ভূমিকম্পে মিয়ানমারে মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়ালো, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি


দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আটটি দেশে গতকাল শুক্রবার আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মিয়ানমারে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। থাইল্যান্ডেও উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর কেন্দ্রস্থল ছিল দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয় থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে এবং ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। এর ১২ মিনিট পর ৬.৪ মাত্রার একটি শক্তিশালী পরাঘাতও অনুভূত হয়।

শনিবার মিয়ানমারের জান্তা সরকার জানিয়েছে, ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০০২ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ২৩৭৬ জন। দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন যে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। প্রাথমিক খবরে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৭০০ বলে জানানো হয়েছিল, যা শুক্রবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ১১۴ জন নিহত ও ৭৩০ জন আহত হওয়ার তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি।

মান্দালয়, রাজধানী নেপিডো এবং সাইগাইং সহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু ভবন ধসে পড়েছে, যার মধ্যে মান্দালয়ের একটি বড় মঠ এবং নেপিডোর কিছু প্যাগোডা ও ভবন রয়েছে। ইরাবতী নদীর ওপর ঐতিহাসিক আভা সেতু এবং একটি রেলসেতুও ধসে পড়েছে বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে রক্তের জরুরি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে এবং সরকার ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।

চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে মিয়ানমার থেকে তথ্য সংগ্রহ ও ত্রাণ তৎপরতা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মিয়ানমারবিষয়ক গবেষক জো ফ্রিম্যান উল্লেখ করেছেন, সংঘাতের কারণে আগে থেকেই বাস্তুচ্যুত বহু মানুষের জন্য ত্রাণ প্রয়োজন ছিল, ভূমিকম্প সেই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

প্রতিবেশী থাইল্যান্ডেও ভূমিকম্পের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। রাজধানী ব্যাংককে অন্তত ১০ জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। একটি বহুতল ভবনসহ তিনটি নির্মাণাধীন স্থাপনা ধসে পড়েছে এবং সেখানে অন্তত ১০১ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপান্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিতদের উদ্ধারের আশা প্রকাশ করেছেন। উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে।

ভূমিকম্পের কম্পন মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড ছাড়াও দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া এবং বাংলাদেশেও অনুভূত হয়েছে। চীনের ইউনান ও সিচুয়ান প্রদেশে কম্পন অনুভূত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রুইলি শহরে কিছু ক্ষয়ক্ষতি ও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে চীনা সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

মিয়ানমারের জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। চীন ৩৭ সদস্যের একটি উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে, যা শনিবার সকালে ইয়াঙ্গুনে পৌঁছেছে। রাশিয়াও ১২০ সদস্যের একটি দল পাঠিয়েছে। জাতিসংঘ ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৫০ লাখ ডলার ত্রাণ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন, যদিও সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সহায়তা হ্রাসের কারণে তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির কর্মকর্তা মোহাম্মদ রিয়াজ জানিয়েছেন, ধ্বংস ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।