খেলাপি ঋণের মহাপ্রলয়: ডুবছে অর্থনীতি, উত্তরণের পথ কই?


বাংলাদেশের ব্যাংক খাত যেন এক অতল গহ্বর। খেলাপি ঋণের পাগলা ঘোড়া ছুটছে তো ছুটছেই, থামার কোনো লক্ষণ নেই। এ যেন এক মহাপ্রলয়ের অশনি সংকেত। সাধারণ মানুষের রক্ত-ঘামে অর্জিত আমানত গিলে খাচ্ছে রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিরা। আর এর ফল ভোগ করতে হচ্ছে পুরো জাতিকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রকৃত অঙ্কটা এর দ্বিগুণেরও বেশি, প্রায় সাত লাখ কোটি টাকা! এ যেন হিমশৈলের চূড়ামাত্র, আসল ভয়াবহতা লুকিয়ে আছে পানির নিচে।

এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় লাগামহীন দুর্নীতি, ব্যাংক লুট, আর বিদেশে অর্থ পাচার। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব অনিয়ম হয়েছে, যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে।

প্রতিবেদনে প্রকাশ, বিতরণ করা ঋণের ২০ শতাংশেরও বেশি খেলাপি। এক বছরে বেড়েছে ২ লাখ কোটি টাকার বেশি। তিন মাসে বেড়েছে ৬১ হাজার কোটি টাকা। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত!

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলছেন, লুটপাটের তথ্য বেরিয়ে আসায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে। আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে। এ যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা!

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাঘববোয়াল আর রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ঋণগুলোই খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। আগে এদের ঋণখেলাপি দেখানো যেত না, এখন কিছুটা সুযোগ আসায় আংশিক তথ্য বেরোচ্ছে।

অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম বলছেন, ঋণ অবলোপন, অর্থঋণ আদালতের মামলা, ঋণ পুনঃতফসিল – এসবের আড়ালে লুকিয়ে আছে আসল খেলাপি ঋণের পাহাড়।

আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা। সাড়ে ১৫ বছরে তা বেড়েছে ৩ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি! এ যেন এক অবিশ্বাস্য উল্লম্ফন!

শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, তৎকালীন সরকারের ছত্রছায়ায় ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ লুট হয়েছে, পাচার হয়েছে বিদেশে। এখন সেগুলো একে একে বেরিয়ে আসছে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত ব্যাংকগুলো আসল চিত্র দেখাচ্ছে। ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক – সবখানেই খেলাপি ঋণ বাড়ছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, জজ ভূঁইয়া গ্রুপ, থার্মেক্স গ্রুপ – বড় বড় ব্যবসায়ীরাও এখন ঋণখেলাপি।

গভর্নর বলছেন, খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে। আগে গোপন করা হতো, এখন বাস্তব চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, আমানতকারীদের চিন্তার কারণ নেই, ব্যাংক দুর্বল থাকবে না, প্রয়োজনে একীভূত করা হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই যে এত আশ্বাস, এতে কি আদৌ কোনো কাজ হবে? খেলাপি ঋণের এই মহাপ্রলয় ঠেকানো না গেলে দেশের অর্থনীতি যে তলানিতে গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

খেলাপি ঋণ বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে, খরচ বাড়বে, বিদেশি বিনিয়োগ কমবে।

এখন যেসব ঋণ খেলাপি দেখানো হচ্ছে, সেগুলো আগেও খেলাপি ছিল। ব্যাংকগুলো আগে দেখায়নি, এখন দেখাচ্ছে।

এই ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোকেই উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু আসল কাজটা ব্যাংককেই করতে হবে।

কিন্তু ব্যাংকগুলো কি আদৌ সেই কাজটি করতে পারবে? নাকি রাঘববোয়ালদের চাপে নতি স্বীকার করবে? সেটাই এখন দেখার বিষয়।

এই পরিস্থিতিতে, কয়েকটি আশু পদক্ষেপ নেওয়া দরকার:

১. রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ: ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, তারা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন।

২. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করতে হবে খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করতে। ঋণখেলাপিদের নাম প্রকাশ করতে হবে।

৩. আইনি সংস্কার: ঋণখেলাপিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে আইনি সংস্কার করতে হবে। অর্থঋণ আদালতকে আরও কার্যকর করতে হবে।

৪. ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি: ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে।

৫. আর্থিক গোয়েন্দা তৎপরতা: বিদেশে অর্থ পাচার বন্ধে আর্থিক গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

৬. দুর্নীতি দমন: ব্যাংক খাতে দুর্নীতি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

৭. সামাজিক সচেতনতা: ঋণখেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। খেলাপি ঋণের কুফল সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

৮. রাজনৈতিক সদিচ্ছা: সর্বোপরি, খেলাপি ঋণের সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। সরকার, বিরোধী দল, ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজ – সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

৯. নিয়মিত নজরদারি: বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে ব্যাংকগুলির উপর নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে এবং অনিয়ম দেখলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

১০. আর্থিক শিক্ষা: গ্রাহকদের মধ্যে আর্থিক শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা প্রতারণার শিকার না হন এবং সঠিক আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

১১. ঋণ আদায়ে নতুন কৌশল: ঋণ আদায়ের জন্য নতুন এবং কার্যকরী কৌশল অবলম্বন করতে হবে। প্রয়োজনে, ঋণখেলাপিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

১২. উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি: খেলাপি ঋণের ব্যাপকতা এবং কারণ অনুসন্ধানের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের, স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেবে।

এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া গেলে খেলাপি ঋণের লাগাম হয়তো কিছুটা হলেও টেনে ধরা যাবে। না হলে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাবে, যা থেকে উত্তরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এখনই সময়, সবাই মিলে এই মহাপ্রলয় ঠেকানোর জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করার।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।