
ঢাকা : দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক অশান্ত সময় পার করছে, যার অন্যতম প্রধান কারণ ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের ভয়াবহ বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকায়। জুন থেকে সেপ্টেম্বর, এই তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হওয়ায়, অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংখ্যা প্রকৃত চিত্রের তুলনায় অনেক কম। কারণ, এই হিসাবে অবলোপন করা ঋণ, আদালতের আদেশে স্থগিত থাকা ঋণ এবং পুনঃতফশিল করা ঋণ অন্তর্ভুক্ত নয়। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম মনে করেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৭ লাখ কোটি টাকার কম হবে না। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর নিজেও বলেছেন যে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা। গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, এটি ৭ লাখ কোটি টাকা হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে না।”
গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়, বিশেষ করে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে, ব্যাংক থেকে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের নামে-বেনামে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার অভিযোগ ছিল। ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের অঙ্ক ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই অঙ্ক বেড়েছে। সাবেক সরকারের ছত্রছায়ায় লুটপাট ও অনিয়মের মাধ্যমে এই ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল।
সাবেক সরকারের ক্ষমতা হারানোর পর বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ করতে শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণের অঙ্ক ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে এই সংখ্যা প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যায়।
সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বাড়াতে বেসরকারি ব্যাংকগুলো বড় ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৩ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। আর বেসরকারি ব্যাংকে এই বৃদ্ধি ছিল ৪৯ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলোর ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাওয়ায় এই অঙ্ক বেড়েছে। ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
এদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ এবং থার্মেক্সসহ আরও কিছু বড় ও মাঝারি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় এই অঙ্ক আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সূত্র জানায়, এস আলম গ্রুপ ও তার সহযোগীরা ছয়টি ব্যাংক থেকে ৯৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে, যা এখন খেলাপিতে পরিণত হওয়ার পথে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ১১১ কোটি টাকায়। যা তাদের বিতরণ করা ঋণের ৪০.৩৫ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ১১.৮৮ শতাংশ।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ তুলনামূলক কম। এই ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণ করা ঋণের মাত্র ৪.৯৯ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক কর্মকর্তারা মনে করছেন, আগামী দিনে খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিতরণ করা অনিয়মিত ঋণ ধীরে ধীরে খেলাপিতে পরিণত হবে।
এ প্রসঙ্গে এনসিসি ও মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, “যতই তথ্য গোপন করার চেষ্টা করা হোক, ধীরে ধীরে প্রকৃত চিত্র বের হয়ে আসছে। এটা ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনি সংকেত।”
তিনি আরও যোগ করেন, “যেসব ব্যাংকে লুটপাট হয়েছে এবং যেসব প্রভাবশালী ঋণ নিয়েছে তারা এখন পলাতক। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।”
সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে নীতি সংস্কারে মনোযোগ দিয়েছে। কিন্তু এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ঋণ পুনঃতফশিল এবং অবলোপন করা ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে এলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে।
খেলাপি ঋণের ক্রমাগত বৃদ্ধি শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও একটি অশুভ সংকেত। এটি বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস করছে এবং দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তাহলে দেশের অর্থনীতির ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে বাধ্য।
