ঈদ সবার জীবনে বয়ে আনুক সুখ ও সমৃদ্ধি

পবিত্র ঈদুল ফিতর সবার জন্য নিয়ে আসুক সুখ ও সমৃদ্ধি
অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আনন্দের বার্তা নিয়ে এসেছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা, আত্মশুদ্ধি আর সংযমের পর মুসলমানদের জীবনে এই দিনটি আসে পরম প্রাপ্তি হিসেবে। রমজান মাস শুধু উপবাসের মাস নয়, এটি গরিব-দুঃখীর কষ্ট অনুভবের মাস, নিজের ভেতরের রিপুকে দমন করার মাস, আর সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ আনুগত্য প্রদর্শনের মাস। সেই কঠিন সাধনার শেষে ঈদের চাঁদ যেন নিয়ে এসেছে এক অপার্থিব শান্তির পরশ, এক অনাবিল আনন্দের অনুভূতি। এই আনন্দ সার্বজনীন, যা ধর্ম-বর্ণ, ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।

ঈদের সামাজিক তাৎপর্য অপরিসীম। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং মানুষে মানুষে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ঐক্যের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার এক অনন্য উপলক্ষ। এই দিনে ধনী-গরিবের ভেদাভেদ থাকে না। সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদগাহে নামাজ আদায় করেন, একে অপরের বাড়িতে যান, কুশল বিনিময় করেন। বাড়িতে তৈরি হওয়া নানা পদের সুস্বাদু খাবার ভাগাভাগি করে খাওয়ার মাধ্যমে সামাজিক মেলবন্ধন আরও মজবুত হয়। ঈদের সময়ে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে ঘুরে বেড়ানো, কুশল বিনিময় করা, আর পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ করা – এই সবই ঈদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর মাধ্যমে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলো নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, যা আজকের এই ব্যস্ত জীবনে খুবই প্রয়োজন।

বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা আর বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে। ঈদের সকাল শুরু হয় নতুন পোশাকে সেজে ঈদগাহের দিকে রওনা হওয়ার মাধ্যমে। লাখো মুসল্লির একত্রে নামাজ আদায়ের দৃশ্যটি সত্যিই অভূতপূর্ব। খুতবায় ইমাম সাহেব যখন রমজানের শিক্ষা ও ঈদের তাৎপর্য তুলে ধরেন, তখন সবার মনে এক পবিত্র অনুভূতি জাগ্রত হয়। নামাজ শেষে কোলাকুলির মাধ্যমে সবাই যেন অতীতের সব বিভেদ ভুলে নতুন করে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর শুরু হয় বাড়ি ফেরার পালা। ঘরে ঘরে অপেক্ষা করে থাকে মা-বোনদের পরম মমতায় তৈরি করা সেমাই, পায়েস, জর্দা, পোলাও, কোরমা সহ আরও কত কি! ছোটদের আনন্দ থাকে সবচেয়ে বেশি। নতুন জামা পরে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়ানো আর গুরুজনদের কাছ থেকে সালামি বা ঈদি আদায় করাতেই তাদের যত উল্লাস। চারিদিকে থাকে এক উৎসবমুখর পরিবেশ, যা মনকে ছুঁয়ে যায়।

ঈদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো বাড়ি ফেরা, যা আমাদের সংস্কৃতিতে ‘ঈদযাত্রা’ নামে পরিচিত। নাড়ির টানে, প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে শহরের কর্মব্যস্ত মানুষগুলো ছুটে চলেন গ্রামের পানে। এই যাত্রা অনেকের কাছেই এক বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছরই দেখা যায় বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন আর লঞ্চঘাটে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়। টিকিট যেন সোনার হরিণ, আর পেলেও যানবাহনে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, ট্রেনের বা লঞ্চের শিডিউল বিপর্যয় – এসব ভোগান্তি মানুষের ঈদ আনন্দকে ম্লান করে দেয়। তবে এটা তৃপ্তিদায়ক যে, এইবারের ঈদযাত্রার অভিজ্ঞতা আগের বছরগুলোর তুলনায় কিছুটা হলেও ভালো ছিল। সরকারের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে ট্রেনগুলো মোটামুটি সময়মতো ছেড়েছে, বাস ও লঞ্চের ক্ষেত্রেও আগের মতো চরম বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। টিকিট কালোবাজারি রোধে নেওয়া পদক্ষেপগুলোও কিছুটা সুফল দিয়েছে। এর ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি কিছুটা কমেছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। ফিরতি যাত্রাতেও যেন এই শৃঙ্খলা বজায় থাকে এবং সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সেদিকে কর্তৃপক্ষের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সবার যাত্রা নিরাপদ হোক, এটাই আমাদের কামনা।

