পথে-ঘাটে, ঘরে-বাইরে: সর্বত্রই কি নারী অনিরাপদ?


আন্তর্জাতিক নারী দিবসেও বাংলাদেশে নারীদের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি বেড়েছে নারী নির্যাতনের ঘটনা। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং পুরুষতান্ত্রিক বিদ্বেষের কারণে নারীরা আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসের তুলনায় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ১৯.৫ শতাংশ বেড়েছে। মহিলা পরিষদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে যথাক্রমে ২০৫ ও ১৮৯টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও হত্যার ঘটনা রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, গত তিন মাসে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ক্রমাগত বেড়েছে।

শুধু পরিসংখ্যান নয়, সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা নারীর নিরাপত্তাহীনতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নারীদের হেনস্থা, গণপরিবহন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়রানি, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গাতেও নারীরা নিরাপদ নয়।

লালমাটিয়ায় ধূমপানকে কেন্দ্র করে দুই নারীর ওপর হামলার ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্য এবং পরবর্তীতে আপসের ঘটনা ‘মব জাস্টিস’ বা ‘মোরাল পুলিশিং’-এর বিতর্ককে উস্কে দিয়েছে।

শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিনোদন জগতের তারকারাও সম্প্রতি নানা ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। অপু বিশ্বাস, পরীমনি ও মেহজাবীন চৌধুরীর মতো অভিনেত্রীরাও হেনস্তার শিকার হয়েছেন।

বিভিন্ন পেশার নারীরাও তাদের নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছেন। গণপরিবহনে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন না থাকা, মেট্রো রেলে যৌন নিপীড়ন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে হেনস্তা, ভাসমান যৌনকর্মীদের ওপর আক্রমণ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো নারীর নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেটওয়ার্ক, মহিলা পরিষদ ও বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ বিভিন্ন সংগঠন নারীবিদ্বেষী কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নারী নির্যাতনসহ সকল নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য তারা কাজ করছেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন না হলে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীনের মতে, “নারীর ওপর মোরাল পুলিশিং বা নৈতিক অনুশাসন এখন তৌহিদী জনতার হাতে চলে গেছে।”

অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন মনে করেন, “দেশে মব ভায়োলেন্স অব্যাহত আছে। দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে নারীদের ওপর আক্রমণ বেড়েছে।”