গরম উপেক্ষা করে পর্যটকের ঢল: এই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রস্তুত তো আমরা?


এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিটা এসেছিল এক তীব্র দাবদাহের মাঝে। মার্চের শেষ দিক থেকেই তাপমাত্রার পারদ চড়ছিল, ছুঁয়েছিল ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। এমন অসহনীয় গরমে স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়েছিল, ঘর ছেড়ে বাইরে বেরোনোর সাহস হয়তো কম মানুষই করবেন। পর্যটন কেন্দ্রগুলো হয়তো প্রতিবারের মতো এবার আর জমজমাট হবে না, এমন আশঙ্কাই করছিলেন অনেকে। বিশেষ করে উৎসবের ছুটিতে লম্বা যাত্রার ক্লান্তি আর এই গরম – দুটো মিলে ভ্রমণ পরিকল্পনা থেকে অনেককে বিরত রাখবে বলেই ধারণা করা হয়েছিল।

কিন্তু সব আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে দিল ভ্রমণপিপাসু মানুষের মন। তীব্র গরমকে উপেক্ষা করেই তারা বেরিয়ে পড়েছেন ঘর থেকে, ছুটে গেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা পর্যটন কেন্দ্রগুলোর দিকে। আসলে শহরের ইট-পাথরের খাঁচায় বন্দি জীবন, নিত্যদিনের কাজের চাপ আর নাগরিক কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে মানুষ যেন হাঁপিয়ে উঠেছিল। একঘেয়েমি আর ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে একটু স্বস্তি আর শান্তির খোঁজে এই বৈরী আবহাওয়াকেও তারা বাধা মনে করেননি। প্রকৃতির সান্নিধ্যে কয়েকটা দিন কাটিয়ে শরীর ও মনকে চাঙ্গা করে নেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য কক্সবাজারের দিকেই তাকানো যাক। ঈদের আগের দিন, অর্থাৎ শনিবার সকাল থেকেই হাজার হাজার পর্যটকের ঢল নামে বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্র সৈকতের শহরে। সড়কপথে বাসের দীর্ঘ সারি, ট্রেনের টিকিট সোনার হরিণ, এমনকি বিমানের আসনও খালি ছিল না। রমজান মাসজুড়ে সৈকতে পর্যটকের আনাগোনা বেশ কম থাকলেও ঈদের পরদিন, রোববার থেকে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সৈকতের বালিয়াড়ি, ঝাউবন, এমনকি হোটেল-মোটেল এলাকা – সর্বত্রই ছিল মানুষের ভিড়। যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হোটেল মালিকেরা জানিয়েছেন, ঈদের ছুটি এবং তার পরের কয়েকদিন মিলিয়ে ৫ দিনে প্রায় সাত লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটবে বলে তারা আশা করছেন। এই বিপুল সংখ্যক পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষকে। ঈদের আগেই কক্সবাজারের পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট আর গেস্টহাউসের প্রায় ৯০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গিয়েছিল। পর্যটকদের টানতে রমজান মাসে হোটেল ভাড়ায় যে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়েছিল, ঈদের ভিড় শুরু হতেই তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এখন পূর্ণ ভাড়াতেই থাকতে হচ্ছে পর্যটকদের। এই ভিড় আরও কয়েকদিন স্থায়ী হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। লম্বা ছুটির সুযোগটাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন ভ্রমণকারীরা। এই জনস্রোত কক্সবাজারের স্থানীয় অর্থনীতিতে নিঃসন্দেহে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, স্থানীয় দোকানপাট – সবকিছুতেই যেন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।

শুধু কক্সবাজার নয়, দেশের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও ছিল একই চিত্র। বিশেষ করে তিন পার্বত্য জেলা – রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পর্যটন স্পটেও ছিল পর্যটকদের লক্ষণীয় ভিড়। পাহাড়ের সবুজ অরণ্য, লেকের স্বচ্ছ জল আর আদিবাসী সংস্কৃতির টানে অনেকেই ছুটে গেছেন সেখানে। রাঙামাটি পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, ঈদের ছুটিতে তাদের হোটেল-মোটেলে প্রায় ৬০ শতাংশ বুকিং ছিল এবং ৩ তারিখের পর থেকে তা শতভাগে উন্নীত হয়। কাপ্তাই লেকের মনোরম দৃশ্য, ঝুলন্ত সেতু, শুভলং ঝরনা কিংবা সাজেকের মেঘের ভেলায় গা ভাসাতে ভিড় জমিয়েছিলেন অগণিত পর্যটক। অন্যদিকে, চায়ের দেশ সিলেট অঞ্চলেও পর্যটকদের আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই মৌসুমে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ পর্যটক সিলেট ভ্রমণ করবেন। এখানকার হোটেল-মোটেলগুলোর প্রায় সব কক্ষই আগে থেকে বুকিং হয়ে গিয়েছিল। জাফলংয়ের স্বচ্ছ জল আর পাথরের খেলা, বিছানাকান্দির মায়াবী রূপ, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টের নির্জনতা, লালাখালের পান্না সবুজ পানি, মাধবকুণ্ড বা হামহাম জলপ্রপাতের শীতল পরশ – এসব আকর্ষণ পর্যটকদের টেনে এনেছে দূর-দূরান্ত থেকে। এছাড়া পান্তুমাই, লোভাছড়া, জৈন্তিয়া রাজবাড়ি, ডিবির হাওর, শ্রীপুর, চেরাপুঞ্জি সংলগ্ন এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানেই ছিল পর্যটকদের পদচারণা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনও বাদ যায়নি। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমি আর জীববৈচিত্র্যের এই অসাধারণ ভাণ্ডার ঘুরে দেখতেও অনেকে পাড়ি জমিয়েছেন ঈদের ছুটিতে।

