কারাগারে শুদ্ধি অভিযান: সাত মাসে ১২ জন চাকরিচ্যুত, ২৬০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা


কারা অধিদপ্তরে চলছে শুদ্ধি অভিযান। নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে গত সাত মাসে ১২ জন কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। একইসঙ্গে ৬ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর, ৮৪ জনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ২৭০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ২৬০ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে বিভাগীয় মামলা।

সোমবার (১০ মার্চ) দুপুরে পুরান ঢাকার বকশিবাজারে কারা অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, “কারাগারকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে বর্তমান প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। ‘রাখিবো নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ’ এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে এরইমধ্যে নানামুখী সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

বন্দি ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে:

* বন্দি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য হটলাইন চালু।
* ডিজিটাল ভিজিটর ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম।
* কম্প্রিহেনসিভ বন্দি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার চালু।
* গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্বরতদের জন্য বডি ক্যাম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
* ৬৯টি কারাগারকে ফাইবার নেটওয়ার্ক কানেকটিভিটির আওতায় আনা।
* বড় কারাগারগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ চালু।

কারা মহাপরিদর্শক জানান, কারাগারের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২ চালু করা হয়েছে এবং কেরাণীগঞ্জে আরেকটি বিশেষ কারাগার চালুর উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া, রংপুর ও রাজশাহীসহ কয়েকটি পুরোনো কারাগার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্দিদের উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল নির্মাণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়।

বন্দিদের কারাগারের বাইরে যাতায়াত নিরাপদ করতে আধুনিক জিপিএস ট্র্যাকারযুক্ত অ্যাঙ্কেল ব্যান্ড লাগানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোতাহের হোসেন বলেন, “আর্থিক লেনদেন ছাড়া বন্দিদের প্রাপ্যতা অনুযায়ী খাবারসহ অন্যান্য সুবিধাদি নিশ্চিত করতে জেল সুপার ও ডিআইজিদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিয়ম ভঙ্গকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।”

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও মনোবল বাড়াতে নেওয়া পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে:

* সৎ ও যোগ্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন।
* নতুন ১৮৯৯টি পদ সৃষ্টি।
* পদোন্নতির জট খোলা।
* কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অর্জিত ছুটি নিশ্চিতকরণ।
* ‘প্রত্যাশা’ অ্যাপসের মাধ্যমে মতামত প্রকাশের ব্যবস্থা।
* নতুন প্রশিক্ষণ নীতিমালা প্রণয়ন।
* সবার মতামত নিয়ে নতুন নিয়োগবিধির খসড়া চূড়ান্তকরণ।
* স্বাস্থ্য স্কিমের আওতায় সহায়তা বৃদ্ধি।
* ‘টিম ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ।

তিনি আরও বলেন, “কারাগারকে মাদকমুক্ত করতে গত ৩ মাসে শুধু কেরাণীগঞ্জ কারাগারেই ২৭৫টি ঝটিকা তল্লাশি চালানো হয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন ও মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।”

কারা মহাপরিদর্শক বলেন, “বিগত ১৫ বছরের সুবিধাভোগী অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বন্দিরা তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য কারাগার সম্পর্কে নেতিবাচক সংবাদ ছড়াচ্ছে। তবে কারা অভ্যন্তরের ব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করতে কারা সদর দপ্তর নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘদিনের অনৈতিক সুবিধাভোগীদের সিন্ডিকেট ভেঙে দ্রুত সংস্কার করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের সহযোগিতা প্রয়োজন।”

সংবাদ সম্মেলনে কারা উপমহাপরিদর্শক (ঢাকা) জাহাঙ্গীর কবীর, কারা উপমহাপরিদর্শক (সদর দপ্তর) মনির আহমেদসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।