ভোজ্যতেলের ঘাটতি পূরণে আশার আলো: সরিষা উৎপাদনে বিস্ময়কর অগ্রগতি


এসএম রহমান, দক্ষিণ চট্টগ্রাম : দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। কিন্তু তেলজাতীয় ফসলের অপর্যাপ্ত উৎপাদনের কারণে প্রতিবছর বিদেশ থেকে লাখ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেল আমদানি করতে হচ্ছে। এই আমদানিতে সরকারকে প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।

এই বিপুল ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে সরকার তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর ফলে বিগত কয়েক বছরে তেলজাতীয় দানাদার ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত তিন বছরে সরিষার উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। চলতি মৌসুমে (২০২৪-২০২৫) ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ হেক্টর জমিতে সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন।

উল্লেখ্য, গত মৌসুমে (২০২৩-২০২৪) ১০ লাখ ৯৬ হাজার ৬৩৬ হেক্টর জমিতে ১৬ লাখ ৭ হাজার ৩৬ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদিত হয়েছিল। এর আগের বছর (২০২২-২০২৩) ৮ লাখ ১২ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে ১১ লাখ ৬১ হাজার ১০০ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদিত হয়েছিল। ২০২১-২০২২ মৌসুমে সরিষা উৎপাদিত হয়েছিল ৬ লাখ ১০ হাজার ৫৫৯ হেক্টর জমিতে ৮ লাখ ২১ হাজার ৫১ মেট্রিক টন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে দেশে উৎপাদিত ভোজ্যতেলের পরিমাণ মাত্র ৬ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সরিষা থেকে উৎপাদিত হচ্ছে সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিক টন এবং তিল ও সূর্যমুখী থেকে উৎপাদিত হচ্ছে মাত্র ৫০ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ, মোট চাহিদার মাত্র ৩০ ভাগ দেশীয় উৎপাদন থেকে আসছে।

চাহিদার প্রায় ৭০ ভাগ ভোজ্যতেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। এতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

দেশে ভোজ্যতেলের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে এই ঘাটতি পূরণ সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। রবি মৌসুমে সব ধরণের ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। শুধুমাত্র এই রবি মৌসুমেই সরিষাসহ তেলজাতীয় দানাদার ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

দেশে প্রতি মৌসুমে হাওরাঞ্চল, পাহাড়ি, উপকূলীয়, চরাঞ্চল, বোরো ও রোপা আমন ধানের পতিত প্রায় ৮০ লাখ হেক্টরেরও বেশি জমি পতিত থাকে। এই পতিত জমিগুলোকে পরিকল্পিতভাবে তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনের আওতায় আনা হলে ভোজ্যতেলের ঘাটতি মেটানো সম্ভব। আমন ও বোরো ধান চাষের মধ্যে অন্তত ৯০ দিন এই জমিগুলো পতিত থাকে। অন্যদিকে সরিষা আবাদে সময় লাগে সর্বোচ্চ ৮৫ দিন।

যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ পতিত জমি তেলজাতীয় দানাদার ফসল চাষের আওতায় আনা সম্ভব। এতে প্রতিবছর ভোজ্যতেল আমদানি খাতে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে এবং দেশ ভোজ্যতেলে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।

এজন্য কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ রবি মৌসুমে সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, উন্নত মানের তেল বীজ সরবরাহ এবং চাষিদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

ইতোমধ্যে সরকারের নির্দেশনায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২২২ কোটি ১৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামসহ ৬৪টি জেলার ২৫০টি উপজেলায় তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি কার্যক্রম চলছে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২০২২-২০২৩ মৌসুমে ১০ হাজার ৬০৮ হেক্টর জমিতে সরিষার বাম্পার ফলন হয়েছে। গত মৌসুমে (২০২৩-২০২৪) এই অঞ্চলে ১৭ হাজার ৮৮১ হেক্টর জমিতে ২২ হাজার ৫৩৯ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদিত হয়। চলতি মৌসুমে (২০২৪-২০২৫) উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ হাজার ৯১ হেক্টর জমিতে ২৭ হাজার ১৯৪ মেট্রিক টন।

এছাড়াও, চলতি মৌসুমে কুমিল্লা, সিলেট, রাঙ্গামাটি, রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা, যশোর, বৃহত্তর ঢাকা এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলেও সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিনার উদ্ভাবিত জাতের মধ্যে বিনা সরিষা-৪, ৯, ১১ এবং সম্প্রতি উদ্ভাবিত বিনা সরিষা-১২ জাতগুলো উল্লেখযোগ্য। এসব জাতের গড় ফলন হবে ১.৬ মেট্রিক টনেরও বেশি। এ ছাড়া বারি সরিষা ১৪, ১৭, ১৫ ও ১৮ জাতগুলোও চাষ করা হচ্ছে।

দেশে পতিত বোরো ও রোপা আউসের জমি, চরাঞ্চলের জমি, হাওর অঞ্চলের জমি, উপকূলীয় জমি এবং পাহাড়ি অঞ্চলের সরিষা আবাদ উপযোগী জমিসহ প্রায় ৮০ লাখ হেক্টর জমি তৈলজাতীয় দানাদার ফসল চাষ উপযোগী রয়েছে। এসব পতিত জমির অর্ধেকও যদি তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনের আওতায় আনা যায়, তাহলে ভোজ্যতেলের ঘাটতি মোকাবেলা করে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।

তেলবীজ গবেষণা কেন্দ্র গাজিপুরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে জানান, দেশে বর্তমানে ২০ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি ভোজ্যতেলের প্রয়োজন। এর মধ্যে ৬ লাখ মেট্রিক টন দেশে উৎপাদিত হয়। অবশিষ্ট তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বোরো ও আমন ধান উৎপাদনের মধ্যবর্তী ৯০ দিন দেশের অন্তত ২০ লাখ হেক্টর জমি পতিত থাকে। এই জমিগুলো দানাদার ফসলের আওতায় আনা গেলে তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং ভোজ্যতেলের ঘাটতির সিংহভাগ মিটবে।