চট্টগ্রামের ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ সারোয়ার দেশ ছেড়েছে!

চট্টগ্রাম : গোপনে দেশ ছেড়েছেন চট্টগ্রামের আলোচিত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ সারোয়ার হোসেন, ছয় বছরেরও বেশী সময় কারাগারে বন্দি থাকার পর গত ৩১ আগস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।

জামিনে মুক্তির পর পুলিশের অব্যাহত অভিযানের মুখে পালিয়ে ‘দুবাই’ অবস্থান করার তথ্য রোববার দিবাগত রাতে একুশে পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছেন এক সময়ের আলোচিত এই ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’।

সারোয়ার হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার বয়স যখন ১৯ বছর, তখন থেকেই ঘর ছাড়া। অপরাধ কিছুটা যে করিনি তা নয়। সেজন্য তো ৬ বছর জেল কাটলাম। মুক্তির পর বায়েজিদ থানার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। থানা বলেছিল, কোন অপরাধে না থাকলে তারা কিছু করবে না। তারা যখন ডাকে থানায় যেতে হবে। এখন থানা পুলিশ কিছু করেনি।’

‘মাসখানেক আগে হঠাৎ রাত ৩টার দিকে পাঁচলাইশ জোনের এসি আমার ঘরে যায়। আশপাশের তিনটি ঘর, মসজিদে তল্লাশি চালিয়েছিল। আমার ভাইয়ের ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে যায়, সেটা এখনো ফেরত দেয়া হয়নি। ২৪ ঘন্টা সময় দিয়ে আমাকে হাজির করতে বড় ভাইকে নির্দেশ দেন তিনি।’

‘এলাকার মানুষ তখন ধরছে পুলিশকে, বলেছে, সে তো জেল থেকে আসার পর কোন অপরাধ করেনি। তবুও কেন আপনারা তাকে ভালো থাকতে দিচ্ছেন না? তারপরও পুলিশ বলছে, পাঁচলাইশ গিয়ে এসির কাছে দেখা করে আসতে হবে। তখন এলাকার লোক বলছে, সে অপরাধ করলে তাকে আমরা বায়েজিদ থানায় দিয়ে আসবো, কোর্টে দিয়ে আসবো। পাঁচলাইশ কেন যাবে সে?’

‘সেদিন পুলিশ এমনভাবে রেইড করেছে যে, ওইদিন এলাকায় কোন বড় ঘটনা হয়েছে। আর আমি যেন মামলার এক নম্বর আসামি।’

‘আমার অপরাধ হচ্ছে, ৬ বছর পর জেলখানা থেকে বের হয়ে আওয়ামী লীগ কেন করছি না। এটাই আমার অপরাধ। স্থানীয় যারা আওয়ামী লীগ করেন, তারা কয়েকবার ডেকেছিল আমি যাইনি। এলাকার মানুষজন কমিশনার কফিল সাহেবকে বলেছিল, সে তো ভালো হয়ে গেছে। তাকে তো এখন পুলিশ ডিস্টার্ব করতেছে। তখন কফিল সাহেব বলেছিল, আগামী শুক্রবার এমপি বাদল সাহেব তার বাড়িতে আসতেছে। সেখানে যেন ২০-৫০জন নিয়ে আমি যাই। এরপর পুলিশকে এমপি বলে দেবে, আমাকে হয়রানি না করতে। আমি সেখানেও যাইনি। আমি চাইছিলাম, কোন কিছুতে না জড়িয়ে, ঘরে থেকে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে। কিন্তু হলো না। পাঞ্জাবি-টুপি পড়েও হাঁটতে পারিনি।’

‘৬ বছর পর কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় নিয়ত করেছিলাম, মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বো। আর ঘরে থাকবো, মা-বাবার সঙ্গে সময় কাটাবো। এখন দেশের বাইরে চলে আসতে হয়েছে। দুবাই এসেছি। লেবারের চাকরি নিয়েছি এখানে। সারাদিন কষ্টের কাজ করতে হয়। এখানে ভালো লাগছে না।’

২০১১ সালের ৬ জুলাই সারোয়ার যখন গ্রেফতার হন, তার নামে তখন এক ডজনের বেশী মামলা ছিল। এখন কেবল নয়টি মামলা ছাড়া সবগুলোরই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন খোন্দকারপাড়ায় সারোয়ারের বাড়ির প্রবেশমুখে হয়েছে বিশাল গরুর খামার। এর পাশ দিয়ে পথচলতে দুর্গন্ধে নাক চেপে রাখতে হয়।

সারোয়ারের বড় ভাই মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘মানুষের বসবাসের জায়গায় গরুর বাণিজ্যিক খামার করা হয়েছে। এলাকার কেউ এক কেজি দুধ কিনতে পারে না সেখান থেকে। আমার ভাই যদি বড় সন্ত্রাসী হতো, তাহলে কেউ আমাদের সঙ্গে অন্যায় করার সাহস করতো না। আসলে ছোটবেলায় সে খুব সাহসী আর সুদর্শন ছিল। এটাই তার জন্য কাল হয়েছে।’

‘এক সময় মানুষকে হুমকি-দমকি দিয়ে আসতো সাজ্জাদের কথা ধরে। কিন্তু সারোয়ার জেলে যাওয়ার পর থেকে সাজ্জাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের কারও কোন সম্পর্ক নেই। জেল থেকে বের হওয়ার পরপরই আমি প্রত্যেকের বাড়িতে তাকে নিয়ে গেছি, ভুলের জন্য হাত-পা ধরে মাফ চেয়ে নিয়েছি, যাদেরকে সে হুমকি-দমকি দিয়েছিল। সবাই তাকে মাফ করে দিয়েছে, অনেকেই সারোয়ারকে ধরে তখন কেঁদেছিল। সারোয়ারও সেদিন খুব কেঁদেছিল।’

জাহাঙ্গীর বলেন, ‘গরীবের ছেলে তো তাই তাকে ভালো থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। শহরে চোখের সামনে অনেককেই তো দেখি, অবৈধ অস্ত্র নিয়ে ঘুরছে, অপরাধ করছে, পুলিশ তো তাদের ধরছে না।’

এর আগে গত ৩১ আগস্ট সারোয়ারের সঙ্গে একত্রে জামিনে মুক্তি পান আরেক আলোচিত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ নুরনবী ম্যাক্সন; তার বিরুদ্ধে তখন ছয়টি মামলা ছিল। কারাবন্দি থাকার সময় পাঞ্জাবি, ফতুয়া, শার্ট, প্যান্ট এমনকি জুতা পর্যন্ত মিল রেখে পরতেন তারা। কারাগারে এক সেলে থাকতেন সারোয়ার ও ম্যাক্সন। আদালতে আইনি লড়াইও চালান একসঙ্গে।

ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী ও শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ আলী খানের ফাঁদে পড়ে ২০০৬ সাল থেকে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে সারোয়ার ও ম্যাক্সন। ভারতের কারাগারে থাকা সাজ্জাদের কথা মতো কাজ করতে গিয়ে তারা নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। এখনও ভারতের কারাগারে থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ আছে সাজ্জাদের বিরুদ্ধে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ মহসীন বলেন, ‘আমিও শুনেছি, সারোয়ার দুবাই চলে গেছে।’