জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৯.১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি প্রধান কারণ হলেও, সর্বশেষ প্রান্তিকে এর প্রভাব কিছুটা কমেছে। তবে বাড়িভাড়া, স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত সেবা খাতে ব্যয় বাড়ার কারণে হেডলাইন মূল্যস্ফীতিতে এসব খাতের অবদান বেড়েছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নকে মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ী করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে আমদানিনির্ভর পণ্যের অবদান মূল্যস্ফীতিতে কমে ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যেখানে জুনে এ অবদান ছিল ৩৯ শতাংশ। একই সময়ে স্থানীয় পণ্যের অবদান ৬১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় আমদানি পণ্যের মূল্যস্ফীতির প্রভাব কমেছে। তবে অভ্যন্তরীণ পণ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে সাম্প্রতিক বন্যা, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে পার্থক্যসহ নানা কারণ রয়েছে। সরকারের মজুদ দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা কম। টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পুরোপুরি পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এ সময়ে কাঁচামরিচের দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল, চাল ও পেঁয়াজের দাম প্রথমে বেড়ে পরে কমেছে। ডিমের দামের মার্জিন স্থিতিশীল হওয়ার আগে কিছুটা কমেছে, সোনালি মুরগির দাম স্থিতিশীল হওয়ার আগে ক্রমাগত বেড়েছে। এছাড়া সয়াবিন তেল, আলু ও মসুর ডালে ক্রয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে স্থিতিশীল পার্থক্য দেখা গেছে।

২০২২ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশে মজুরি প্রবৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেশি বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়েছে এবং প্রকৃত আয় হ্রাস করেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ঢাকা ও রংপুর অঞ্চলে আয় কিছুটা বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “২০২১-২২ সালে জ্বালানি তেলের দাম ও ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে নীতিগত ভুলের কারণেই আমরা মূল্যস্ফীতি কমাতে পারিনি। অন্যান্য দেশ তা কমাতে সক্ষম হলেও আমরা পারিনি কেন? বাংলাদেশ ব্যাংক এখন যে স্বীকার করেছে অভ্যন্তরীণ কারণেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, তা শুভ লক্ষণ। অতীতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি; বরং সরকার উল্টো পথে হেঁটেছে। সে সময়ে টাকা ছাপিয়ে সরকার ও কিছু ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে সরকার বাজেটের আকার কমানো ও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের পথে হাঁটলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় আগের কৌশলই প্রয়োগ করছে। বাজারে যে অব্যবস্থাপনা চলছে, তা দূর করতে কার্যকর ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। বাজারে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিশ্বে কোথাও মার্কেট পুলিশিং দিয়ে বাজার স্থিতিশীল করা যায় না; বরং এতে অস্থিরতা বাড়ে। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে সিন্ডিকেটের প্রভাব খর্ব করতে হবে।”

২০২২-২৩ অর্থবছরের পুরো সময়ে বাংলাদেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯.৭৩ শতাংশে দাঁড়ায়। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেও এ ঊর্ধ্বমুখিতা অব্যাহত রয়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯.৯২ শতাংশে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০.৪০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৫০ শতাংশ। পরিসংখ্যানগতভাবে সেপ্টেম্বর মাসে আগস্টের তুলনায় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কম দেখালেও নিত্যপণ্যের দামে এর তেমন প্রভাব নেই। বরং চলতি মাসে ডিম, মুরগি ও সবজির দামে আরও এক দফা ঊর্ধ্বমুখিতা দেখা যাচ্ছে।