মাসুদ ফরহান অভি : ১৮ নভেম্বর ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন। তবে গতবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিনটিকে বিশেষায়িত করে ফেলেছে ৫০ বছর পূর্তি। তাই এ দিনটিকে উদযাপনে তিন মাস আগে নেওয়া হয়েছিল প্রস্তুতি। এই অায়োজনটির বিশালতা এতোই ছিল, এক বছর পরও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের প্রতিটি সদস্যের কাছে তা আলোচনার, স্মরণের। একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তিন মাস আগ থেকে প্রস্তুতি নিয়েছে- যা ছিল রীতিমত আলোচনার।
কেমন হবে তাহলে এ আয়োজনটি? কে থাকবে সেদিন প্রধান অতিথি? কে উদ্বোধন করবে অনুষ্ঠানটি? সাবেক-বর্তমান মিলে অর্ধলক্ষ উপস্থিতির প্রত্যাশা নিয়ে দুই দিনের এ আয়োজন বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা- তা নিয়ে ছিল জল্পনা-কল্পনা। সবাই যখন এমন জল্পনা-কল্পনা, সম্ভব কি সম্ভব না- এসব আলোচনায় ব্যস্ত, তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিনকে ব্যস্ত দেখা গেছে নানান স্তরে ও উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করতে। এ বৈঠক হয়েছে কখনো আনুষ্ঠানিক। কখনো হয়েছে পূর্বে থেকে দিনক্ষণ ঠিক করে। প্রাক্তনদের সম্পৃক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম আয়োজন এটি। তাই বেশির ভাগ দায়িত্বই ছিল প্রাক্তনদের। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবের কমিটিও গঠন করে প্রাক্তনদের নিয়ে।
এরপর ঠিক করা হয় ১৮ ও ১৯ নভেম্বর উদযাপিত হবে সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা সময়ে নানান উৎসবের প্রচলন আছে। পহেলা বৈশাখ, বিশ্ববিদ্যালয় দিবসসহ নানান দিনে নানান কর্মসূচি পালন হয়ে থাকে এ ক্যাম্পাসে। এর কিছুদিন আগে হয়ে গেল সমার্তন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আব্দুল হামিদের উপস্থিতে এ আয়োজনটিও উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বিগত কোন আয়োজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে আয়োজিত অনুষ্ঠানের কোন রেকর্ড ভাঙতে পারেনি। একমাত্র গত বছর ১৯ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে সুবর্ণজয়ন্তী’র উৎসবটি হয়ে উঠেছিল যেন রেকর্ড ভাঙার আসর। এ সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের ডায়েরীতে খুলে নিয়েছে নতুন পাতা।
১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের শহরের জিইসি কনভেনশনে প্রথম দিনের আয়োজন ছিল প্রাক্তনদের নিয়ে। এ আয়োজনকে সমৃদ্ধ করে দেশমাতো কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা। তার আগে বিকেল বেলা ২০-২৫ হাজার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীর অংশগ্রহনে গোটা চট্টলাবাসীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনন্দ জানান দিতে বের করা সুবর্ণজয়ন্তী র্যালী। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিদিদের উপস্থিতিতে এমন র্যালী আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি নগরবাসী। গত বছরের ১৯ নভেম্বর উৎসবের মাহেন্দ্রক্ষণকে স্বাগত জানাতেই যেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পূবাকাশে উদিত হয়েছিল রক্তিম সূর্যটি।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার হাস্যজ্জ্বোল চেহারা যখন ভেসে উঠে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে সাটানো বিশাল এলইডি স্ক্রিনে, তখন আরও একটি ইতিহাস সৃষ্টি হয়ে যায় সবুজে মোড়ানো এ ক্যাম্পাসটিতে। তার হাতেই উদ্বোধন হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এ উৎসবটি। দেশের প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন উৎসবের উদ্বোধন করবেন- তা এবারই প্রথম। বঙ্গবন্ধু কন্যার ঢেলে দেওয়া ভালবাসা মাখিয়ে এ যেন সৌভাগ্যের ডানায় ভর করে নতুন দিগন্ত পথে ছুটেচলা। তিনি বলেছিলেন, তিনি গণভবনে থাকলেও, তাঁর হৃদয় পড়েছিল সেদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। অনেকেই প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি ভিডিও কনফারেন্সে দেখে ও তাঁর কথা শুনে হয়েছেন আবেগ-আপ্লুত। জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিনের বক্তব্যও ছিল সবার কাছে প্রেরণার।
চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া কৃতি সন্তানেরা যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন তারাও মিলিত হয়েছেন এই মাহেন্দ্রক্ষণে। রাষ্ট্রের এত সংখ্যক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব, অতিরিক্ত সচিব, শিল্পপতিসহ নানান গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বরতদের এক মঞ্চে আসার আয়োজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম।
আবার দুপুর নামতেই কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের টাঙানো সামিনায় বসেছিল ৩৫ হাজার মানুষের ভুরিভোজের আসর। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক সাথে সুশৃঙ্খলভাবে এত অতিথির আপ্যায়নের বিষয়টিও ছিল প্রথমবারের মতো। সন্ধ্যা নামতে লাখো উপস্থিতিকে সামনে রেখে ওয়ারফেজ, আর্টসেল ও লালনের মতো ব্যান্ড দলগুলোর একই মঞ্চে পরিবেশনা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ডায়েরীতে খুলে নিল নতুন পাতা।
এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে কোন উৎসব আয়োজনে অতিথি পরিবহনে দশ জোড়া শাটলট্রেন একদিনে চলাচল করেনি। একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় শতাধিক নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যকে দায়িত্বপালন করতে হয়নি হয়তো এর আগে। এ আয়োজন ছাড়া আর কোন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠকে ধারণ করতে হয়নি লক্ষাধিক মানুষকে। এভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ৫০ বছর পূর্তির সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবের প্রতিটি অংশই ছাড়িয়ে গেছে অতীতে অসংখ্য রেকর্ড।
সাবেক শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির প্রাক্তন হিসেবে সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবের ক’দিন পরই যাওয়া হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। কথা হয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেই ফেললেন, সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবের বিশালতা যে এতটুকু হবে আয়োজক হিসেবে তা আমাদের কল্পনাতেও ছিলনা। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের আবেগ দেখে আমরা অভিভূত। কোন ধরণে অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তম এ আয়োজন শতভাগ সফল হয়েছে।
আমরাও মনে করি, এটি নিছক কোন উৎসব ছিল না। এটি ছিল যেন, জ্ঞানের বাগানে ফুঠে ওঠা নানান রকমের, বয়সে, ঢঙের লাখো ফুলের মহাসম্মিলন। লাখো উপস্থিতির হৃদয় নিঙরানো ভালবাসাকে একত্রিত করতে এ মহা আয়োজনের সবটুকু সফলতার অর্ধেকের ভাগিদার বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী ও তার প্রশাসন। বাকি অর্ধেক প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের, যারা গোটা আয়োজনটিকে সাফল্যমন্ডিত করতে আবেগ আর সাধ্যের সবটুকু ঢেলে দিয়েছিলেন সেদিন প্রিয় ক্যাম্পাসটিতে। এক বছর পরও বিগত এই মহোৎসবের স্মৃতি যেন চির অমলিন।
লেখক: সাবেক সহ সভাপতি
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি
forhanovi6@gmail.com
