
ঢাকা : রমজান মাসের আর কিছুদিন বাকি থাকতেই ভোজ্যতেলের বাজারে অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ভোজ্যতেলের সিন্ডিকেট গতানুগতিক কারসাজির পন্থা অনুসরণ করে রোজার আগে তেলের দাম বাড়ানোর জন্য কোমর বেঁধে সক্রিয় হয়েছে। ফলে রোজা শুরুর মাস কয়েক আগেই মিল পর্যায় থেকে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে বাজারে দাম বৃদ্ধি করা যায়।
রাজধানীর নয়াবাজার, কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে গিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুচরা পর্যায়ে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা বেশি দামে তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। তেলের সংকট এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছে যে, অনেক স্থানে খোলাবাজারেও তেলের জন্য ভিড় বাড়ছে। তবে তেলের দাম এতটাই বেড়েছে যে নিম্নবিত্ত ও সাধারণ ভোক্তাদের জন্য তা কিনে খাওয়া একপ্রকার বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে।
কৃত্রিম সংকটের শিকার ক্রেতারা
সরকার থেকে তেলের দাম সহনীয় রাখতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর পাম ও সয়াবিন তেলের মূল্য সংযোজন কর ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে আনা হয়, যা ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তবুও বাজারে তেলের দাম কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েক সপ্তাহ আগে পর্যন্ত ১৫৭-১৫৮ টাকায় পাওয়া যেত। বোতলজাত তেলের দামও প্রায় একইভাবে বেড়েছে, যা এখন লিটারে ১৬৭-১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নয়াবাজারের মুদি বিক্রেতা মো. তুহিন বলেন, “১৫ দিন আগেও পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল ৭৯০-৮০০ টাকায় কিনতাম এবং খুচরা পর্যায়ে ৮১৮ টাকায় বিক্রি করতাম। এখন ডিলাররা সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে এবং সংকটের অজুহাতে প্রতিবার দাম বাড়াচ্ছে। সরকার থেকে নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে বলা হলেও আমাদের বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে।” একই অবস্থা জানালেন জিনজিরা কাঁচাবাজারের বিক্রেতা সোহেল। তিনি বলেন, “১৫ দিন আগেও খোলা সয়াবিন তেল লিটারে ১৫৭-১৫৮ টাকায় কিনতাম, এখন তা বেড়ে ১৮২ টাকায় দাঁড়িয়েছে।”
সিন্ডিকেটের কারসাজি নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে আমদানি করা ভোগ্যপণ্যের দাম কমলেও ভোজ্যতেলের বাজারে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১ হাজার ১০৫ ডলার, যা আগস্টে কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১ ডলারে। তবুও দেশে তেলের দাম বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, “রোজা ঘিরে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তেলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করে রেখেছে। রোজায় ক্রেতারা বাধ্য হয়ে বেশি দামেই পণ্য কিনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।”
ব্যবসায়ী মহলের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে পাম তেলের দাম বৃদ্ধি এবং রপ্তানিকারক দেশগুলোতে পাম তেলের বায়োডিজেল উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে দেশে পাম তেলের দামও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে পাম ও সয়াবিন তেল আমদানির ওপর ভ্যাট কমানো প্রয়োজন।
তবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা জানান, “আমাদের তদারকি অব্যাহত আছে এবং ভোজ্যতেলের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনিয়ম পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রয়োজন কর্তৃপক্ষের নজরদারি
ভোক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, তেলের দাম বৃদ্ধির এই ধারা রমজান মাসে আরও বেড়ে যেতে পারে। রোজায় সাধারণ মানুষের ভোগ্যতেলের ওপর নির্ভরতা বাড়ে, এবং এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধি করে মুনাফা লুফে নেওয়ার চেষ্টা করবে। তাই এখনই প্রয়োজন কঠোর নজরদারি।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, সরকারিভাবে তদারকি এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হলে, রমজানে ভোজ্যতেলের বাজার আরও অস্থির হতে পারে। ভোক্তারা তাই অনুরোধ জানাচ্ছেন, রমজানের আগে থেকেই যেন বাজারের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অন্যথায়, সাধারণ ক্রেতারা রোজার মাসে বর্ধিত মূল্যে তেল কিনতে বাধ্য হবেন, যা তাদের জন্য আরেকটি সংকটের কারণ হবে।