অন্যান্য বছর ঈদের ছুটিতে দেশের বাইরে, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল বা ভুটানে যাওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায় বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ভারত সরকার সম্প্রতি ভিসার ওপর কিছু কড়াকড়ি আরোপ করায় আগের মতো সহজে সেখানে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে যারা বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন, তাদের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন কেন্দ্রগুলোকেই বেছে নিয়েছেন। নেপাল ও ভুটানেও সীমিত সংখ্যক পর্যটক গেছেন বটে, তবে সিংহভাগই স্বদেশমুখী হয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি কারো কারো জন্য ভ্রমণ পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনলেও, দেশের অর্থনীতির জন্য এটি একটি ইতিবাচক দিক। পর্যটকেরা দেশের ভেতরে ভ্রমণ করায় অর্থ দেশেই থাকছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। হোটেল, পরিবহন, খাবার এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে যে ব্যয় হচ্ছে, তা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তা দেশের পর্যটন শিল্পের সামগ্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং একে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা যায়। দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোর প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে, যা এই শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য জরুরি।

পর্যটন শিল্পের বিকাশে ট্যুর অপারেটর বা ভ্রমণ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ার মতো যেসব দেশে পর্যটন শিল্প অনেক বিকশিত, সেখানে অসংখ্য পেশাদার ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারা পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় প্যাকেজ তৈরি করে, থাকা-খাওয়ার সুবন্দোবস্ত করে, যাতায়াত সহজ করে এবং সর্বোপরি ভ্রমণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তাদের মাধ্যমে ভ্রমণ করলে একদিকে যেমন অনেক ঝামেলা এড়ানো যায়, তেমনি খরচও তুলনামূলকভাবে কম পড়ে। কারণ তারা পাইকারি হারে হোটেল বুকিং বা পরিবহন ভাড়া করতে পারে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে ট্যুর অপারেটরের সংখ্যা এখনো তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এর ফলে বেশিরভাগ পর্যটকই ব্যক্তিগতভাবে, পারিবারিকভাবে বা বন্ধুবান্ধব মিলে ভ্রমণের আয়োজন করে থাকেন। এতে অনেক সময় নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যায় পড়তে হয়, নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে এবং খরচও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একটি শক্তিশালী ও পেশাদার ট্যুর অপারেটর খাত গড়ে উঠলে পর্যটকদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আরও মসৃণ ও নিরাপদ হবে।

কিন্তু বাংলাদেশে ট্যুর অপারেটরদের বিকাশ আশানুরূপ হচ্ছে না, বরং তারা কিছু প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই শিল্পের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা বলছেন, সরকার প্রণীত ২০২১ সালের আইন এবং ২০২৪ সালের বিধিমালা তাদের স্বার্থের পরিপন্থী। তাদের দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এই ব্যবসাকে কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে সরকারের উপর প্রভাব বিস্তার করে নিবন্ধন ফি অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া, ব্যবসা পরিচালনার জন্য জামানত হিসেবে তিন লাখ টাকা জমা রাখার যে বিধান চালু করা হয়েছে, তা ছোট ও মাঝারি মানের ট্যুর অপারেটরদের পক্ষে বহন করা প্রায় অসম্ভব। এর ফলে অনেক ছোট উদ্যোক্তা এই ব্যবসা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন বা নতুন করে কেউ আসতে সাহস পাচ্ছেন না। এটি বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করছে এবং হাতে গোনা কয়েকটি বড় কোম্পানির মনোপলি তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে বলে তারা মনে করেন। ট্যুর অপারেটরদের পক্ষ থেকে এই অপ্রাসঙ্গিক ফি ও জামানতের বিধান পরিবর্তন করে ব্যবসা পরিচালনার জন্য নিবন্ধন ফি ২০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, এবারের ঈদের ছুটিতে তীব্র গরম উপেক্ষা করে পর্যটকদের স্বতঃস্ফূর্ত ভ্রমণ দেশের পর্যটন শিল্পের জন্য একটি বড় আশার আলো। মানুষ সুযোগ পেলেই প্রকৃতির কাছে ছুটে যেতে চায়, দেশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চায়। এই আগ্রহ এবং অভ্যন্তরীণ পর্যটনের এই জোয়ারকে কাজে লাগাতে হবে। যদি ট্যুর অপারেটরদের যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনা করে তাদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়, তবে এই খাতে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। পেশাদারিত্ব বাড়লে পর্যটকদের সেবার মানও উন্নত হবে, যা আরও বেশি মানুষকে ভ্রমণে উৎসাহিত করবে। সরকার বিষয়টি সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করবে এবং পর্যটনবান্ধব নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে এই শিল্পের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে – এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এটি শুধু অর্থনীতির জন্যই নয়, দেশের মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও জরুরি।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।