
উচ্ছৃঙ্খল গণবিচার, যা ইংরেজিতে মব জাস্টিস, মব রুল, মবোক্রেসি বা ওখলোক্রেসি নামে পরিচিত, একটি সমাজের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক প্রবণতা। এটি মূলত একদল উচ্ছৃঙ্খল মানুষের দ্বারা সংঘটিত হয়, যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রদান করে। এই ধরনের বিচার প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচারের পরিবর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচারী মনোভাব এবং সহিংসতাই মুখ্য হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গণতন্ত্র, সুশাসন এবং মানবাধিকারের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রাচীন গ্রিসের ইতিহাসবিদ পলিবিয়াস সর্বপ্রথম ‘ওখলোক্রেসি’ ধারণাটির অবতারণা করেন। তিনি অ্যারিস্টটলের শাসনব্যবস্থার আলোচনায় গণতন্ত্রের বিকৃত রূপ হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করেছিলেন। পলিবিয়াসের মতে, ওখলোক্রেসি হলো উচ্ছৃঙ্খল জনতার শাসন, যেখানে জনমতকে ভুল পথে পরিচালিত করে অযৌক্তিক ও সহিংস পন্থায় ক্ষমতা দখল করা হয়। এই শাসনব্যবস্থা সুশাসন ও আইনের শাসনের সম্পূর্ণ বিপরীত। আঠারো শতকে ‘মব রুল’ বা ‘মবোক্রেসি’ শব্দটির উদ্ভব ঘটে, যেখানে ‘মব’ বলতে ‘উত্তেজিত জনতা’ বোঝানো হতো। সে সময় ইংল্যান্ডের সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামার প্রেক্ষাপটে এই শব্দটির ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ইউরোপে ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান মব জাস্টিসকে আরও উস্কে দেয়। নাৎসি জার্মানির ‘ক্রিস্টালনাখট’ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে ইহুদিদের ব্যবসা, উপাসনালয় এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর রাষ্ট্রীয় মদদে আক্রমণ চালানো হয়েছিল। সাম্প্রতিককালেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প সমর্থকদের আক্রমণ কিংবা জার্মানির রাজনীতিবিদদের ওপর জনতার আক্রোশ মব জাস্টিসের উদাহরণ।
আফ্রিকার দেশগুলোতে মব জাস্টিস ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, যা ‘মব জাস্টিসের আফ্রিকান সিনড্রোম’ নামে পরিচিত। উগান্ডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, ঘানা, কেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এসব দেশে দুর্বল রাষ্ট্রীয় কাঠামো, বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা, দারিদ্র্য এবং অশিক্ষা মব জাস্টিসকে ত্বরান্বিত করছে।
দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারতে, ধর্ম, জাতপাত এবং বংশমর্যাদার নামে মব জাস্টিস সংঘটিত হচ্ছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণ ভারতের বহুত্ববাদী সমাজ ও গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বাংলাদেশেও মব জাস্টিসের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণপিটুনিতে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও এই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে। তুচ্ছ ঘটনা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত শত্রুতা, এমনকি গুজব ছড়িয়েও মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটছে।
মব জাস্টিস কেবল নাগরিক নিরাপত্তা বা সামাজিক শান্তির জন্যই হুমকি নয়, এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকেও বিপন্ন করে। যখন একদল মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন সেটি সুশাসনের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রবণতা চলতে থাকলে সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয় এবং গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতা পালাবদলের সময় মব জাস্টিসের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত দলের শাসনামলে জঙ্গি, সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে।
মব জাস্টিস রোধে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকারকে কঠোর হাতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দমন করতে হবে। পাশাপাশি, রাজনৈতিক দলগুলোকে সহিংসতা পরিহার করে সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। নাগরিক সমাজকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবাধিকার ও আইনের শাসনের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে।
উচ্ছৃঙ্খল গণবিচার একটি সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি শুধু যে তাৎক্ষণিক অরাজকতা সৃষ্টি করে তাই নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি সমাজের মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দেয়। এখনই যদি মব জাস্টিসের লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে বাংলাদেশ একটি অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে, যেখানে আইন ও বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদবে।
মব জাস্টিস প্রতিরোধে করণীয়:
১. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: সরকারকে অবশ্যই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কঠোর হতে হবে। গণপিটুনিসহ সকল প্রকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
২. জনসচেতনতা বৃদ্ধি: মব জাস্টিসের কুফল সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
৩. গুজব প্রতিরোধ: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অন্যান্য মাধ্যমে গুজব ছড়ানো বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
৪. পুলিশের দক্ষতা বৃদ্ধি: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মব ভায়োলেন্স মোকাবেলায় আরও দক্ষ ও তৎপর করে তুলতে হবে।
৫. রাজনৈতিক সদিচ্ছা: সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে সহিংসতা পরিহার করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
৬. সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে, যাতে কেউ বঞ্চিত হয়ে ক্ষোভ থেকে সহিংস আচরণে লিপ্ত না হয়।
৭. মানবাধিকার রক্ষা: সর্বস্তরে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৮. মানসিক স্বাস্থ্য: মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দিতে হবে। মানসিক বিকারগ্রস্ততা থেকে অনেক সময় মানুষ উত্তেজিত হয়ে সহিংস আচরণ করে।
৯. দ্রুত বিচার: দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা কমানো গেলে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসবে।
১০. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যবহার: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে দায়িত্বশীল হতে হবে। উস্কানিমূলক পোস্ট, ছবি, ভিডিও শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
গণতন্ত্র ও সুশাসনের পথে এগিয়ে যেতে হলে মব জাস্টিসকে অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে। অন্যথায়, এটি আমাদের সমাজকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।
