৩৩ হাজার এতিম রোহিঙ্গা শিশু, অনেকেই হারিয়েছে মানসিক ভারসাম্য

কক্সবাজার: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর নিধনযজ্ঞ চালাতে শুরু করলে প্রাণে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয় সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা। দীর্ঘপথ পায়ে হেটে আসা এসব রোহিঙ্গা শিশুরা দুর্বল হয়ে পড়েছে শারীরিকভাবে। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি রাখাইনের ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি দেখে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে অনেকে। এ পর্যন্ত সরকারিভাবে ৩৩ হাজার ৩৬০ জন রোহিঙ্গা এতিম শিশুকে শনাক্ত করা হয়েছে।

এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া অনাথ শিশুর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে বাবা মা হারিয়ে অনাথ শিশুদের আশ্রয় হয়েছে ১২টি ক্যাম্পে। এসব অনাথ শিশুদের তালিকা তৈরির কাজ করছে সমাজসেবা অধিদফতর।

সমাজসেবা অধিদফতরের কর্মীরা ক্যাম্পগুলোতে গিয়ে খুঁজে খুঁজে অনাথ শিশু শনাক্তকরণের কাজ করছেন। যারা বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছে, যারা শুধু বাবা হারিয়েছে, যারা প্রতিবন্ধী, আর যারা মা-বাবার খোঁজ পাচ্ছে না- এমন চারটি শ্রেণিতে এদের ভাগ করা হচ্ছে। শিশু আইন অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী পর্যন্ত শিশুদের হিসেবে গণনা করে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে।

সমাজসেবা অধিদফতর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক প্রীতম কুমার চৌধুরী বলেন, শনাক্ত হওয়া এতিম শিশুদের সমাজকল্যাণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে।

তিনি জানান, এতিম রোহিঙ্গা শিশুদের সংখ্যা ৪০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। আরো ৩ থেকে ৪দিন এতিম শিশু শনাক্তকরণের কাজ চলবে বলেও তিনি জানান।

আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার শিশু মানবেতর পরিস্থিতিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটি জানায়, শিশুরা পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সেবার সংকটে রয়েছে। সেখানে ডায়রিয়া, কলেরাসহ অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি খুবই বেশি। তাছাড়া শিশুরা পাচারকারীদের খপ্পরে পড়লে তাদের আরো বড় বিপদ হতে পারে।

ক্ষুধা ও সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা বেশিরভাগ শিশুই এখনও মানসিকভাবে বিভীষিকা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তাদের একজন ইয়াছির আরফাত (৯)। ঠিকভাবে কথা বলছে না মানসিক বিপর্যন্ত ইয়াছির। নিজের গ্রামের নামটাও ঠিকমতো বলছে পারছেনা সে। রাখাইনের ওয়াবেক এলাকার ছৈয়দ উল্লাহ ছেলে ইয়াছির। চোখের সামনে বাবা-মাকে কেটে ফেলেছে। তাদের হুজুরকেও কেটে ফেলেছে বলে জানায় সে। ছোট এক বোনকে নিয়ে বর্তমানে থাকে দাদা-দাদির সাথে।

আয়াত উল্লাহ (৬) মিয়ানমারের বলিবাজার ধুমবাই এলাকা থেকে বাবা শামসুল আলমের হাত ধরে পালিয়ে এসেছে। চোখের সামনে মা দিলবাহারকে বার্মিজ সেনারা পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন করে মেরে ফেলতে দেখেছে সে। এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি সে। প্রায়ই কান্নাকাটি করে। তার মতো অনেক শিশুর একই অবস্থা।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন আবদুস ছালাম বলেন, ‘‘শিশুরা নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের অধিকাংশ চর্মরোগেও আক্রান্ত এবং দীর্ঘ পথ হেটে আসায় শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ক্যাম্প গুলোতে আলাদাভাবে শিশুদেরকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে সাধ্যমত।’

কোডেকের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর মো: নাসির উদ্দিন বলেন, উখিয়া-টেকনাফে ১৬টি শিশু বান্ধব কেন্দ্র করে এতিম এবং সাধারণ শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। ইউনিসেফ এর অর্থায়নে কোডেক তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে।

সরেজমিন কুতুপালং ক্যাম্প-১ শিশু বান্ধব কেন্দ্রে শিশুদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। শিশুদের আনন্দে কোলাহল। একেক জন এক এক ধরণের খেলাধুলার সরঞ্জাম নিয়ে ব্যস্ত। অনেককে ছবি আকঁছে।

সেন্টার ম্যানেজার ছদরুল আলম বলেন, প্রতিদিন নতুন নতুন শিশুরা আসছে। এর মধ্যে এতিম শিশুও আছে। এই সেন্টারে এ পর্যন্ত ২০জন এতিম শিশু পাওয়া গেছে। তাদের আলাদাভাবে যতœ নেয়া হচ্ছে ।

কোডেকের স্থায়ী শিশু বান্ধব কেন্দ্র ছাড়াও বিভিন্ন খেলাধুলার সরঞ্জাম নিয়ে ক্যাম্পের বিভিন্ন গলিতে গলিতে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ টীমের মাধ্যমে আশ্রিত শিশুদের মানসিক বিকাশে কাজ করছে বলে জানিয়েছে স্যোসাল ওয়ার্কার সোহেল আরমান।

সমাজসেবা অধিদফতর সুত্রে জানা যায়, এতিম রোহিঙ্গা শিশুদের সুরক্ষার জন্য ‘শিশুপল্লী’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে উখিয়ার নিবন্ধিত কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধুছড়া এলাকায় ২০০ একর জমিও নির্ধারণ করা হয়েছে।