
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত দেড় দশকের শাসনামলে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ঋণের নামে সংঘটিত হয়েছে এক অভূতপূর্ব লুটপাট, যার গভীরতা ও ব্যাপকতা এখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে। সরকারের পতন-পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) কর্তৃক পরিচালিত প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে আঁতকে ওঠার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বিগত সাড়ে পনেরো বছরে দেশের প্রভাবশালী অন্তত ১১টি শিল্প গ্রুপের হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ, যা ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের এক বিশাল অংশ। অভিযোগ উঠেছে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থের একটি বড় অংশই পরিকল্পিতভাবে বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা আদায়ের সম্ভাবনাকে ক্ষীণ করে তুলেছে এবং দেশের অর্থনীতিকে ঠেলে দিয়েছে খাদের কিনারায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারির নেপথ্যে ছিল পূর্ববর্তী সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারক এবং তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের প্রভাব। তারা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একাংশের সহায়তায় এই বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে প্রকাশ্যে এসব অনিয়ম চললেও, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ব্যাংকগুলো অনেকটা ‘নীরব দর্শকের’ ভূমিকায় ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, এই লুটপাটে সহায়তা করে ব্যাংকগুলোর সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা নিজেরাও আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে ব্যাংকগুলো আজ তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউ যে অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন তৈরি করেছে, তাতেই এই ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। এই প্রতিবেদন এখন আরও অনুসন্ধানের জন্য সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ বর্তমানে সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই অঙ্ক প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, পাচারকৃত ও ঝুঁকিপূর্ণ এই ঋণগুলো আদায় না হওয়ায় খেলাপি ঋণের বোঝা ভবিষ্যতে আরও স্ফীত হবে।
তদন্তের মূল ফোকাসে থাকা গ্রুপগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে দশটি গ্রুপের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাতবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের নামে-বেনামে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে; যার মধ্যে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা (সুদসহ)। এই হিসাবের বাইরেও গ্রুপটি বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ সুদ মওকুফ সুবিধা পেয়েছে, যা আমলে নিলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত অঙ্ক আরও বাড়বে। দেশের ১৬টি ব্যাংক ও ৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া এই ঋণের ভারে বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আরেক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, এস আলম গ্রুপের ক্ষেত্রে তদন্তে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে, যার মূল কারণ হিসেবে বিদেশে অর্থ পাচারকে দায়ী করা হচ্ছে। গ্রুপটি ১০টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিলেও, শুধু ইসলামী ব্যাংক থেকেই নিয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা।
তালিকায় থাকা আরও একটি বৃহৎ শিল্প গ্রুপের খেলাপি ঋণ ৩৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে এবং তাদের মোট ঋণের পরিমাণ ও বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়ে তদন্ত চলছে। সিকদার গ্রুপের নামে-বেনামে ঋণ শনাক্ত হয়েছে ৭ হাজার ২৯০ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি প্রায় ২ হাজার ৯০ কোটি টাকা। নাবিল গ্রুপের সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৭ হাজার কোটি টাকায় জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে এবং খেলাপি হয়েছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। নাসা গ্রুপের ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ১১ হাজার কোটি টাকা এবং এই অর্থও বিদেশে পাচার করে ভিন্ন ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবার সংশ্লিষ্ট আরামিট গ্রুপের নামে সরাসরি ও বেনামি কোম্পানিতে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে (২ হাজার কোটি সরাসরি + ১৬ হাজার কোটি বেনামি)। এর মধ্যে সরাসরি নেওয়া ২ হাজার কোটি এবং বেনামি ঋণের আরও ২ হাজার কোটি, মোট ৪ হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে খেলাপি হয়েছে। এই সংশ্লিষ্ট মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭ হাজার কোটি টাকা বলে জানা গেছে এবং বিপুল অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়াও, জনতা ব্যাংক থেকে এননটেক্স গ্রুপের ৭ হাজার ৭৫৫ কোটি, ক্রিসেন্ট লেদারের ৫ হাজার কোটি এবং রতনপুর গ্রুপের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ঋণ পুরোটাই খেলাপি হওয়ার পথে। সোনালী ব্যাংকে হলমার্ক গ্রুপের ৪ হাজার কোটি এবং বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনাও এই দীর্ঘ লুটপাটের অংশ, যার সিংহভাগই এখন খেলাপি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চলমান এই বহুস্তরবিশিষ্ট তদন্ত কবে শেষ হবে এবং লুটপাটকৃত অর্থের কতটুকু উদ্ধার করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, বিগত দেড় দশকে দেশের আর্থিক খাতে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতির জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