আনন্দের এই ঈদের সময়েও আমাদের মন কিছুটা ভারাক্রান্ত। আমরা এমন এক সময়ে ঈদ উদযাপন করছি যখন ফিলিস্তিনের গাজায় চলছে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। ইসরায়েলি বাহিনীর নির্মম হামলায় হাজার হাজার নিরীহ নারী, পুরুষ ও শিশু প্রাণ হারিয়েছেন। ঘরবাড়ি হারিয়ে, খাদ্যের অভাবে, চিকিৎসার অভাবে সেখানকার মানুষ এক অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ হলেও আগ্রাসন থামেনি। গাজার ভাইবোনদের জন্য এবারের ঈদ নিঃসন্দেহে চরম বেদনার, চরম কষ্টের। তাদের কষ্টের ভাগীদার হয়ে আমরা গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে আমরা এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছি। তাদের জন্য প্রার্থনা করা ছাড়া এই মুহূর্তে হয়তো বেশি কিছু করার নেই, কিন্তু তাদের প্রতি আমাদের সহমর্মিতা সবসময় থাকবে।

অন্যদিকে, ঈদের ঠিক আগে আগেই মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে শক্তিশালী ভূমিকম্পের খবর আমাদের আরও ব্যথিত করেছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, অগণিত মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে মানুষ কতটা অসহায়, এই ঘটনাগুলো তা আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আমরা এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতিও গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানাচ্ছি। এই সব দুঃসংবাদ ঈদের সার্বজনীন আনন্দের উপর এক বিষাদের ছায়া ফেলেছে। এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের অনিত্যতা এবং অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর গুরুত্ব।

ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতেও এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। পোশাকের বাজার থেকে শুরু করে জুতো, কসমেটিকস, ইলেকট্রনিক্স, এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারও বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই নিজের সাধ্যমতো কেনাকাটা করেন প্রিয়জনদের জন্য। মার্কেট ও শপিং মলগুলোতে নামে মানুষের ঢল। বিক্রেতাদের মুখেও হাসি ফোটে। এটি অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের দেশে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী এই উৎসবের মৌসুমকে মুনাফা লোটার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেন। যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশে উৎসব উপলক্ষে পণ্যের দাম কমানো হয়, সেখানে আমাদের দেশে উল্টো দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। পোশাক থেকে শুরু করে চাল-ডাল-তেল-চিনি, এমনকি পরিবহনের ভাড়াও বেড়ে যায় অনেক ক্ষেত্রে। এই অনৈতিক চর্চা সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ঈদ আনন্দকে সীমিত করে ফেলে। এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া দরকার। ব্যবসায়ীদের যেমন নীতিবান হতে হবে, তেমনি ক্রেতা অধিকার সংরক্ষণ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাকেও আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

পরিশেষে, আমরা চাই পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রকৃত শিক্ষা ও আনন্দ সবার জীবনে প্রতিফলিত হোক। রমজানের সংযম, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির যে শিক্ষা আমরা অর্জন করেছি, তা যেন শুধু রমজান মাসেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সারা বছর আমাদের পথ দেখায়। ঈদ আমাদের সমাজের ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমিয়ে আনুক, মানুষে মানুষে সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করুক, এবং সবার মধ্যে শুভবোধ জাগ্রত করুক। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে এক শান্তিময় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গঠনে আমরা যেন ব্রতী হতে পারি, এই হোক এবারের ঈদের অঙ্গীকার।

বিশ্বের সকল প্রান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক, দূর হোক সকল অমানবিকতা। গাজার নির্যাতিত মানুষের কষ্ট লাঘব হোক। সকলের জীবনে ঈদ বয়ে আনুক অনাবিল সুখ, শান্তি আর সমৃদ্ধি। সবাইকে আবারও জানাচ্ছি পবিত্র ঈদুল ফিতরের আন্তরিক শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।