ক্ষুদ্র শিল্পের সংকট: অর্থনীতি ঝুঁকিতে, কর্মসংস্থান হুমকির মুখে


ঢাকা : ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোগ (এসএমই) খাতে বিনিয়োগের অভাবে ধুঁকছে দেশের অর্থনীতি। ব্যাংকগুলো বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দিতে আগ্রহী হলেও এসএমই খাতে ঋণ প্রবাহ কমছে। এর ফলে বেকারত্বের হার বেড়ে আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

অথচ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। স্যামসাং, এলজি ও হুন্দাইয়ের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড থাকা সত্ত্বেও দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬০ শতাংশ আসে এসএমই খাত থেকে। এ খাতই বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে কাজ করে।

অপরদিকে, বাংলাদেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান মাত্র ২০ শতাংশ। ব্যাংক খাতের ৫২ শতাংশ আর্থিক কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ থাকার পরও দেশের এসএমই খাত বিনিয়োগের অভাবে ধুঁকছে। বড়দের জন্য সরকারি উদ্যোগ, ব্যাংকঋণ, অবাধ বাজার ব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেট সবই উন্মুক্ত। কিন্তু ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত সুবিধা।

কিষাণঘর অ্যাগ্রো ২০১৯ সালে কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেটজাতকরণ কারখানা চালু করে। শুরুতে দুই-চারজন শ্রমিক নিয়ে কাজ শুরু করলেও এখন শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৬০ জনে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা বাড়াতে তারা ব্যাংকের কাছে এসএমই ঋণের আবেদন করে। ব্যাংক তাদের কয়েক বছর ঘুরিয়ে মাত্র ২০ লাখ টাকা ঋণ দেয়। একই সময়ে বড় একটি শিল্প গ্রুপ একই ব্যবসায় নেমে ৬০ কোটিরও বেশি ঋণ পায়।

কিষাণঘর অ্যাগ্রোর উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেকুল ইসলাম বলেন, আমাদের ব্যাংকঋণের অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ। দুই কোটি টাকার সম্পদ দেখিয়েও আমরা এসএমই বা কৃষি ঋণ পাইনি। আমাদের বলা হয়েছে সিলিং নেই, অন্য প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ফেলেছি, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে গেছে ইত্যাদি।

তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কাছে দেড় কোটি টাকা ঋণ চেয়েছি। তারা আমাদের দেড় বছর ঘুরিয়ে ২০ লাখ টাকা টার্ম লোন ও ৩০ লাখ টাকা ক্যাশ ক্রেডিট লোন অনুমোদন করেছে। ইতিমধ্যে ঋণের ৫০ শতাংশ আমরা পরিশোধ করেছি। আমাদের পুরো ঋণই উচ্চ সুদে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদনের অধিকাংশ সূচকই নিম্নমুখী বা ঋণাত্মক ধারায় রয়েছে। অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) উদ্যোক্তাদের উৎপাদন সূচক ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ছিল ১৯৮.৯৪, যা চলতি বছরের জুনে কিছুটা বেড়ে ২১৮.৯৬ পয়েন্টে উঠলেও জুলাইয়ে আবার নেমে ১৯৮.২৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছর আগের অবস্থানের চেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে এমএসএমই উৎপাদন।

বিবিএসের ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে দেখা যায়, জুন শেষে দেশের মোট কর্মসংস্থান কমেছে ১০ লাখ ৭০ হাজার। সবচেয়ে বেশি কমেছে সেবা খাতে, ১০ লাখ ৪০ হাজার। কৃষি খাতে কর্মে নিয়োজিত শ্রমশক্তি কমেছে ২ লাখ ৩০ হাজার। তবে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ২ লাখ।

একই সময়ে দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৬৫ শতাংশ, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, দেশের ৯০ ভাগ প্রতিষ্ঠানই কুটির শিল্প। ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ না দিয়ে বড়দের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি উৎসাহী। ছোটরা না বাঁচলে দেশের অর্থনীতিও বাঁচবে না। তাদের ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে নতুন নতুন পদ্ধতি হাতে নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র এ প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখলেও ব্যাংকগুলো সাধারণত ওপরের দিকে থাকে, নিচের দিকে আসতে চায় না। কারণ এসব ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান অপ্রাতিষ্ঠানিক। অর্থাৎ এদের রেজিস্ট্রেশন নেই, ট্যাক্স দেয় না, তাদের কোনো ট্রেড লাইসেন্স নেই। কেউ যদি একবার ট্যাক্স দেয়, সংস্থাগুলো তাদের পেছনে লেগে থাকে। তাই কেউ ঝামেলায় পড়তে চায় না।

হস্ত ও কারুশিল্প প্রতিষ্ঠান বিনাস ক্র্যাফটস অ্যান্ড ডিজাইনসের স্বত্বাধিকারী সাফিনা আক্তার ব্যবসা বাড়াতে ব্যাংকের কাছে ঋণ চেয়েছিলেন। ব্যাংক তার কাছ থেকে নানা কাগজপত্র চাওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের জামানতও চেয়েছিল। ব্যর্থ হয়ে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

সাফিনা আক্তার বলেন, ছোটদের ব্যবসা করতে গেলে অনেক ধরনের বাধা পেতে হয়। বড়দের সঙ্গে ব্যবসায় টিকতে গেলে অনেক জনবলের প্রয়োজন হয়, সেটিও আমাদের নেই। ব্যাংকের কাছে ঋণ চাইতে গেলে নানান কাগজপত্র চায়, জামানতও চায়। আমাদের মতো ছোট প্রতিষ্ঠানের হাতে তা নেই।

বাংলাদেশে অর্থনীতির ৫২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে ব্যাংক খাত। গত কয়েক বছর ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট প্রকট হয়েছে। ব্যাংকের মোট ঋণের অন্তত ২৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা পূরণ হচ্ছে না।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলেও বিনিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বাধার মুখে পড়তে হয় তাদের। বাংলাদেশে ৬০ লাখের বেশি ব্যক্তিগত উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর বাইরে ৮০ হাজারেরও বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রায় অর্ধেক এমএসএমই বিশ্বব্যাংককে জানিয়েছে, তাদের বিকাশ এবং বৃদ্ধি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ও কর্মসংস্থানের জন্য সিএমএসএমইতে ঋণ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছেন। মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়ায় এসএমই খাত অনেক বড়। তারা চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করে। কাজেই আমাদের মতো দেশগুলোতে আমরা যদি এ খাতকে গতিশীল না করতে পারি, তাহলে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নও হবে না, কর্মসংস্থানও হবে না।

তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র এ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ব্যাংকগুলোকে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাংকগুলো এদের বিভিন্ন কারণে ঋণ দিতে চায় না, অনেক কাগজপত্র চায়। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যারা থাকে, তাদের তো এসব কাগজপত্র থাকে না। ব্যাংকগুলো মাইক্রোফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশনগুলোর মাধ্যমে দিতে পারে বা তারা নিজেরাও দিতে পারে। ঋণ ব্যবস্থাকে তারা আরও সহজ করতে পারে। ব্যাংকগুলোকে এদের কাছে যেতে হবে।

মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রতি ব্যাংক ও সরকারের নজর দেওয়া জরুরি। অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত এ খাতকে অবহেলা করা হলে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উদাহরণ সামনে রেখে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।