যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক: ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার উদ্যোগ ইউনূসের, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পরিকল্পনা


বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশি পণ্যের ওপরও যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭ শতাংশ হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এর অংশ হিসেবে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন। একইসাথে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আমদানি বৃদ্ধিসহ কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

শনিবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে এই সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়। বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সাংবাদিকদের কাছে সরকারের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানান, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আরোপিত শুল্ক এবং বাংলাদেশের বাণিজ্য পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করবেন। তিনি বলেন, “আমাদের ওপর আরোপিত শুল্ক এবং আমাদের বাণিজ্যের যে ধরন ও গঠন, তার ওপর ভিত্তি করে আমরা প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা…এবং প্রধান উপদেষ্টা নিজেই যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সাথে সংযুক্ত হবেন আমাদের অবস্থানকে তুলে ধরার জন্য।”

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ সে দেশ থেকে আমদানি বাড়ানোর পদক্ষেপ নেবে। এর মধ্যে তুলা, শিল্পপণ্য ও জ্বালানি পণ্য উল্লেখযোগ্য। তবে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত আমদানি করা হবে না। বাণিজ্য উপদেষ্টা মনে করেন, এই শুল্ক আরোপের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ারও খুলতে পারে। তিনি বলেন, “আমাদের শিল্পের যে অবয়ব এবং আমাদের পণ্যের যে পরিপক্বতা, মনে হয় বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যেতে পারে বাংলাদেশের জন্য।” যদিও পাকিস্তান ও ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক বাংলাদেশের চেয়ে কম, তবুও পণ্যের গুণগত মান ও শিল্প সক্ষমতা বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান জানান, বিষয়টি আকস্মিক নয়। ফেব্রুয়ারি মাসেই প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে তিনি ওয়াশিংটন সফর করেন এবং মার্কিন বাণিজ্য সংস্থা (USTR) ও পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তখন থেকেই মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সে সময় বাংলাদেশের অগ্রণী ভূমিকার প্রশংসাও করেছিল। খলিলুর রহমান আরও বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর কারণে সব কৌশল জনসমক্ষে প্রকাশ করা সমীচীন নয়।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী ইউএসটিআরের প্রতিবেদনের সূত্র ধরে জানান, যুক্তরাষ্ট্র মূলত তিনটি বিষয়ে আলোকপাত করেছে: কাস্টমস ও শুল্ক, মেধাস্বত্ব অধিকার প্রয়োগ এবং ই-কমার্স/ডিজিটাল বাণিজ্যের বাধা। এই বিষয়গুলো অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার এজেন্ডার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এগুলো আলোচনার অংশ হবে।

এর আগে শনিবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কার্যালয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানান, শুল্ক কার্যকর হবে ৯ এপ্রিল, তাই পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য এখনো সময় আছে। বৈঠকে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি রুবানা হক, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরীসহ பலர் উপস্থিত ছিলেন।

ব্যবসায়ীরা প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের রপ্তানি বাজারে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন। বৈঠকে সুপারিশ করা হয়, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো বাংলাদেশও আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে শুল্ক কার্যকরের জন্য তিন মাস সময় চাইতে পারে। তবে, যমুনায় অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সুপারিশ নিয়ে ভিন্নমতও ছিল বলে জানা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের পর বিভিন্ন দেশ নিজস্ব ব্যবস্থা নিচ্ছে। চীন পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) মামলা করেছে। বাংলাদেশও পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৎপর। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ আজ (রোববার) আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক ডেকেছেন এবং বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান সংশ্লিষ্টদের নিয়ে অনলাইনে বৈঠক করবেন।

রপ্তানিকারকেরা দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করা, প্রয়োজনে লবিস্ট নিয়োগ এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের নেটওয়ার্ক বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত যেসব পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক রয়েছে, তা পুনর্বিবেচনারও দাবি জানান।

এই পাল্টা শুল্ক মার্কিন ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করতে পারে, যার ফলে বাংলাদেশি পণ্যের, বিশেষত তৈরি পোশাকের চাহিদা কমার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও কিছু দেশ আগে থেকেই এমন পরিস্থিতি আঁচ করে প্রস্তুতি নিয়েছিল, বাংলাদেশ এক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সরকার ও ব্যবসায়ী মহল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করছে।