আনন্দযাত্রা বিষাদে শেষ: দিলীপ-সাধনার নিথর দেহের অপেক্ষায় বোয়ালিয়া, হাসপাতালে লড়ছে একমাত্র সন্তান


বাড়ির বাইরে স্বজন ও এলাকাবাসীর ভিড়, ভেতরে সুনসান নীরবতা, ঘরগুলোতে ঝুলছে তালা। অপেক্ষমাণ মানুষগুলোর চোখেমুখে বিষাদের ছায়া। তারা ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামের দিলীপ কুমার বিশ্বাস ও তার স্ত্রী সাধনা রানীর আকস্মিক মৃত্যুতে শোকাহত। সবার অপেক্ষা, কখন এসে পৌঁছাবে নিথর দেহ দুটি। একই সাথে সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ তাদের একমাত্র বেঁচে ফেরা মেয়ে আরাধ্যার শারীরিক অবস্থা নিয়ে। কিন্তু দিলীপের বসতভিটায় তার বাবা-মা বা বোনেরা উপস্থিত না থাকায়, আপনজনের কান্নার রোল শোনা যায়নি সেখানে। বুধবার বিকেলে দিলীপ কুমারের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে এমন হৃদয়বিদারক চিত্রই দেখা গেছে।

কয়েকজন নিকটাত্মীয়সহ স্ত্রী সাধনা রানী ও একমাত্র মেয়ে আরাধ্যাকে নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশে আনন্দ ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন দিলীপ কুমার (৪২)। বুধবার ভোরে গাজীপুরের টঙ্গী থেকে যাত্রা শুরু করলেও তাদের সেই আনন্দযাত্রা চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি জাঙ্গালিয়া এলাকায় পৌঁছানোর পর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় থেমে যায়। কক্সবাজারগামী তাদের মাইক্রোবাসটির সাথে চট্টগ্রামমুখী একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে দিলীপ কুমার, তার স্ত্রী সাধনা রানীসহ মোট ১০ জনের ঘটনাস্থলেই এবং পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয়।

তবে অলৌকিকভাবে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে প্রাণে বেঁচে যায় দিলীপ-সাধনা দম্পতির একমাত্র সন্তান, ছয় বছর বয়সী আরাধ্যা। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং সেখানেই তার চিকিৎসা চলছে। নিহত দিলীপ কুমার ও সাধনা রানী শৈলকুপা উপজেলার কাচেরকোল ইউনিয়নের বড়-বোয়ালিয়া গ্রামের বাসিন্দা। দিলীপ ওই গ্রামের দুলাল বিশ্বাসের একমাত্র ছেলে। তার অন্য তিন বোন বিবাহিত এবং তারা নিজ নিজ শ্বশুরবাড়িতে থাকেন।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, দিলীপ কুমার প্রায় ১৫ বছর ধরে গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় একটি বায়িং হাউজে চাকরি করতেন। পরবর্তীতে কয়েক বছর আগে তিনি নিজেই ছোট পরিসরে একটি বায়িং হাউজ প্রতিষ্ঠা করেন।

দিলীপের কাকাতো ভাই পলাশ কুমার জানান, দিলীপ তার পরিবার নিয়ে প্রায়ই গ্রামে আসতেন। তবে তার বাবা-মা গ্রামে খুব কম থাকেন, বেশিরভাগ সময় অন্য মেয়েদের বাসায় বা ছেলের টঙ্গীর বাসায় কাটান। তিনি বলেন, “আমরা আনুমানিক সকাল ১১টার দিকে দুর্ঘটনার খবর পাই। পরে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি যে দিলীপ এবং তার স্ত্রী দুজনই মারা গেছেন। তাদের মেয়ে আরাধ্যা চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন আছে।”

দিলীপের বন্ধু শোভন কুমার কাজল বলেন, “তাদের মরদেহ গ্রামে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। শুনেছি লোহাগাড়া থানা থেকে মরদেহ নিয়ে রওনা দেওয়া হয়েছে।” তিনি ছোট্ট আরাধ্যার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “বাবা-মা দুজনকেই হারিয়ে ছোট্ট মেয়েটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।”

এক নিমিষের দুর্ঘটনায় শেষ হয়ে গেল একটি সাজানো পরিবার। মা-বাবাকে হারিয়ে এতিম হওয়া শিশু আরাধ্যার ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি অনিশ্চয়তার মুখে। এই মর্মান্তিক ঘটনা পুরো এলাকাবাসীকে শোকস্তব্ধ করে দিয়েছে।